12:20 pm, Monday, 10 August 2026

ছেলের ৬০ লাখ টাকার আলিশান প্রাসাদের সামনে টিনের চালায় শিকলবন্দি মা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:33:18 am, Monday, 10 August 2026
  • 7

ছেলের ৬০ লাখ টাকার আলিশান প্রাসাদের সামনে টিনের চালায় শিকলবন্দি মা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

টাইলসে মোড়ানো ঝকঝকে আলিশান বাড়ি। চারতলা ভবনে রয়েছে ১২টি আধুনিক কক্ষ, আইপিএস সুবিধা আর সাপ্লাই পানি। ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিলাসবহুল প্রাসাদে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে পরম সুখে বাস করেন বড় ছেলে।

অথচ, সেই প্রাসাদেরই ঠিক সামনে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে একচিলতে অন্ধকার টিনের ঘরের বারান্দায় প্রায় এক বছর ধরে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দিন কাটছে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধা জননী মেহেরুন্নেছার। ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের উলুহাটি মাইজপাড়া গ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী মেহেরুন্নেছা ওই এলাকার মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার স্ত্রী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঝোপঝাড় বেষ্টিত একটি ছোট টিনের ঘরের বারান্দার মেঝেতে পড়ে আছেন বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছা। শরীরে জড়ানো একটি মাত্র ময়লাযুক্ত কাপড়। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, তার ডান পায়ে মোটা শিকল জড়ানো এবং সেই শিকলের অন্য প্রান্তটি ঘরের ভেতরের একটি খুঁটির সাথে শক্ত করে বাঁধা। বৃদ্ধাকে শিকলে বেঁধে রাখার পেছনে এক অদ্ভূত ও অমানবিক অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন পুত্রবধূ গেনেদা বেগম।

তিনি অবলীলায় দাবি করেন, শাশুড়ি পাগল হয়ে গেছেন। প্রস্রাব-পায়খানার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যেখানে সেখানে চলে যাওয়ার ভয়ে তাঁর স্বামী এই বিকল্প ব্যবস্থা করেছেন। অথচ প্রতিবেশীদের দাবি, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মেহেরুন্নেছা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে জমিজমার ভাগ নিয়ে সন্তানরা মেহেরুন্নেছার সাথে বিবাদ বাধে। এর মধ্যে বয়সের ভারে মেহেরুন্নেছা অনেক আগে থেকেই ঠিকমতো চলাচল করতে পারতেন না।

লাঠিতে ভর দিয়ে কোনোমতে দু-এক কদম হাঁটতেন। যিনি নিজে থেকে উঠে দাঁড়াতেই পারেন না, তিনি হারিয়ে যাবেন- এটা অবাস্তব ও বাজে অজুহাত দেখিয়ে মূলত বৃদ্ধা মাকে অবহেলা ও বন্দি করে রাখা হয়েছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু জানান দিচ্ছিল তার ভেতরের অব্যক্ত যন্ত্রণা। মুখে কিছু একটা বলার আকুতি থাকলেও সেই সুযোগ পাননি তিনি।

সংবাদ কর্মীর উপস্থিতি টের পেয়ে পুত্রবধূ গেনেদা বেগম দ্রুত সামনে এসে বৃদ্ধার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার তিন ছেলের মধ্যে অন্য দুই ভাই নিজেদের সম্পত্তি ভাগ বুঝে নিয়ে তা বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন এবং বাড়িতেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বায়ীভাবে বসবাস করেন।

কিন্তু সম্পত্তি ভাগের পর থেকেই মায়ের স্থান হয় বাড়ির সামনের এই পরিত্যক্ত প্রায় টিনের ঘরে। ঘটনার বিষয়ে জানতে বড় ছেলে ইকবাল হোসেনের খোঁজে বাড়িতে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী জানান, ইকবাল পাশের একটি বাজারে গেছেন। পরবর্তীতে তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। স্থানীয়রা জানান, যে মা নিজের রক্ত পানি করে সন্তানকে বড় করেছেন, ব্যবসার সফলতা এনে দিয়েছেন এবং বিশাল অট্টালিকা গড়ার যোগ্য বানিয়েছেন—আজ সেই মায়ের শেষ বয়সের আশ্রয় এক টুকরো শিকল আর টিনের চালা।

প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ না থাকাকে অজুহাত বানিয়ে ১২টি বাথরুম সমৃদ্ধ চারতলা ফাইন্ডেশনের ভবনে মায়ের সামান্যতম জায়গা না দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায না। এই জন্য সন্তানদের কঠোর বিচার হওয়া দরকার। এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

