নদী কেবল প্রাকৃতিকভাবে বয়ে যাওয়া জলধারা নয়; নদী একটি ভূখণ্ডের রক্তের ধমনি, ইতিহাসের অবিনাশী বয়ান এবং এক জাগ্রত সভ্যতার হৃদস্পন্দন। পলি ও জলের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পলিগঠিত রূপসী মানচিত্রে নদীই বাঙালির আত্মপরিচয়, কৃষি, জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রাণভিত্তি।
অথচ আজ ‘বিশ্ব নদী দিবস’-এর এই তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কোনো প্রথাগত মেকি উচ্ছ্বাস কিংবা আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। আজ প্রয়োজন এক কঠোর আত্মোপলব্ধি, তীব্র অনুশোচনা আর বুকফাটা হাহাকার। যে নদী আমাদের জন্ম দিয়েছে, জননীর মতো লালন করেছে, সেই নদীগুলো আজ মানুষের চরম নির্দয়তা, অনিয়ন্ত্রিত দখলদারত্ব আর শিল্পবর্জ্যরে মারাত্মক বিষে জরাজীর্ণ হয়ে আমাদেরই চোখের সামনে তিলে তিলে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো বিস্তৃত শিল্পাঞ্চল ভেদ করে ধেয়ে আসা শীতলক্ষ্যা আজ আমাদের জাতীয় নদী-বিপর্যয়ের এক প্রামাণ্য ও বিষাদময় জ্বলন্ত দলিল। একসময় যে শীতলক্ষ্যার রূপ ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ, জল ছিল সুপেয় এবং যার বাতাস স্পর্শ করে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বজয়ী ঢাকাই মসলিনÑ আজ সেই প্রবহমান নদী বিষাক্ত রাসায়নিক আর শিল্পবর্জ্যরে ঘন কালচে আলকাতরায় পরিণত হয়েছে।
গাজীপুরের টোক থেকে শুরু করে নরসিংদীর ঘোড়াশাল হয়ে রূপগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের বুক চিরে বয়ে চলা শীতলক্ষ্যার ঘাটে দাঁড়ালে কিংবা নৌকায় উঠলে বাতাস থেকে যে তীব্র, চোখ-মুখ জ্বালানো পচা কেমিক্যালের দুর্গন্ধ নাকে আসে, তা যেন এক জীবন্ত সত্তার গুমরে গুমরে কাঁদার নিঃশব্দ আর্তনাদ। শীতলক্ষ্যা আজ আর মুক্ত জলধারা নয়। তাকে আমরা বানিয়ে ফেলেছি এক দানবীয় খোলা ড্রেন ও বিষের আধার।
কেবল শীতলক্ষ্যা নয়, আমাদের গোটা নদীÑ বাস্তুতন্ত্রের ওপর আজ নেমে এসেছে ধ্বংসের নজিরবিহীন তা-ব। মেগাসিটি ঢাকাকে জড়িয়ে রাখা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও ধলেশ্বরী আজ বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যরে ভারী আস্তরণে নদীর তলদেশ সম্পূর্ণ মৃত, আর প্রভাবশালী দখলদারদের আগ্রাসনে নদীগুলোর ভৌগোলিক মানচিত্র দিন দিন সংকুচিত হয়ে পেনসিলের সরু দাগে ঠেকেছে।
আমাদের প্রাণের সঞ্চারক পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা একদিকে উজান থেকে আসা পানির সংকট ও কৌশলগত ভূ-রাজনীতির শিকার; অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের অভাবে মারাত্মক নাব্য সংকটে ধুঁকছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকে চরের ধু ধু বালি আর বর্ষায় রূপ নেওয়া নদীভাঙনে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছে নদীপারের লাখো মানুষ। শিল্পবর্জ্য, আর ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের মারাত্মক বিষক্রিয়ায় উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছসহ সমগ্র জলজ প্রাণিজগৎ।
বাঙালির অবচেতন আবেগের সঙ্গে নদী এমনভাবে মিশে আছে যে নদী হারিয়ে গেলে আমাদের লোকগাথা, সাহিত্য কিংবা মূল অস্তিত্বের আর কিছুই বাকি থাকে না। শৈশবে নদীর বুকে অনাবিল সাঁতার, খেয়া নৌকায় পারাপার, গোধূলির আলোয় মাঝির হাঁক ছেড়ে দেওয়া ভাটিয়ালি গানÑ এসবই ছিল আমাদের আত্মিক জীবনের মূল সুর। আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা নদীকে জননীর আসনে বসিয়েছেন।
