ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত নথি বিভাগীয় উপপরিচালকের দপ্তরে জমা দিতে গেলে তা গ্রহণ না করে ফেরত দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুই শিফটে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ১ হাজার ৯১৮ জন শিক্ষার্থী এবং ৪৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান এডহক কমিটির কয়েকজন সদস্য ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক মো. শাহজালালকে সরিয়ে শাহজাহান কবীর নামের আরেক শিক্ষককে ওই পদে বসানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয়ের তহবিল থেকেও একটি চক্র আরও ২০ লাখ টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এবিএম মহিউদ্দীন রাজুর অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক শাহজাহান কবীর ১৯৯৫ সালে হরিপুরের ভাতুরিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৯৭ সালে এমপিওভুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০০০ সালে তিনি বিএড স্কেল পান। বিধিমতে, বিএড স্কেল পাওয়ার আট বছর পর টাইম স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও প্রথম এমপিও শিটে ঘষামাজা করে ২০০৫ সাল থেকেই তিনি অবৈধভাবে টাইম স্কেল ও উচ্চতর স্কেলের সুবিধা ভোগ করে আসছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠতা তালিকায় পেছনে থাকলেও কাগজপত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেকে জ্যেষ্ঠ দাবি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এ বি এম মহিউদ্দীন রাজু জানান, তিনিসহ আরও তিনজন শিক্ষক শাহজাহান কবীরের চেয়ে জ্যেষ্ঠ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের বৈধ রেজুলেশন ছাড়াই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি একক ক্ষমতাবলে শাহজাহান কবীরকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে এডহক কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের স্ত্রী শিরিন বানু দাবি করেন, কমিটির সিদ্ধান্তেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও বাস্তবে শাহজাহান কবীর দায়িত্ব বুঝে পাননি। তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসতে গেলে গোলযোগের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক। এ নিয়ে বিদ্যালয়ে চরম উত্তেজনা চলছে।
বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহজালালই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এদিকে এমপিও শিটে কারসাজি ও জালিয়াতির লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন আকতার অভিযুক্ত শিক্ষক শাহজাহান কবীরকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। তবে তিনি এখনো জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হননি বলে জানা গেছে।
বরং কৌশলে উপপরিচালকের কাছে তার স্বাক্ষর করা কাগজপত্র দাখিলের চেষ্টা করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় উত্তেজনা ও অচলাবস্থার মধ্যেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জাতীয়করণের দাপ্তরিক নথিপত্র প্রস্তুত করে বিভাগীয় উপপরিচালকের (ডিডি) দপ্তরে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ ফোন করে ডিডির প্রতিনিধিকে নিষেধ করায় ফাইলগুলো গ্রহণ না করে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হবে—এটি তাদের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে ফাইল ফেরত যাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ আরও বাড়ছে। দ্রুত সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।






