ছেলের ৬০ লাখ টাকার আলিশান প্রাসাদের সামনে টিনের চালায় শিকলবন্দি মা

Update Time : 10:33:18 am, Monday, 10 August 2026

টাইলসে মোড়ানো ঝকঝকে আলিশান বাড়ি। চারতলা ভবনে রয়েছে ১২টি আধুনিক কক্ষ, আইপিএস সুবিধা আর সাপ্লাই পানি। ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিলাসবহুল প্রাসাদে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে পরম সুখে বাস করেন বড় ছেলে।

অথচ, সেই প্রাসাদেরই ঠিক সামনে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে একচিলতে অন্ধকার টিনের ঘরের বারান্দায় প্রায় এক বছর ধরে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দিন কাটছে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধা জননী মেহেরুন্নেছার। ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের উলুহাটি মাইজপাড়া গ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী মেহেরুন্নেছা ওই এলাকার মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার স্ত্রী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঝোপঝাড় বেষ্টিত একটি ছোট টিনের ঘরের বারান্দার মেঝেতে পড়ে আছেন বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছা। শরীরে জড়ানো একটি মাত্র ময়লাযুক্ত কাপড়। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, তার ডান পায়ে মোটা শিকল জড়ানো এবং সেই শিকলের অন্য প্রান্তটি ঘরের ভেতরের একটি খুঁটির সাথে শক্ত করে বাঁধা। বৃদ্ধাকে শিকলে বেঁধে রাখার পেছনে এক অদ্ভূত ও অমানবিক অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন পুত্রবধূ গেনেদা বেগম।

তিনি অবলীলায় দাবি করেন, শাশুড়ি পাগল হয়ে গেছেন। প্রস্রাব-পায়খানার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যেখানে সেখানে চলে যাওয়ার ভয়ে তাঁর স্বামী এই বিকল্প ব্যবস্থা করেছেন। অথচ প্রতিবেশীদের দাবি, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মেহেরুন্নেছা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে জমিজমার ভাগ নিয়ে সন্তানরা মেহেরুন্নেছার সাথে বিবাদ বাধে। এর মধ্যে বয়সের ভারে মেহেরুন্নেছা অনেক আগে থেকেই ঠিকমতো চলাচল করতে পারতেন না।

লাঠিতে ভর দিয়ে কোনোমতে দু-এক কদম হাঁটতেন। যিনি নিজে থেকে উঠে দাঁড়াতেই পারেন না, তিনি হারিয়ে যাবেন- এটা অবাস্তব ও বাজে অজুহাত দেখিয়ে মূলত বৃদ্ধা মাকে অবহেলা ও বন্দি করে রাখা হয়েছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু জানান দিচ্ছিল তার ভেতরের অব্যক্ত যন্ত্রণা। মুখে কিছু একটা বলার আকুতি থাকলেও সেই সুযোগ পাননি তিনি।

সংবাদ কর্মীর উপস্থিতি টের পেয়ে পুত্রবধূ গেনেদা বেগম দ্রুত সামনে এসে বৃদ্ধার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার তিন ছেলের মধ্যে অন্য দুই ভাই নিজেদের সম্পত্তি ভাগ বুঝে নিয়ে তা বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন এবং বাড়িতেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বায়ীভাবে বসবাস করেন।

কিন্তু সম্পত্তি ভাগের পর থেকেই মায়ের স্থান হয় বাড়ির সামনের এই পরিত্যক্ত প্রায় টিনের ঘরে। ঘটনার বিষয়ে জানতে বড় ছেলে ইকবাল হোসেনের খোঁজে বাড়িতে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী জানান, ইকবাল পাশের একটি বাজারে গেছেন। পরবর্তীতে তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। স্থানীয়রা জানান, যে মা নিজের রক্ত পানি করে সন্তানকে বড় করেছেন, ব্যবসার সফলতা এনে দিয়েছেন এবং বিশাল অট্টালিকা গড়ার যোগ্য বানিয়েছেন—আজ সেই মায়ের শেষ বয়সের আশ্রয় এক টুকরো শিকল আর টিনের চালা।

প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ না থাকাকে অজুহাত বানিয়ে ১২টি বাথরুম সমৃদ্ধ চারতলা ফাইন্ডেশনের ভবনে মায়ের সামান্যতম জায়গা না দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায না। এই জন্য সন্তানদের কঠোর বিচার হওয়া দরকার। এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।