২০০৯ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে সবকিছু হারিয়ে ভিটেমাটি ছেড়েছিল পরিবারটি। প্রায় দেড় দশক পর জন্মমাটি গাবুরায় ফিরলেন মরিয়ম (১৯)। তবে স্বজনদের মাঝে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে নয়, লাশ হয়ে।
নিভে যাওয়া এক জীবনের শেষ আকুতি নিয়ে নিজ শিকড়ে ফেরার এই করুণ দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো উপকূল। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার গভীর রাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চৌদ্দরশি গ্রামে এসে পৌঁছায় মরিয়মের নিথর দেহ। রাত সাড়ে ১১টায় পৌঁছানোর পর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাতেই গোসল ও জানাজা সম্পন্ন হয়।
রাত ১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে। শ্যামনগর থানার ওসি শফিউল আলম পাটোয়ারী লাশ গাবুরায় পৌঁছানো ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আইলার পর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ পরিবার নিয়ে গাবুরা ছাড়তে বাধ্য হন। ঈশ্বরীপুর ও যশোর হয়ে প্রায় আট-দশ বছর আগে তারা পাড়ি জমান ঢাকায়।
মগবাজার ও পল্লবী-কালশী এলাকায় দিনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন মরিয়ম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ঢাকার যান্ত্রিক জীবনের ইতি টেনে অল্প বয়সেই মরিয়মকে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হলো স্বজনদের ফেলে যাওয়া উপকূলের সেই মাটির বুকেই। সোমবার সন্ধ্যায় গাবুরা ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে মরিয়মের বাবার পৈতৃক ভিটায় গিয়ে দেখা যায় এক থমথমে নীরবতা।
ভিটের কোণে নিস্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন বৃদ্ধ দাদা ইউনুস সরদার; প্রিয় নাতনির এই অকালবিদায়ে তিনি বাকরুদ্ধ। মরিয়মের চাচি মুন্নী খাতুন জানান, মরদেহ নিয়ে ৯ জন স্বজন অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হয়ে পদ্মা সেতু ও খুলনার কয়রা পার হয়ে কাশিরহাটখোলা খেয়াঘাট দিয়ে ট্রলারে গাবুরায় পৌঁছান। গভীর রাতে লাশ নামানোর পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে কপোতাক্ষের তীর।
মরিয়মের এই মৃত্যুকে নিছক আত্মহত্যা মানতে নারাজ স্বজনরা। তাদের দাবি, এটি আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ফল। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং—১৩) দায়ের করেছেন। মামলায় মরিয়মের স্বামী গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই মরিয়মের ওপর স্বামী ও সতীন যৌথভাবে চরম নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। তবে আদালতে তোলা হলে প্রধান অভিযুক্ত গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। গ্রেপ্তারকৃত প্রধান আসামি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম নজরুলকে চার দিন এবং মাকসুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আগামী ২২ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। উপকূলের স্বজন হারানো ভিটায় মরিয়মের এই অন্তিম শয়ান কাঁদিয়েছে পুরো গাবুরাবাসীকে। স্থানীয়রা এই রহস্যজনক মৃত্যুর সঠিক তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।


















