আজ সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার, কমেছে আমদানি ব্যয়ের চাপ

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:34:25 am, Monday, 7 September 2026
  • 11

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার, কমেছে আমদানি ব্যয়ের চাপ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার দিন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৬৩৯ কোটি ডলার। গত ছয় মাসেই রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এর আগে গত সপ্তাহে রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল। পরে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বিল পরিশোধ করায় রিজার্ভ কিছুটা কমে যায়।

রিজার্ভের এই হিসাব মোট মজুতের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুযায়ী, মোট রিজার্ভের পাশাপাশি বিপিএম ৬ (ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) পদ্ধতিতে প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের হিসাবও প্রকাশ করা হয়। সেই হিসাবে দেশের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা প্রায় ৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ডলার।

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়েছে। একটি দেশের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিজার্ভ সংকট দেখা দিলে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ডলারের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এমনকি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে একটি দেশ বড় ধরনের আর্থিক সংকটেও পড়তে পারে। শ্রীলঙ্কা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থাও ক্রমশ দুর্বল হচ্ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়া আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভের পতন ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এদিকে গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তবে দেশে এখন পর্যাপ্ত ডলার থাকায় বাড়তি এই ব্যয় সামলানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্যও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান রয়েছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে গত দেড় থেকে দুই বছর ধরে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি অন্যতম। শক্তিশালী রিজার্ভের কারণে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হয়নি। তবে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি অর্থনীতিতে কিছু উদ্বেগও রয়েছে।

দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহও দুর্বল। ফলে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির চাহিদা কমেছে। এর অর্থ হলো, একদিকে ডলারের ব্যয় কম থাকায় রিজার্ভ বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রিজার্ভ ভালো থাকার পেছনে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকার কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে এবং একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পরিশোধও অব্যাহত রাখা যাচ্ছে। তবে আমদানির চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। একই সময়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায়ও ক্রমশ বাড়ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি দিলেও অর্থনীতির জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও আমদানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই রিজার্ভ ধরে রাখা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার, কমেছে আমদানি ব্যয়ের চাপ

Update Time : 11:34:25 am, Monday, 7 September 2026

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার দিন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৬৩৯ কোটি ডলার। গত ছয় মাসেই রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এর আগে গত সপ্তাহে রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল। পরে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বিল পরিশোধ করায় রিজার্ভ কিছুটা কমে যায়।

রিজার্ভের এই হিসাব মোট মজুতের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুযায়ী, মোট রিজার্ভের পাশাপাশি বিপিএম ৬ (ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) পদ্ধতিতে প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের হিসাবও প্রকাশ করা হয়। সেই হিসাবে দেশের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা প্রায় ৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ডলার।

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়েছে। একটি দেশের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিজার্ভ সংকট দেখা দিলে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ডলারের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এমনকি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে একটি দেশ বড় ধরনের আর্থিক সংকটেও পড়তে পারে। শ্রীলঙ্কা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থাও ক্রমশ দুর্বল হচ্ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়া আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভের পতন ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এদিকে গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তবে দেশে এখন পর্যাপ্ত ডলার থাকায় বাড়তি এই ব্যয় সামলানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্যও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান রয়েছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে গত দেড় থেকে দুই বছর ধরে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি অন্যতম। শক্তিশালী রিজার্ভের কারণে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হয়নি। তবে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি অর্থনীতিতে কিছু উদ্বেগও রয়েছে।

দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহও দুর্বল। ফলে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির চাহিদা কমেছে। এর অর্থ হলো, একদিকে ডলারের ব্যয় কম থাকায় রিজার্ভ বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রিজার্ভ ভালো থাকার পেছনে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকার কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে এবং একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পরিশোধও অব্যাহত রাখা যাচ্ছে। তবে আমদানির চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। একই সময়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায়ও ক্রমশ বাড়ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি দিলেও অর্থনীতির জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও আমদানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই রিজার্ভ ধরে রাখা।