প্রতিষেধক দিয়ে সহজেই প্রতিরোধযোগ্য এবং বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম হঠাৎ মরণঘাতী হয়ে উঠেছে। চলতি বছর এই রোগের প্রকোপে এক হাজারের বেশি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। সামান্য জ্বর ও ফুসকুড়ি থেকে ছড়ানো হামের এমন ভয়াবহ রূপ সন্তানহারা অভিভাবকদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ ধারণাতীত।
গত কয়েক দশকে টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, আজ সেই গর্বের জায়গায় কালিমা পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে আড়াই লাখ মানুষ হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন, আর এতে ঝড়ে গেছে হাজারেরও বেশি প্রাণ। প্রশ্ন হলো, যে রোগ একসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা আজ কেন এমন অপ্রতিরোধ্য ও ভয়াবহ রূপ নিল? চলুন আলোচনায় যাওয়া যাক।
লাখো আক্রান্ত, হাজারো প্রাণহানি
প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক বর্তমানে দেশের হাম পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩১শে অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশব্যাপী নিশ্চিত হাম এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৫২ হাজারের বেশি মানুষ। আর এই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৫২ জনের। এর মধ্যে হামে নিশ্চিত মৃত্যু ১০৫ জনের এবং সন্দেহজনক মৃত্যু ১ হাজার ১৪৭ জনের। সংক্রমিতদের বেশির ভাগই দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যারা কোনো টিকাই পায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাধারণত হাজারে ২-৩ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে এই মৃত্যুর হার এখন প্রতি হাজারে ৫ জন—যা সত্যিই উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের এই প্রাদুর্ভাবটি তীব্রতার দিক থেকে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম মারাত্মক একটি মহামারি।
যেভাবে হাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠল
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠল কেন? একসময় আমাদের দেশের শিশুদের ৯২ শতাংশ পর্যন্ত হাম-রুবেলার টিকা বা এমআর টিকার প্রথম ডোজ পেত, আর ৯০ শতাংশ শিশু এমআর টিকার দ্বিতীয় ডোজও পেত। কিন্তু সমস্যার শুরু হয় ২০২৪ সালের শেষের দিকে।
গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্যখাতের বেশ কিছু অপারেশনাল প্ল্যান পুনর্বিন্যাস বা বাতিল করা হয়। ইউনিসেফ ও গ্যাভির মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। ফলে টিকার সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রিতা, আর এক সময় দেশে টিকার মজুত নেমে আসে শূন্যের কোঠায়।
ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশ থেকে এক লাফে নেমে আসে মাত্র ৫৯ শতাংশে—যা গত ৪ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভেঙে পড়ে শিশুদের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রধান প্রাচীর।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ
চলতি বছরের মার্চেই সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন এবং জাতীয় যাচাইকরণ কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানিয়েছিলেন যে, হামের প্রকোপ রোধ করতে হলে কেবলমাত্র রুটিন কাজ করলে চলবে না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই রুটিন কাজ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে জ্যামিতিক হারে।
বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার পুনরায় ইউনিসেফ থেকে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি পুনর্বহাল করে। গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় জরুরি গণটিকাদান ক্যাম্পেইন। দেশজুড়ে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার মেগা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। টিকাদানের ক্ষেত্রে বয়সসীমা কমিয়ে ৬ মাস থেকে ৯ বছরের শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
তবে রয়টার্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হলেও মাঠপর্যায়ে এখনও ৪৩ লাখের বেশি শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুন মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এক সভায় জানানো হয়, দেশে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি।
সংকট উত্তরণে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, শুধু টিকা দিয়ে বা আইসিইউ বেড বাড়িয়ে এই মহামারি পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মাইক্রোপ্ল্যানিং, প্রান্তিক পর্যায়ে কড়া নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে টিকার বয়সসীমা ১৫ বছর পর্যন্ত উন্নীত করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের ভেঙে পড়া টিকাদান ব্যবস্থার জন্য একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হামের পর ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি কিংবা পোলিওর মতো রোগগুলো আরও ভয়ংকর রূপে ফিরে আসতে পারে।
তাই নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি দেশে টিকার যথেষ্ট মজুদ না রেখে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করার অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছেন তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবশেষে মনে রাখতে হবে, আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিটি ত্রুটি দূর করার সময় এখনই।





















