আজ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১১ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
বজ্রসহ বৃষ্টি
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯২%

আত্মস্বীকৃত নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:24:02 pm, Thursday, 24 September 2026
  • 14

আত্মস্বীকৃত নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দেশবাসী যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা আজ নানামুখী ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা এবং অশুভ অক্ষশক্তির কারণে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

যখন একটি দেশের নাগরিকেরা স্বস্তি ও সুশাসনের আশায় দিন গুনছে, তখন রাজনীতি ও প্রশাসনের একাংশের চরম নীতিহীন আচরণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য জননিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এক বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে দেশের সচেতন মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগ জনক হচ্ছে,জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এনসিপির মিছিল শেষে রাজধানীর নেভিগলিতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য প্রদানকালে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, সরকার সংস্কার ও বিচারের প্রধান তিনটি দাবি মেনে নিলে ঢাকা শহরে আর কোনো ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ ঘটবে না। আপাতদৃষ্টিতে এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক দাবি আদায় সম্পর্কিত মনে হলেও, আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ অত্যন্ত ভয়াবহ ও গভীর স্পর্শকাতর।

একতরফাভাবে এই ধরনের ঘোষণা দেওয়ার মূল অর্থ কী দাঁড়ায়? একটি রাজনৈতিক বা নাগরিক প্ল্যাটফর্মের শীর্ষনেতা যখন নির্দিষ্ট দাবি মানা বা না মানার ওপর দেশের রাজধানী শহরের ককটেল বিস্ফোরণ বা সহিংসতার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে দেন, তখন তা রাষ্ট্রকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করার নামান্তর। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দাবির ভাষা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভাষার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রেখাপাত থাকে।

কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার ভাষা এমন হতে পারে না, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়। পাটওয়ারী সাহেবের দাবি অনুযায়ী, তিন দাবি মানলে ককটেল ফুটবে না—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দাবি না মানলে ককটেল কারা ফুটায়? সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে কি তবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে? অগ্নিসন্ত্রাস ও বিস্ফোরণের এই যে আচ্ছন্ন হুমকি, তা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা নয়।

বরং এই ধরনের বক্তব্য এই সন্দেহকেই প্রগাঢ় করে তোলে যে, দাবির আড়ালে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার একটি পরোক্ষ প্ররোচনা বা যোগসাজশ কাজ করছে। জননিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করা ফৌজদারি অপরাধের শামিল, এবং যারা বক্তব্যের মাধ্যমে বা বাস্তবে এমন সহিংসতার আভাস দেয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার এই স্খলন কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এনসিপির শীর্ষনেতাদের বাস্তব কর্মকাণ্ডেও তা প্রকটভাবে দৃশ্যমান।

যে নেতারা জাতীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুশাসনের বাণী শোনান, সরকারের নানা অসঙ্গতি নিয়ে মুখরোচক সমালোচনা করেন এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে নীতি-আদর্শ শেখাতে মুখিয়ে থাকেন, তাঁদের নিজেদের জীবনযাত্রা ও আচরণের গতিপ্রকৃতি এখন চরম প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে স্মরণ করা যেতে পারে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর চট্টগ্রাম লংমার্চের কথা। ওই কর্মসূচিতে তিনি অত্যন্ত বিলাসবহুল একটি ‘পান্ডু’ গাড়িতে চড়ে অংশ নিয়েছিলেন, যে গাড়িটির মালিকানা ছিল খোদ পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর এক আওয়ামী লীগ নেতার নামে।

যারা ৫ আগস্টের পূর্বে সাধারণ ছাত্রনেতা হিসেবে তিন বেলা আলু-ভর্তা আর ডাল-ভাত খেতে হিমশিম খেতেন, তারা আজ এক অদৃশ্য অলৌকিক ক্ষমতার জোরে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন। বিলাসবহুল গাড়ি, প্রাসাদোপম বাড়ি আর দেদারসে অর্থ উড়ানো—তাদের এই জীবনযাত্রার পেছনে কোনো রূপকথার পরী কিংবা আলাদিনের জিনের ছোঁয়া এসেছে বলে সচেতন সমাজ বিশ্বাস করে না।

