গ্যাসের তীব্র সংকট, বর্ষার কারণে কয়লা খালাস ও সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানি আমদানির নানা চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ বর্তমানে গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম কঠিন বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টের শুরুতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার আই।
এস আলম গ্রুপ, চীনের সেপকোথ্রি ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং এসটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের অংশীদারত্বে নির্মিত প্রকল্পটিতে আনুমানিক ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এটি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় একক শিল্প বিনিয়োগ। প্রকল্পটির অর্থায়নে ব্যাংক অব চায়নার নেতৃত্বে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি সিন্ডিকেটেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি নেওয়া হয়।
এতে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক রপ্তানি ঋণ সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত ছিল। ২০২৩ সালে প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। একই বছরের অক্টোবরের মধ্যে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। আধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিনির্ভর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করা হয়।
নিজস্ব ডেডিকেটেড ডিপ-ওয়াটার জেটির মাধ্যমে কয়লা খালাসের ব্যবস্থা থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে দেশের জ্বালানি আমদানির লজিস্টিক সক্ষমতাও কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে ২৫ বছরের পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টের আওতায় এসএস পাওয়ারের বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৬ দশমিক ৬১ টাকা।
২০১৬ সালে অনুমোদিত এই চুক্তি বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল বা এইচএফওচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংকটের সময় বিপিডিবির দৈনিক এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এ অবস্থায় বাঁশখালী থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যদি কোনো তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করতে পারে, তাহলে তা সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্যঝুঁকি থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। তবে গ্রিডে এসএস পাওয়ারের ধারাবাহিক অবদান ধরে রাখা সহজ ছিল না। ২০২৩–২৪ সালে দেশের ডলার সংকটের কারণে কয়লা আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়।
এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনেও। ২০২৪ সালের আগস্টের পর মূল স্পনসর গ্রুপের আর্থিক সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জ্বালানি সরবরাহ, পাওনা পরিশোধ ও কয়লা আমদানির অর্থায়ন—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখা চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও বিভিন্ন সমঝোতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্ল্যান্টটি একাধিকবার পূর্ণ বা আংশিক উৎপাদনে ফিরেছে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে জ্বালানি সরবরাহ ও পাওনা পরিশোধ সংক্রান্ত সমঝোতার পর এর লোড ফ্যাক্টর প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৬ সালেও একটি ইউনিট পুনরায় চালুর অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় ৫৬০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে। এসএস পাওয়ারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপিডিবির কাছে পাওনা অর্থ।
জানা গেছে, কোম্পানিটির পাওনা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিনের এই বকেয়া অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নতুন কয়লার কার্গো আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও বিদ্যুৎ সংকটের বর্তমান বাস্তবতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, দেশের তিনটি বড় কয়লাভিত্তিক ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার—এসএস পাওয়ার, আদানির গোড্ডা প্ল্যান্ট এবং আরএনপিএল—মিলে মোট ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। একই সময়ে দেশে দৈনিক লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—চলতি দশকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি কমাতে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। এসএস পাওয়ার পূর্ণ ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারলে বর্তমান গড় ঘাটতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে।
এসএস পাওয়ারের গুরুত্ব শুধু জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে প্রকল্পটি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক ইপিসি অংশীদারদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোর্ট ও জেটি অবকাঠামো স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটির ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য বেসলোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে এসএস পাওয়ারের মতো বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





















