আজ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৫%

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বাড়ছে ‘বহিরাগত’ তকমা ও বিদ্বেষ

  • MIT ERP
  • Update Time : 08:22:36 am, Wednesday, 30 September 2026
  • 12

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বাড়ছে ‘বহিরাগত’ তকমা ও বিদ্বেষ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয়দের—বিশেষ করে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের—বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণাসূচক বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক আচরণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে দেওয়া ঘৃণামূলক পোস্টের মাসিক সংখ্যা বেড়েছে ২৪০ শতাংশ। একই সময়ে তাদের ‘নোংরা’ বা ‘অপরিচ্ছন্ন’ হিসেবে উপস্থাপন করা পোস্ট বেড়েছে ১৭১ শতাংশ। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের প্রকাশিত ‘যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়বিরোধী ঘৃণার ক্রমবর্ধমান জোয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মাসে যেখানে দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে প্রায় ১২ হাজার ৯০৪টি ঘৃণামূলক পোস্ট পাওয়া যায়, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৮৪৩টিতে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্তই এমন পোস্টের সংখ্যা ৫ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। গবেষকেরা জাতিসংঘের ঘৃণাসূচক বক্তব্যের সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে এসব পোস্ট পর্যালোচনা করেছেন।

সাধারণ রাজনৈতিক বা সামাজিক সমালোচনার সঙ্গে প্রকৃত বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক ঘৃণামূলক পোস্টে দক্ষিণ এশীয়দের যুক্তরাষ্ট্র ‘দখল’ করা, স্থানীয়দের ‘চাকরি কেড়ে নেওয়া’ কিংবা দেশের জনমিতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অপমানসূচক বর্ণবাদী গালি ‘পাজিত’ এবং এর বিভিন্ন রূপও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিদ্বেষের আরেকটি প্রবণতা হলো দক্ষিণ এশীয়দের একক একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখানো। ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের যেমন একই পরিচয়ের মধ্যে ফেলা হচ্ছে, তেমনি হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খ্রিষ্টানদেরও আলাদা পরিচয় উপেক্ষা করে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য মুছে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

রাজনীতি ও অর্থনীতির চাপ : গবেষকদের মতে, এই বিদ্বেষের শিকড় পুরোপুরি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মনোভাবের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো বিদ্বেষের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। এইচ-ওয়ান-বি ভিসা কর্মসূচিকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভিসাধারীদের ৭০ শতাংশের বেশি ভারতীয়। ফলে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের একটি বড় অংশ সরাসরি দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নতুন কিছু এইচ-ওয়ান-বি আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলার ফি আরোপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে আরও উসকে দেওয়ার প্রতীকী প্রভাব তৈরি করতে পারে। একইভাবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক একটি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত থেকে কাজ করানো বা কাজের বাইরে পাঠানো নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্যের পর অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়বিরোধী মন্তব্য বৃদ্ধির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি: ঘৃণার বিস্তার এখন শুধু কটু মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে চাকরি কেড়ে নেওয়া বা ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারও বাড়ির ঠিকানা, কর্মস্থল কিংবা অন্য গোপন তথ্য প্রকাশ করে তাকে হয়রানি করার ঘটনাও ঘটছে।

কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সরাসরি দক্ষিণ এশীয়দের বাড়ি বা কর্মস্থলে গিয়ে তাদের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং সেই হয়রানির দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বিদ্বেষমূলক প্রচারকে আরও সহজ করে তুলেছে। গবেষকদের মতে, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও অন্যান্য উপাদানে দক্ষিণ এশীয়দের নোংরা, যৌন নিপীড়ক, সামাজিকভাবে অনগ্রসর কিংবা জনমিতিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

অনলাইন ঘৃণা থেকে বাস্তব সহিংসতা: গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, অনলাইনে ছড়ানো ঘৃণা বাস্তব জীবনের সহিংসতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ ও ওয়াইওমিংয়ের দুটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এক ঘটনায় উটাহে এক ভারতীয় মুসলিম কর্মীকে বারবার ছুরিকাঘাত করা হয় এবং পরে ফেডারেল প্রসিকিউটররা ঘটনাটিকে ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

আরেক ঘটনায় ওয়াইওমিংয়ের একটি ট্রাক থামার স্থানে এক শিখ ট্রাকচালককে ১৭ বার ছুরিকাঘাতের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন ও বাস্তব জীবনের বিদ্বেষ পরস্পরকে আরও তীব্র করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বর্ণবাদী ধারণা রাজনৈতিক বক্তব্য, গণমাধ্যম ও দৈনন্দিন জীবনের আলোচনায় ঢুকে পড়ে। আবার বাস্তব জীবনের কোনো ঘটনা অনলাইনে নতুন করে বিদ্বেষ ছড়ানোর উপাদান হয়ে ওঠে।

ইউরোপেও বাড়ছে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব : এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গত এক বছরে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, রাজনৈতিক বক্তব্য ও কঠোর নীতির দাবি দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। গবেষণা ও বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক প্রচার, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান এবং অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগকে এই প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ঘৃণাসূচক বক্তব্য প্রতিরোধে সচেতনতা, শিক্ষা, ইতিবাচক বক্তব্যের প্রসার, গবেষণা এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ঘৃণার ভাষা একবার সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তা শুধু শব্দে আটকে থাকে না; ধীরে ধীরে বৈষম্য, হয়রানি এবং সহিংসতার পথও তৈরি করতে পারে। এ কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার বিস্তার রোধের পাশাপাশি সহনশীল ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, আটক ৪৪০