সুশাসনের বয়ান দেওয়া এসব নেতার অর্থের মূল উৎস কোথায়, তা তদন্ত হওয়া রাষ্ট্রের নীতিগত দায়িত্ব। ডক্টর ইউনূসের হাত ধরে বা তাঁর ছত্রছায়ায় সৃষ্ট তথাকথিত এই প্ল্যাটফর্মগুলো আজ যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জঞ্জাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগে দেশে যদি দশজন চাঁদাবাজ বা সুযোগসন্ধানী থাকত, এখন নতুন ব্যানার ও প্ল্যাটফর্মের আড়ালে আরও নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

এতে জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি, কেবল ললাটে যুক্ত হয়েছে নতুন শোষকের তালিকা। এনসিপি ও জামায়াতের মতো দলগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ড, অদূরদর্শী পদক্ষেপ ও চরম দায়িত্বহীন রাজনৈতিক আচরণ বাংলাদেশকে তার কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পথ থেকে বিচ্যুত করার পাঁয়তারা করছে। তারা একদিকে যেমন বিএনপি বা ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে অনবরত কুৎসা রটাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থে অরাজকতা সৃষ্টির পথ সুগম করছে।

এই ভারসাম্যহীন রাজনীতি মূলত পতিত ও পলাতক ফ্যাসিবাদকেই আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি করে দিচ্ছে। তারা যদি ভেবে থাকে যে ইতিহাস তাদের এই দ্বিচারিতাকে ক্ষমা করবে, তবে তারা ভুলের স্বর্গে বাস করছে। রাজনীতির এই ভুল পদক্ষেপের খেসারত তাদের কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হবে। দেশের এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেবল রাজনীতিবীদদের একাংশের নীতিহীন আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের গভীরেও।

ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রিক রচিত ও সম্প্রতি ফাঁস হওয়া রাকিবুল হাসানের বিতর্কিত অডিও রেকর্ড এর চাক্ষুষ প্রমাণ বহন করে। প্রশাসনকে অকার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা এই অডিও বার্তা থেকে অনুমেয়। এছাড়া রাজধানীর গুলশানে যখন নিষিদ্ধ ও পতাকু আওয়ামী লীগ বেআইনি মিছিল বের করে, তখন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা, পরোক্ষ যোগসাজশ এবং দায়িত্বহীনতা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভয়াবহ ভঙ্গুর দশাকে উন্মোচিত করে।

একইসঙ্গে নোয়াখালীর সেনবাগের এক পুলিশ কর্মকর্তার আওয়ামী লীগ নেতার বাসভবনে গিয়ে ভুড়িভোজে অংশ নেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে ধূলিসাৎ করেছে। সামগ্রিক চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের নীল নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১১ দলীয় জোট, জামায়াত, এনসিপি এবং পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী চক্রের একটি যৌথ অপপ্রয়াস আজ দৃশ্যমান।

এদের পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে তাদের চিরন্তন আশ্রয়দাতা এবং তাদের অনুগত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) সহ এদেশীয় অনুচরেরা। এমনকি প্রশাসনের ভেতরে যারা পূর্বে আওয়ামী সুবিধাবাদী ছিল, তারা আজ রাতারাতি নিজেদের নব্য-বিএনপি কিংবা সংস্কারপন্থী সেজে মুখোশ পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে রয়েছে। তারা ভেতরে ভেতরে সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সুতরাং, সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যারা রাজনীতির নামে বা সংস্কারের নামে প্রকাশ্যে কিংবা পরোক্ষভাবে নাশকতার ইঙ্গিত দেয়, যারা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর বসে পতিত ফ্যাসিবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, এবং যারা বিদেশি এজেন্সির প্রেসক্রিপশনে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়—তাদেরকে অবিলম্বে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।

জননিরাপত্তা রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আত্মস্বীকৃত নাশকতাকারী ও প্রশাসনের ছদ্মবেশী ষড়যন্ত্রকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করাই এই মুহূর্তে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নিজের ও ছেলের নেশার টাকা জোগাতে চুরি করতেন মালেক

