টানা ৪৮ ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বেশিরভাগ সড়ক তলিয়ে যাওয়ার পর শহরটিতে জরুরি বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। বাসিন্দাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সেই সঙ্গে শহরের খালগুলোর আশপাশে বসবাসকারীদের ঘরের মালামাল দ্রুত উপরের তলায় সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। বিবিসি লিখেছে, বছরের এ সময়ে থাইল্যান্ডে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত সাধারণ ঘটনা হলেও সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ ব্যাংককের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিয়েছে। যানজটের জন্য পরিচিত শহরটির প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
আজ রোববার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। এতে শহরের আরও কিছু খালের পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে তীর উপচে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্য ব্যাংককের উত্তরে এক খালের পাশে বসবাসকারী ৬৭ বছর বয়সি সোমকিদ ফিউক-নগাম বলেন, “পানি আসতেই আছে। এখন বাইরে যাওয়া কঠিন। এখন তো পানি কোমর পর্যন্ত উঠে গেছে।
” তিনি বলেন, “আমি কোথাও যেতে পারছি না। দুই দিন ধরে আমার দোকান বন্ধ রেখেছি। ” ফিউক-নগামের ভাষ্য, ২০১১ সালে দেশজুড়ে বন্যার সময় ব্যাংককে যে পরিস্থিতি হয়েছিল, এবার শহরের পানির উচ্চতা তার চেয়েও খারাপ বলে মনে হচ্ছে। সে সময় চরম আবহাওয়াজনিত সেই দুর্যোগ তিন মাস ধরে চলেছিল। তখন পুরো থাইল্যান্ডে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়।
তবে এবারের বন্যায় ব্যাংককে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। থাই আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, সপ্তাহজুড়ে আরও ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের বৃষ্টির জন্য দায়ী নি¤œচাপটি মধ্য থাইল্যান্ডের দিকে সরে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট জানিয়েছেন, শহরের পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা পাম্প করে পানি সরানোর চেষ্টা করছি। এ সময় থাইল্যান্ডে সাধারণত বজ্রসহ বৃষ্টি হলেও সাম্প্রতিক দিনের অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণে ব্যাংককের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত চাপের মুখে। ফলে এরই মধ্যে যানজটপূর্ণ শহরের সড়কগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র ভোগান্তি।
দুর্গতদের সহায়তায় আশ্রয়কেন্দ্র ও অস্থায়ী রান্নাঘর স্থাপনের কথা জানিয়েছে সেনাবাহিনী। ব্যাংকক মহানগর প্রশাসনও স্কুলগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। শনিবার জরুরি সতর্কবার্তা দিয়ে খালের কাছাকাছি বসবাসকারীদের মালপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে বলেছে কর্তৃপক্ষ।
বন্যার মধ্যে খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করতে সুপারমার্কেটগুলোতে ভিড় করছেন মানুষ। ১৯ বছর বয়সী সানসুক লাওয়াচারাকুল জানান, আগে থেকে খাবার মজুত না করায় তিনি উদ্বিগ্ন। মা-বাবা সঙ্গে নেই, আর এমন পরিস্থিতি আগে কখনো একা সামলাতে হয়নি তাকে। পানিবেষ্টিত একটি আবাসিক ভবন থেকে লাগেজ নিয়ে বের হচ্ছিলেন ব্যাংককের আরেক বাসিন্দা সুপাকর্ন জুলাভিজিতফং।
তিনি জানান, সতর্কবার্তা পাওয়ার আগে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। বন্যার মধ্যেও ব্যাংককের প্রধান সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে যাতায়াতের জন্য ভ্রমণকারীদের হাতে অতিরিক্ত দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় রাখতে পরামর্শ দিয়েছে পর্যটন কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো বাড়িঘর। শনিবার সকালে গভর্নর এ সংক্রান্ত এক আদেশে স্বাক্ষর করে দুর্যোগের আওতা পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে দেন। এর আগে কেবল নোং চোক, সুয়ান লুয়াং ও খান না ইয়াও জেলা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিএমএ) জানিয়েছে, এই ঘোষণার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শনিবার সকাল ৯টার পরপরই বাসিন্দাদের মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে জানানো হয়, খালের পানির সমতল ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে এবং তা আরও বাড়তে পারে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, থাইল্যান্ডের নি¤œ মধ্যাঞ্চল ও ব্যাংকক সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হওয়া শক্তিশালী নি¤œচাপ এবং আন্দামান সাগরের মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেই এই বর্ষণ হচ্ছে।
আগামী রোববার পর্যন্ত সারা দেশে এ বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত বজায় থাকতে পারে। বিএমএর পানি নিষ্কাশন বিভাগ জানায়, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে ব্যাংককে ৪৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড় ২৬৯ মিলিমিটারের চেয়ে অনেক বেশি। শহরের সেচ পাম্পগুলো বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় গভর্নর চাদচার্ট সিটিপুন্ট বলেন, ‘বৃষ্টি থামলে পানি পুরোপুরি নিষ্কাশন করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে।
’ ২০১১ সালের মতো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের শঙ্কা নেই জানিয়ে তিনি বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন। যদিও অনেক সুপারমার্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার হিড়িক পড়ে যায়। এদিকে জমা পানি সরাতে থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ৯৫০ ঘনমিটার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
দেশটির অন্তত ২০টি প্রদেশে বর্তমানে বন্যার খবর পাওয়া গেছে।





















