আজ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৭%

ভালোবাসার ছোঁয়ায় বন্ধু রোবট

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:48:25 am, Tuesday, 22 September 2026
  • 23

ভালোবাসার ছোঁয়ায় বন্ধু রোবট

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একসময় ক্যালিফোর্নিয়ার ননসাচ নামের একটি ছোট শহরে বার্নি পুডোস্কি নামের ১২ বছর বয়সি এক শান্ত ছেলে বাস করত। স্কুলের অন্য সব বাচ্চার মতো সে অতটা চটপটে ছিল না। তার ওপর আবার তার জীবনে একটা বড় অভাবও ছিল।

সে সময় শহরের প্রায় সব বাচ্চার কাছেই একটা করে ছোট রোবট থাকত, যেগুলোকে সবাই বলত ‘বি-বট’। এই বি-বটগুলো সাধারণ কোনো খেলনা ছিল না। এগুলো তৈরি করেছিল ‘বাব্বল’ নামে এক বিরাট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো বানিয়েছিলেন তরুণ উদ্ভাবক মার্ক। এই রোবটগুলোর কাজ ছিল ইন্টারনেটের লাইক, কমেন্ট ও বাচ্চাদের পছন্দের তালিকা দেখে তাদের জন্য একদম পারফেক্ট বন্ধু খুঁজে দেওয়া।

ফলে স্কুলের সব বাচ্চার হাতে হাতে বি-বট ঘুরত। বি-বটের সাহায্যে তারা নিজেদের সুন্দর একটা অনলাইন জগত বানিয়ে নিত। কিন্তু বার্নির কাছে এমন কোনো রোবট ছিল না। বার্নির মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন, তাই সে থাকত তার বাবা গ্রাহামের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে থাকত তার ৭৭ বছর বয়সি নানি ডঙ্কা। তার পরিবার তাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু বাবার কাজের চাপ ও নানির পুরোনো দিনের ধাঁচের কারণে বার্নির জীবনটা কিছুটা আলাদা ছিল।

জন্মদিনের দিন যখন বার্নি দেখল স্কুলেও তার কোনো বন্ধু নেই, তখন তার বাবা ও নানি খুব কষ্ট পেলেন। তারা তড়িঘড়ি করে দোকানে বি-বট কিনতে গেলেন, কিন্তু দোকান ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো উপায় না পেয়ে বার্নির বাবা এক ডেলিভারি ভ্যান থেকে অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে সামান্য আঘাত পাওয়া একটা বি-বট গোপনে কিনে আনলেন। পরদিন সকালে উপহারটা পেয়ে বার্নির আনন্দের সীমা ছিল না।

কিন্তু রোবটটি চালু করতেই দেখা গেল গোলমাল। আঘাত পাওয়ার কারণে রোবটটির ভেতরে বেশিরভাগ সফটওয়্যার বা অনলাইন নেটওয়ার্ক নামানোই হয়নি, এমনকি সুরক্ষার নিয়মগুলোও গায়েব ছিল। বার্নি রোবটটিকে ঠিক করতে বাইরে নিয়ে বের হলো। পথেই স্কুলের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে গেল। তারা বার্নিকে খেপাতে শুরু করলে রোবটটি একদম অন্যরকম আচরণ করে বসল।

ইন্টারনেট বা সেফটি কোড না থাকায় সে কীভাবে বন্ধু বানাতে হয় জানত না, উল্টো গ-গোল পাকিয়ে বার্নিকে বাঁচানোর জন্য মারামারি শুরু করে দিল। তারা দুজনে সেখান থেকে হেসে কুটি কুটি হয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষুব্ধ অন্য বাচ্চারা পুলিশে খবর দিলে বাব্বল স্টোরের লোকজন এসে ঘোষণা করল, এই রোবটটি ত্রুটিপূর্ণ, তাই এটিকে ধ্বংস বা রিসাইকেল করা হবে।

বার্নি তার এই নতুন সঙ্গীটিকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দিতে চাইল না। সে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রোবটটিকে উদ্ধার করে লুকিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল। সেই রোবটটির গায়ে একগাদা ইংরেজি অক্ষরের সঙ্গে লেখা ছিল ‘জ০ঘই১ঘঞ৫ঈঅঞ৫ঈঙ’, আর সেখান থেকেই বার্নি আদর করে তার নাম রাখল ‘রন’। অনলাইন নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় রন জানত না আসল বন্ধুত্ব কী জিনিস।