আত্মস্বীকৃত নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি

Update Time : 04:24:02 pm, Thursday, 24 September 2026

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দেশবাসী যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা আজ নানামুখী ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা এবং অশুভ অক্ষশক্তির কারণে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

যখন একটি দেশের নাগরিকেরা স্বস্তি ও সুশাসনের আশায় দিন গুনছে, তখন রাজনীতি ও প্রশাসনের একাংশের চরম নীতিহীন আচরণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য জননিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এক বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে দেশের সচেতন মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগ জনক হচ্ছে,জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এনসিপির মিছিল শেষে রাজধানীর নেভিগলিতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য প্রদানকালে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, সরকার সংস্কার ও বিচারের প্রধান তিনটি দাবি মেনে নিলে ঢাকা শহরে আর কোনো ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ ঘটবে না। আপাতদৃষ্টিতে এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক দাবি আদায় সম্পর্কিত মনে হলেও, আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ অত্যন্ত ভয়াবহ ও গভীর স্পর্শকাতর।

একতরফাভাবে এই ধরনের ঘোষণা দেওয়ার মূল অর্থ কী দাঁড়ায়? একটি রাজনৈতিক বা নাগরিক প্ল্যাটফর্মের শীর্ষনেতা যখন নির্দিষ্ট দাবি মানা বা না মানার ওপর দেশের রাজধানী শহরের ককটেল বিস্ফোরণ বা সহিংসতার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে দেন, তখন তা রাষ্ট্রকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করার নামান্তর। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দাবির ভাষা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভাষার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রেখাপাত থাকে।

কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার ভাষা এমন হতে পারে না, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়। পাটওয়ারী সাহেবের দাবি অনুযায়ী, তিন দাবি মানলে ককটেল ফুটবে না—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দাবি না মানলে ককটেল কারা ফুটায়? সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে কি তবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে? অগ্নিসন্ত্রাস ও বিস্ফোরণের এই যে আচ্ছন্ন হুমকি, তা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা নয়।

বরং এই ধরনের বক্তব্য এই সন্দেহকেই প্রগাঢ় করে তোলে যে, দাবির আড়ালে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার একটি পরোক্ষ প্ররোচনা বা যোগসাজশ কাজ করছে। জননিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করা ফৌজদারি অপরাধের শামিল, এবং যারা বক্তব্যের মাধ্যমে বা বাস্তবে এমন সহিংসতার আভাস দেয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার এই স্খলন কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এনসিপির শীর্ষনেতাদের বাস্তব কর্মকাণ্ডেও তা প্রকটভাবে দৃশ্যমান।

যে নেতারা জাতীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুশাসনের বাণী শোনান, সরকারের নানা অসঙ্গতি নিয়ে মুখরোচক সমালোচনা করেন এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে নীতি-আদর্শ শেখাতে মুখিয়ে থাকেন, তাঁদের নিজেদের জীবনযাত্রা ও আচরণের গতিপ্রকৃতি এখন চরম প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে স্মরণ করা যেতে পারে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর চট্টগ্রাম লংমার্চের কথা। ওই কর্মসূচিতে তিনি অত্যন্ত বিলাসবহুল একটি ‘পান্ডু’ গাড়িতে চড়ে অংশ নিয়েছিলেন, যে গাড়িটির মালিকানা ছিল খোদ পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর এক আওয়ামী লীগ নেতার নামে।

যারা ৫ আগস্টের পূর্বে সাধারণ ছাত্রনেতা হিসেবে তিন বেলা আলু-ভর্তা আর ডাল-ভাত খেতে হিমশিম খেতেন, তারা আজ এক অদৃশ্য অলৌকিক ক্ষমতার জোরে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন। বিলাসবহুল গাড়ি, প্রাসাদোপম বাড়ি আর দেদারসে অর্থ উড়ানো—তাদের এই জীবনযাত্রার পেছনে কোনো রূপকথার পরী কিংবা আলাদিনের জিনের ছোঁয়া এসেছে বলে সচেতন সমাজ বিশ্বাস করে না।

