সময়ের বিবর্তনে দেশ ও সমাজে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবনের চাহিদারও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন। প্রাচীনকালে মানুষ মোমবাতি, হারিকেন, কুপি বাতি দিয়ে তাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম করত, যা তাদের জন্য ছিল খুবই দুর্ভোগের।
কারণ ওই আলোতে কিছুটা আলোকিত হলেও বেশিরভাগ জায়গা অন্ধকারেই থাকত। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ইতিহাসে ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ওইদিন ঢাকার আহসান মঞ্জিলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সূচনা হয় এবং ধীরে ধীরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অভিজাত ভবন বিদ্যুতের আওতায় আসে। ১৯৫৯ সালে ঊধংঃ চধশরংঃধহ ডধঃবৎ ধহফ চড়বিৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অঁঃযড়ৎরঃু (ঊচডঅচউঅ) গঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম পর্যায় চালুর মাধ্যমে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যার প্রাথমিক ক্ষমতা ছিল ৮০ মেগাওয়াট। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর বিদ্যুৎ খাত পুনর্গঠনের জন্য ১৯৭২ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (ইচউই) গঠিত হয়। তখন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল আনুমানিক ৫০০ মেগাওয়াট।
১৯৮২ সালে যমুনা নদীর ওপর দিয়ে সঞ্চালন সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎব্যবস্থা যুক্ত হয়। ১৯৯০-এর দশকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার বেসরকারি খাতকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। ২০১০-২০ সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য তেল, কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয় এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়, যা দেশকে আরও উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান ২০২৬ সালে এসে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং লোডশেডিংয়ের তীব্রতা জনগণের স্বাভাবিক জীবনে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। এর নেপথ্যে অনেক কারণ বিদ্যমান। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন ত্রুটি, ইউনিট বন্ধ এবং জ¦ালানি সংকটের কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।
ফলে শহরে দিনে তিন থেকে চারবার লোডশেডিং হচ্ছে। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে ৭-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং জনজীবনকে অস্থির করে তুলেছে। এ ছাড়াও গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকা অঞ্চলে সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ বা স্বল্প সক্ষমতায় চলছে এবং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চলে একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও অনেক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলে দেশে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রতিফলন সর্বত্রই পড়ছে। এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলগুলোতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং, এই দুইয়ের চাপে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এর প্রভাব তাদের মানসিক অবস্থার ওপরও পড়ছে। পড়াশোনা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার ভয়, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু বাসাবাড়ি বা আবাসিক হল নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে।
প্রচ- গরমের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ চলে গেলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের মনোযোগ নষ্ট হয়। এতে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও মনোযোগ কমে যায়। কখনো কখনো অতিরিক্ত গরমে বাচ্চা, বৃদ্ধসহ অনেকেই অসুস্থও হয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটপূর্ণ করে তুলছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি জ¦ালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। যেসব কেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে আছে, সেগুলো দ্রুত মেরামত ও আধুনিকায়ন করে পুনরায় উৎপাদনের আওতায় আনতে হবে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের অংশ বাড়ানো দরকার।
বর্তমানে ইচউই-এর ভঁবষ-রিংব তথ্য অনুযায়ী সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ৫৩৫ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুতের সক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট ব্যবস্থার তুলনায় এগুলো এখনো খুব ছোট অংশ। তাই নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।
প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি স্থাপিত সক্ষমতা থাকার পরও গ্যাস, কয়লা ও তরল জ¦ালানির অনিয়মিত সরবরাহ, কেন্দ্রের কারিগরি অচলাবস্থা এবং উচ্চ ঢ়বধশ ফবসধহফ-এর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। তাই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার, নিরবচ্ছিন্ন জ¦ালানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ, সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দক্ষ চাহিদা ব্যবস্থাপনাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার প্রধান কৌশল।



