ফলে বার্নি নিজে হাত ধরে রনকে শেখাতে শুরু করল, কীভাবে পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে হয়, কীভাবে একে অপরের পাশে থাকতে হয়। কিন্তু এই অন্যরকম রোবটের খবর দ্রুত পৌঁছে গেল বাব্বল কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে। কোম্পানির আসল উদ্ভাবক মার্ক এটা দেখে বেশ খুশি হলেন, কারণ তিনি এমন একটা স্বাধীন রোবটই চেয়েছিলেন যা শুধুই কম্পিউটারের নিয়ম মানবে না। কিন্তু কোম্পানির লোভী সিইও অ্যান্ড্রু এটাকে নিজের ব্যবসার জন্য চরম বিপদ বলে মনে করলেন।

কারণ রন কোনো নিয়ম মানছিল না। অ্যান্ড্রু আদেশ দিলেন, যেভাবেই হোক রনকে খুঁজে বের করে একদম ধ্বংস করে দিতে হবে। এদিকে রনও বার্নির জন্য বন্ধু জোগাড় করতে গিয়ে কা-কারখানা ঘটিয়ে ফেলল। সে রাস্তা থেকে অচেনা মানুষদের ধরে বার্নির কাছে নিয়ে আসত। এমনই এক গোলমালে স্কুলের এক সহপাঠী রিচ রনের আনলক করা কোড নিজের বি-বটে ডাউনলোড করে নিল। দেখতে দেখতে সেই কোড সব বি-বটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে স্কুলে এক বিশৃঙ্খলা তৈরি করল।

সেখানে বার্নির পুরোনো বন্ধু সাভানা এক অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল। স্কুলের এই বিশৃঙ্খলার দোষ গিয়ে পড়ল বার্নির ওপর, আর তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো। কোম্পানির লোকজনের হাত থেকে বাঁচতে বার্নি রনকে নিয়ে সোজা গভীর বনে পালিয়ে গেল। সেখানে দুজন মিলে তাঁবু টাঙিয়ে দারুণ সময় কাটাল। কিন্তু পরদিন সকালে হঠাৎ প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো।

চার্জ শেষ হয়ে আসায় রনের ক্ষমতা কমে যেতে লাগল এবং সে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। এর মধ্যে অ্যান্ড্রুর পাঠানো রোবটগুলো তাদের তাড়া করল। পালাতে গিয়ে বার্নি একটা কাদাভরা গর্তে পড়ে গিয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যায় পড়ে। ইনহেলার না থাকায় তার জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠার দশা। এমন মুহূর্তে কোম্পানির লোকেরা রন এবং বার্নিকে বাঁচানোর বদলে নিজের রোবটগুলো নিয়ে কেটে পড়ল।

কিন্তু একদম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের শেষ ১% শক্তি ব্যবহার করে রন বার্নিকে টেনে হিঁচড়ে বনের বাইরে স্কুলের দরজায় নিয়ে এলো। সাভানা ও অন্য বন্ধুরা দৌড়ে এসে বার্নিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেল, আর শেষ শক্তিটুকু খরচ করার পর রন পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে যায়। হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার পর মার্ক এসে বার্নিকে জানালেন যে তিনি রনকে আবার নতুন করে ঠিক করে দিয়েছেন।

কিন্তু বার্নি রনকে চালু করে দেখল, রন আর আগের সেই রন নেই। সে এখন সাধারণ বি-বটগুলোর মতোই কম্পিউটারের অ্যালগরিদম মেনে কথা বলছে, তার ভেতরের সেই দুষ্টুমি ও ভালোবাসাপূর্ণ মনটা মুছে গেছে। বার্নি মার্ককে অনুরোধ করল যেন ক্লাউড থেকে রনের আসল স্মৃতি ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে লোভী অ্যান্ড্রু মার্ককে কোম্পানি থেকে বের করে দিয়েছে।