সুশাসনের বয়ান দেওয়া এসব নেতার অর্থের মূল উৎস কোথায়, তা তদন্ত হওয়া রাষ্ট্রের নীতিগত দায়িত্ব। ডক্টর ইউনূসের হাত ধরে বা তাঁর ছত্রছায়ায় সৃষ্ট তথাকথিত এই প্ল্যাটফর্মগুলো আজ যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জঞ্জাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগে দেশে যদি দশজন চাঁদাবাজ বা সুযোগসন্ধানী থাকত, এখন নতুন ব্যানার ও প্ল্যাটফর্মের আড়ালে আরও নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

এতে জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি, কেবল ললাটে যুক্ত হয়েছে নতুন শোষকের তালিকা। এনসিপি ও জামায়াতের মতো দলগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ড, অদূরদর্শী পদক্ষেপ ও চরম দায়িত্বহীন রাজনৈতিক আচরণ বাংলাদেশকে তার কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পথ থেকে বিচ্যুত করার পাঁয়তারা করছে। তারা একদিকে যেমন বিএনপি বা ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে অনবরত কুৎসা রটাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থে অরাজকতা সৃষ্টির পথ সুগম করছে।

এই ভারসাম্যহীন রাজনীতি মূলত পতিত ও পলাতক ফ্যাসিবাদকেই আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি করে দিচ্ছে। তারা যদি ভেবে থাকে যে ইতিহাস তাদের এই দ্বিচারিতাকে ক্ষমা করবে, তবে তারা ভুলের স্বর্গে বাস করছে। রাজনীতির এই ভুল পদক্ষেপের খেসারত তাদের কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হবে। দেশের এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেবল রাজনীতিবীদদের একাংশের নীতিহীন আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের গভীরেও।

ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রিক রচিত ও সম্প্রতি ফাঁস হওয়া রাকিবুল হাসানের বিতর্কিত অডিও রেকর্ড এর চাক্ষুষ প্রমাণ বহন করে। প্রশাসনকে অকার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা এই অডিও বার্তা থেকে অনুমেয়। এছাড়া রাজধানীর গুলশানে যখন নিষিদ্ধ ও পতাকু আওয়ামী লীগ বেআইনি মিছিল বের করে, তখন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা, পরোক্ষ যোগসাজশ এবং দায়িত্বহীনতা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভয়াবহ ভঙ্গুর দশাকে উন্মোচিত করে।

একইসঙ্গে নোয়াখালীর সেনবাগের এক পুলিশ কর্মকর্তার আওয়ামী লীগ নেতার বাসভবনে গিয়ে ভুড়িভোজে অংশ নেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে ধূলিসাৎ করেছে। সামগ্রিক চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের নীল নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১১ দলীয় জোট, জামায়াত, এনসিপি এবং পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী চক্রের একটি যৌথ অপপ্রয়াস আজ দৃশ্যমান।

এদের পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে তাদের চিরন্তন আশ্রয়দাতা এবং তাদের অনুগত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) সহ এদেশীয় অনুচরেরা। এমনকি প্রশাসনের ভেতরে যারা পূর্বে আওয়ামী সুবিধাবাদী ছিল, তারা আজ রাতারাতি নিজেদের নব্য-বিএনপি কিংবা সংস্কারপন্থী সেজে মুখোশ পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে রয়েছে। তারা ভেতরে ভেতরে সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সুতরাং, সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যারা রাজনীতির নামে বা সংস্কারের নামে প্রকাশ্যে কিংবা পরোক্ষভাবে নাশকতার ইঙ্গিত দেয়, যারা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর বসে পতিত ফ্যাসিবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, এবং যারা বিদেশি এজেন্সির প্রেসক্রিপশনে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়—তাদেরকে অবিলম্বে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।

জননিরাপত্তা রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আত্মস্বীকৃত নাশকতাকারী ও প্রশাসনের ছদ্মবেশী ষড়যন্ত্রকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করাই এই মুহূর্তে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।