কীটনাশকের সর্বগ্রাসী বিষাক্ততায় যখন দেশের কৃষি, উর্বর মাটি, জলজ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে, ঠিক তখনই এক আশার প্রদীপ জ্বেলেছেন কুষ্টিয়ার প্রতিভাবান উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায়।
পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ও ফসল সুরক্ষাকারী বিকল্প পণ্য উদ্ভাবন করে তিনি অর্জন করেছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের অফিসিয়াল পেটেন্ট স্বীকৃতি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অধিদপ্তরের গত ১০ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর গৌতম কুমার রায়কে এই পেটেন্ট মঞ্জুরি প্রদান করা হয়।
বিজ্ঞানের জগতে তার এই অনুমোদিত পেটেন্ট নম্বর ১০০৭১১০। দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরলস সাধনা, ত্যাগ ও বিজ্ঞানের অনবদ্য মেলবন্ধনে অর্জিত হয়েছে এই যুগান্তকারী সাফল্য। ২০০৯ সালে ক্ষতিকর কেমিক্যাল পেস্টিসাইডের কড়ালগ্রাস থেকে মাটির স্বাস্থ্য ও মানবজীবন রক্ষায় বিকল্প জৈব বালাইনাশক নিয়ে বিষমুক্ত কৃষির লক্ষ্যে গবেষণা শুরু করেন গৌতম কুমার রায়।
সেই বছরই তিনি প্রথম স্থানীয় আতা গাছের সবুজ পাতা থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে জৈব বালাইনাশক প্রস্তুতের প্রাথমিক সফলতা পান। পরে তার এই উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মানদ-ে উত্তীর্ণ করতে ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের তৎকালীন শিক্ষক ও বর্তমান বিশিষ্ট গবেষকদের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা শুরু করেন।
জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রফেসর ড. সোহেল রানার প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গবেষণা কাজ এগিয়ে চলে। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পরের ধাপে যুক্ত হন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী প্রভাষক কবিরুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণাগারের ডেটা বিশ্লেষণ শেষে ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় পেটেন্ট স্বত্বের জন্য আবেদন করা হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস দপ্তর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উপাদান যাচাই-বাছাই ও একাধিক শুনানি শেষে গৌতম কুমার রায়ের আবেদনের ১০টি উদ্ভাবনী দাবিকে সত্য প্রমাণ করে জাতীয় এই পেটেন্ট স্বত্ব অনুমোদন দেয়। এটি মূলত আতা গাছের তাজা কিংবা শুকনো সবুজ পাতা থেকে সংগৃহীত বিশেষ জলীয় ও মিথানলীয় নির্যাসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পাতলা মিথানলীয় নির্যাস জলীয় নির্যাসের চেয়েও অধিক মাত্রায় বালাইনাশক কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেমিক্যাল বালাইনাশকের মতো এটি প্রকৃতিতে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ ফেলে রাখে না; এটি শতভাগ জৈব-বিয়োজ্য হওয়ায় মাটি বা জলজ বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিসাধন করে না। প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর পোকামাকড়ের জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী।
১ মিলিগ্রাম/২ মিলিলিটার থেকে ১০০ মিলিগ্রাম/২ মিলিলিটার ঘনমাত্রার পরিসরে এটি প্রয়োগ করলে ক্ষতিকারক পোকা ও আগাছার ক্ষেত্রে অন্তত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুহার নিশ্চিত করা সম্ভব। পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ গুদামজাত শস্যের ক্ষতিকর পোকার বিরুদ্ধে এর মধ্যক প্রাণঘাতী মাত্রা মাত্র ৭.৪২ মিলিগ্রাম/২ মিলিলিটার এবং প্রজাতিভেদে ক্ষতিকর পোকার বিরুদ্ধে প্রায় ৭.৯৮ মিলিগ্রাম/২ মিলিলিটার।
রাসায়নিক বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মাটির জীবন ধরে রাখতে গৌতম কুমার রায়ের এই আবিষ্কার বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে এই পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক সারা দেশের কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যা টেকসই ও সমৃদ্ধ কৃষির পথকে বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
