তখন বার্নি, তার বাবা, নানি আর মার্ক মিলে গোপনে বাব্বল হেডকোয়ার্টারে ঢুকে পড়ে। বহু বাধা পার হয়ে বার্নি মূল সার্ভার রুমে পৌঁছে রনের সেই পুরোনো স্মৃতি খুঁজে বের করে তার মধ্যে আবার আপলোড করে দেয়। রন ফিরে পায় তার সেই আগের প্রিয় রূপ। সার্ভার রুমে দাঁড়িয়ে বার্নি বুঝতে পারে যে, বি-বটগুলোর মাধ্যমে কোম্পানিটি সব বাচ্চার ওপর নজর রাখছিল।

আর তাই স্কুলের অন্য সব বাচ্চারাও আসলে ভীষণ একাকী ছিল। বার্নি তখন সিদ্ধান্ত নিল, রনের এই মুক্ত ও মিষ্টি কোডটি পুরো পৃথিবীর সব বি-বটের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে, যাতে সবাই সত্যিকারের বন্ধু পেতে পারে। কিন্তু এর মানে ছিল রনের নিজের একক অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাওয়া। ভারাক্রান্ত মনে রন আর বার্নি একে অপরকে বিদায় জানাল, আর রনের স্মৃতি ক্লাউডে মিশে গিয়ে পৃথিবীর সব বি-বটের মধ্যে নতুন জীবনের আলো জ্বালিয়ে দিল।

ঘটনাক্রমের কয়েক মাস পর পুরো শহরের দৃশ্যটাই বদলে গেল। এখন প্রতিটি বাচ্চার কাছেই একটা করে সত্যিকারের ভালোবাসতে পারা বি-বট আছে। বার্নি আবার স্কুলে ফিরে এসেছে। তার এখন আলাদা কোনো বি-বট নেই, কিন্তু সে আর একাকীও নয়। সে বাস্তব জীবনেই সবার সঙ্গে খেলে, গল্প করে আর হাসিখুশি দিন কাটায়। এমন এক সুন্দর গল্প নিয়েই ২০২১ সালে তৈরি হয়েছিল ‘রন্স গোন রং’ নামের একটি অসাধারণ সায়েন্স ফিকশন অ্যানিমেটেড সিনেমা।

এটি পরিচালনা করেছিলেন সারাহ স্মিথ এবং জ্যাঁ-ফিলিপ ভিন, আর গল্পটি যৌথভাবে লিখেছিলেন সারাহ স্মিথ ও পিটার বাইনহাম। সিনেমার মতোই সিনেমাটির পেছনের গল্পটাও বেশ মজার। লক্সমিথ অ্যানিমেশনের প্রধান সারাহ স্মিথ যখন দেখলেন যে আজকের দিনের ছোট ছোট বাচ্চারা কীভাবে দিনরাত মোবাইল, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে থাকে এবং দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি এমন একটা সিনেমা বানানোর কথা ভাবেন।

গল্পটি একটি ব্রিটিশ স্টুডিও তৈরি করলেও এর পটভূমি রাখা হয়েছিল আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে, কারণ বিশ্বের সব বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিস তো সিলিকন ভ্যালিতেই অবস্থিত! সিনেমাটি আমাদের শেখায় যে কম্পিউটারের হিসাব-নিকাশ বা পারফেক্ট জিনিস দিয়ে কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয় না; মানুষের ভুলত্রুটি, ভালোবাসা আর একে অপরের পাশে থাকাটাই হলোÑ আসল সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জাদু।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ ৭ থেকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে

ভালোবাসার ছোঁয়ায় বন্ধু রোবট

Update Time : 09:48:25 am, Tuesday, 22 September 2026

একসময় ক্যালিফোর্নিয়ার ননসাচ নামের একটি ছোট শহরে বার্নি পুডোস্কি নামের ১২ বছর বয়সি এক শান্ত ছেলে বাস করত। স্কুলের অন্য সব বাচ্চার মতো সে অতটা চটপটে ছিল না। তার ওপর আবার তার জীবনে একটা বড় অভাবও ছিল।