অথচ আজ আমরা তথাকথিত অন্ধ আধুনিকতা ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের নামে সেই জননীর শরীরে প্রতিদিন বিষ ঢালছি। একটি নদী যখন মরে যায়, তখন কেবল একটি জলাধার শুকায় না। শুকিয়ে যায় হাজার বছরের লোকজ স্মৃতি, কৃষ্টি ও একটি জাতির আত্মপরিচয়। নদী রক্ষা করা কোনো বিলাসিতা বা পরিবেশবাদী শখ নয়। এটি আমাদের জাতি বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত। নদী বাঁচলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভারসাম্য পায় এবং পরিবেশ বিপর্যয় রোধ হয়।
নদীপথ যেমন দেশের অর্থনৈতিক কম খরচের রক্তসংবহনতন্ত্রকে সচল রাখে, তেমনি নদীর স্বাভাবিক পানিই নিশ্চিত করে আমাদের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা। বিশ্ব নদী দিবসে কেবল এসিরুমে সভা-সেমিনারের ফাঁকা বুলি বা কাগুজে প্রস্তাবনায় বন্দি থাকলে চলবে না। শীতলক্ষ্যাসহ দেশের প্রতিটি মুমূর্ষু নদীকে বাঁচাতে এখনই রাজপথে ও নীতিনির্ধারণে আপসহীন সিদ্ধান্ত নিতে হবে : ১. কঠোর ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি : গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি কারখানার ইটিপি (ঊঞচ) ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সেন্ট্রাল ইটিপি নিশ্চিত না করে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলতে দেওয়া যাবে না। অনাকাক্সিক্ষত বর্জ্য ফেললেই কারখানা স্থায়ী সিলগালাসহ কঠোর আইনি শাস্তি দিতে হবে। ২. দখলদারদের সামাজিকভাবে উচ্ছেদ : রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রভাবশালী সব অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে নদীর প্রকৃত সীমানা পুনর্দখল করতে হবে এবং নদীর উভয় তীরে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে।
৩. বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যাপিটাল ড্রেজিং : বৈজ্ঞানিক পন্থায় নদীগুলোর তলদেশ বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত করা এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক নাব্য ও প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ৪. সামাজিক প্রতিরোধ ও নাগরিক সচেতনতা : নদীতে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে সর্বস্তরে সামাজিক প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে হবে। আমাদের মহামান্য উচ্চ আদালত নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ (খবমধষ চবৎংড়হ)Ñ এক জাগ্রত জীবন্ত সত্তার ঐতিহাসিক সনদ দিয়েছেন।
অতএব, কোনো নদীর কণ্ঠে বিষ ঢেলে দেওয়া কিংবা তার প্রবহমান শ্বাসনালি চেপে ধরা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়Ñ তা আক্ষরিক অর্থেই এক একটি প্রাক-পরিকল্পিত নরহত্যা। বিশ্ব নদী দিবসে আজ আমাদের রক্তের শপথে গর্জে উঠুক পরম সত্য। আমরা আর কোনো শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা কিংবা তুরাগকে অন্ধ মুনাফার বিষাক্ত আধারে তিলে তিলে আত্মাহুতি দিতে দেব না।
আসুন, তথাকথিত আধুনিকতার চাবুক ভেঙে নদীর বন্দিদশা ঘোচাই, তার পলিমাখা পলকে ফিরিয়ে আনি চিরন্তন মুক্ত প্রবাহের হুংকার। মনে রাখতে হবে, নদীর ধমনিতে স্পন্দন যদি একবার থমকে দাঁড়ায়, তবে কোনো মানচিত্র নয়। নিঃশব্দে সমাধিস্থ হবে সমগ্র বাংলাদেশ।


