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বাড়ছে ‘বহিরাগত’ তকমা ও বিদ্বেষ

Update Time : 08:22:36 am, Wednesday, 30 September 2026

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয়দের—বিশেষ করে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের—বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণাসূচক বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক আচরণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে দেওয়া ঘৃণামূলক পোস্টের মাসিক সংখ্যা বেড়েছে ২৪০ শতাংশ। একই সময়ে তাদের ‘নোংরা’ বা ‘অপরিচ্ছন্ন’ হিসেবে উপস্থাপন করা পোস্ট বেড়েছে ১৭১ শতাংশ। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের প্রকাশিত ‘যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়বিরোধী ঘৃণার ক্রমবর্ধমান জোয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মাসে যেখানে দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে প্রায় ১২ হাজার ৯০৪টি ঘৃণামূলক পোস্ট পাওয়া যায়, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৮৪৩টিতে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্তই এমন পোস্টের সংখ্যা ৫ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। গবেষকেরা জাতিসংঘের ঘৃণাসূচক বক্তব্যের সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে এসব পোস্ট পর্যালোচনা করেছেন।

সাধারণ রাজনৈতিক বা সামাজিক সমালোচনার সঙ্গে প্রকৃত বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক ঘৃণামূলক পোস্টে দক্ষিণ এশীয়দের যুক্তরাষ্ট্র ‘দখল’ করা, স্থানীয়দের ‘চাকরি কেড়ে নেওয়া’ কিংবা দেশের জনমিতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অপমানসূচক বর্ণবাদী গালি ‘পাজিত’ এবং এর বিভিন্ন রূপও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিদ্বেষের আরেকটি প্রবণতা হলো দক্ষিণ এশীয়দের একক একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখানো। ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের যেমন একই পরিচয়ের মধ্যে ফেলা হচ্ছে, তেমনি হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খ্রিষ্টানদেরও আলাদা পরিচয় উপেক্ষা করে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য মুছে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

রাজনীতি ও অর্থনীতির চাপ : গবেষকদের মতে, এই বিদ্বেষের শিকড় পুরোপুরি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মনোভাবের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো বিদ্বেষের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। এইচ-ওয়ান-বি ভিসা কর্মসূচিকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভিসাধারীদের ৭০ শতাংশের বেশি ভারতীয়। ফলে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের একটি বড় অংশ সরাসরি দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নতুন কিছু এইচ-ওয়ান-বি আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলার ফি আরোপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে আরও উসকে দেওয়ার প্রতীকী প্রভাব তৈরি করতে পারে। একইভাবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক একটি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত থেকে কাজ করানো বা কাজের বাইরে পাঠানো নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্যের পর অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়বিরোধী মন্তব্য বৃদ্ধির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি: ঘৃণার বিস্তার এখন শুধু কটু মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে চাকরি কেড়ে নেওয়া বা ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারও বাড়ির ঠিকানা, কর্মস্থল কিংবা অন্য গোপন তথ্য প্রকাশ করে তাকে হয়রানি করার ঘটনাও ঘটছে।

কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সরাসরি দক্ষিণ এশীয়দের বাড়ি বা কর্মস্থলে গিয়ে তাদের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং সেই হয়রানির দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বিদ্বেষমূলক প্রচারকে আরও সহজ করে তুলেছে। গবেষকদের মতে, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও অন্যান্য উপাদানে দক্ষিণ এশীয়দের নোংরা, যৌন নিপীড়ক, সামাজিকভাবে অনগ্রসর কিংবা জনমিতিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

অনলাইন ঘৃণা থেকে বাস্তব সহিংসতা: গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, অনলাইনে ছড়ানো ঘৃণা বাস্তব জীবনের সহিংসতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ ও ওয়াইওমিংয়ের দুটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এক ঘটনায় উটাহে এক ভারতীয় মুসলিম কর্মীকে বারবার ছুরিকাঘাত করা হয় এবং পরে ফেডারেল প্রসিকিউটররা ঘটনাটিকে ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

আরেক ঘটনায় ওয়াইওমিংয়ের একটি ট্রাক থামার স্থানে এক শিখ ট্রাকচালককে ১৭ বার ছুরিকাঘাতের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন ও বাস্তব জীবনের বিদ্বেষ পরস্পরকে আরও তীব্র করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বর্ণবাদী ধারণা রাজনৈতিক বক্তব্য, গণমাধ্যম ও দৈনন্দিন জীবনের আলোচনায় ঢুকে পড়ে। আবার বাস্তব জীবনের কোনো ঘটনা অনলাইনে নতুন করে বিদ্বেষ ছড়ানোর উপাদান হয়ে ওঠে।

ইউরোপেও বাড়ছে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব : এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গত এক বছরে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, রাজনৈতিক বক্তব্য ও কঠোর নীতির দাবি দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। গবেষণা ও বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক প্রচার, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান এবং অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগকে এই প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ঘৃণাসূচক বক্তব্য প্রতিরোধে সচেতনতা, শিক্ষা, ইতিবাচক বক্তব্যের প্রসার, গবেষণা এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ঘৃণার ভাষা একবার সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তা শুধু শব্দে আটকে থাকে না; ধীরে ধীরে বৈষম্য, হয়রানি এবং সহিংসতার পথও তৈরি করতে পারে। এ কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার বিস্তার রোধের পাশাপাশি সহনশীল ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও জরুরি হয়ে উঠেছে।