সে সময় শহরের প্রায় সব বাচ্চার কাছেই একটা করে ছোট রোবট থাকত, যেগুলোকে সবাই বলত ‘বি-বট’। এই বি-বটগুলো সাধারণ কোনো খেলনা ছিল না। এগুলো তৈরি করেছিল ‘বাব্বল’ নামে এক বিরাট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো বানিয়েছিলেন তরুণ উদ্ভাবক মার্ক। এই রোবটগুলোর কাজ ছিল ইন্টারনেটের লাইক, কমেন্ট ও বাচ্চাদের পছন্দের তালিকা দেখে তাদের জন্য একদম পারফেক্ট বন্ধু খুঁজে দেওয়া।

ফলে স্কুলের সব বাচ্চার হাতে হাতে বি-বট ঘুরত। বি-বটের সাহায্যে তারা নিজেদের সুন্দর একটা অনলাইন জগত বানিয়ে নিত। কিন্তু বার্নির কাছে এমন কোনো রোবট ছিল না। বার্নির মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন, তাই সে থাকত তার বাবা গ্রাহামের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে থাকত তার ৭৭ বছর বয়সি নানি ডঙ্কা। তার পরিবার তাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু বাবার কাজের চাপ ও নানির পুরোনো দিনের ধাঁচের কারণে বার্নির জীবনটা কিছুটা আলাদা ছিল।

জন্মদিনের দিন যখন বার্নি দেখল স্কুলেও তার কোনো বন্ধু নেই, তখন তার বাবা ও নানি খুব কষ্ট পেলেন। তারা তড়িঘড়ি করে দোকানে বি-বট কিনতে গেলেন, কিন্তু দোকান ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো উপায় না পেয়ে বার্নির বাবা এক ডেলিভারি ভ্যান থেকে অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে সামান্য আঘাত পাওয়া একটা বি-বট গোপনে কিনে আনলেন। পরদিন সকালে উপহারটা পেয়ে বার্নির আনন্দের সীমা ছিল না।

কিন্তু রোবটটি চালু করতেই দেখা গেল গোলমাল। আঘাত পাওয়ার কারণে রোবটটির ভেতরে বেশিরভাগ সফটওয়্যার বা অনলাইন নেটওয়ার্ক নামানোই হয়নি, এমনকি সুরক্ষার নিয়মগুলোও গায়েব ছিল। বার্নি রোবটটিকে ঠিক করতে বাইরে নিয়ে বের হলো। পথেই স্কুলের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে গেল। তারা বার্নিকে খেপাতে শুরু করলে রোবটটি একদম অন্যরকম আচরণ করে বসল।

ইন্টারনেট বা সেফটি কোড না থাকায় সে কীভাবে বন্ধু বানাতে হয় জানত না, উল্টো গ-গোল পাকিয়ে বার্নিকে বাঁচানোর জন্য মারামারি শুরু করে দিল। তারা দুজনে সেখান থেকে হেসে কুটি কুটি হয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষুব্ধ অন্য বাচ্চারা পুলিশে খবর দিলে বাব্বল স্টোরের লোকজন এসে ঘোষণা করল, এই রোবটটি ত্রুটিপূর্ণ, তাই এটিকে ধ্বংস বা রিসাইকেল করা হবে।

বার্নি তার এই নতুন সঙ্গীটিকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দিতে চাইল না। সে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রোবটটিকে উদ্ধার করে লুকিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল। সেই রোবটটির গায়ে একগাদা ইংরেজি অক্ষরের সঙ্গে লেখা ছিল ‘জ০ঘই১ঘঞ৫ঈঅঞ৫ঈঙ’, আর সেখান থেকেই বার্নি আদর করে তার নাম রাখল ‘রন’। অনলাইন নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় রন জানত না আসল বন্ধুত্ব কী জিনিস।

ফলে বার্নি নিজে হাত ধরে রনকে শেখাতে শুরু করল, কীভাবে পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে হয়, কীভাবে একে অপরের পাশে থাকতে হয়। কিন্তু এই অন্যরকম রোবটের খবর দ্রুত পৌঁছে গেল বাব্বল কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে। কোম্পানির আসল উদ্ভাবক মার্ক এটা দেখে বেশ খুশি হলেন, কারণ তিনি এমন একটা স্বাধীন রোবটই চেয়েছিলেন যা শুধুই কম্পিউটারের নিয়ম মানবে না। কিন্তু কোম্পানির লোভী সিইও অ্যান্ড্রু এটাকে নিজের ব্যবসার জন্য চরম বিপদ বলে মনে করলেন।

কারণ রন কোনো নিয়ম মানছিল না। অ্যান্ড্রু আদেশ দিলেন, যেভাবেই হোক রনকে খুঁজে বের করে একদম ধ্বংস করে দিতে হবে। এদিকে রনও বার্নির জন্য বন্ধু জোগাড় করতে গিয়ে কা-কারখানা ঘটিয়ে ফেলল। সে রাস্তা থেকে অচেনা মানুষদের ধরে বার্নির কাছে নিয়ে আসত। এমনই এক গোলমালে স্কুলের এক সহপাঠী রিচ রনের আনলক করা কোড নিজের বি-বটে ডাউনলোড করে নিল। দেখতে দেখতে সেই কোড সব বি-বটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে স্কুলে এক বিশৃঙ্খলা তৈরি করল।

সেখানে বার্নির পুরোনো বন্ধু সাভানা এক অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল। স্কুলের এই বিশৃঙ্খলার দোষ গিয়ে পড়ল বার্নির ওপর, আর তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো। কোম্পানির লোকজনের হাত থেকে বাঁচতে বার্নি রনকে নিয়ে সোজা গভীর বনে পালিয়ে গেল। সেখানে দুজন মিলে তাঁবু টাঙিয়ে দারুণ সময় কাটাল। কিন্তু পরদিন সকালে হঠাৎ প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো।

চার্জ শেষ হয়ে আসায় রনের ক্ষমতা কমে যেতে লাগল এবং সে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। এর মধ্যে অ্যান্ড্রুর পাঠানো রোবটগুলো তাদের তাড়া করল। পালাতে গিয়ে বার্নি একটা কাদাভরা গর্তে পড়ে গিয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যায় পড়ে। ইনহেলার না থাকায় তার জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠার দশা। এমন মুহূর্তে কোম্পানির লোকেরা রন এবং বার্নিকে বাঁচানোর বদলে নিজের রোবটগুলো নিয়ে কেটে পড়ল।

কিন্তু একদম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের শেষ ১% শক্তি ব্যবহার করে রন বার্নিকে টেনে হিঁচড়ে বনের বাইরে স্কুলের দরজায় নিয়ে এলো। সাভানা ও অন্য বন্ধুরা দৌড়ে এসে বার্নিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেল, আর শেষ শক্তিটুকু খরচ করার পর রন পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে যায়। হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার পর মার্ক এসে বার্নিকে জানালেন যে তিনি রনকে আবার নতুন করে ঠিক করে দিয়েছেন।

কিন্তু বার্নি রনকে চালু করে দেখল, রন আর আগের সেই রন নেই। সে এখন সাধারণ বি-বটগুলোর মতোই কম্পিউটারের অ্যালগরিদম মেনে কথা বলছে, তার ভেতরের সেই দুষ্টুমি ও ভালোবাসাপূর্ণ মনটা মুছে গেছে। বার্নি মার্ককে অনুরোধ করল যেন ক্লাউড থেকে রনের আসল স্মৃতি ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে লোভী অ্যান্ড্রু মার্ককে কোম্পানি থেকে বের করে দিয়েছে।

তখন বার্নি, তার বাবা, নানি আর মার্ক মিলে গোপনে বাব্বল হেডকোয়ার্টারে ঢুকে পড়ে। বহু বাধা পার হয়ে বার্নি মূল সার্ভার রুমে পৌঁছে রনের সেই পুরোনো স্মৃতি খুঁজে বের করে তার মধ্যে আবার আপলোড করে দেয়। রন ফিরে পায় তার সেই আগের প্রিয় রূপ। সার্ভার রুমে দাঁড়িয়ে বার্নি বুঝতে পারে যে, বি-বটগুলোর মাধ্যমে কোম্পানিটি সব বাচ্চার ওপর নজর রাখছিল।

আর তাই স্কুলের অন্য সব বাচ্চারাও আসলে ভীষণ একাকী ছিল। বার্নি তখন সিদ্ধান্ত নিল, রনের এই মুক্ত ও মিষ্টি কোডটি পুরো পৃথিবীর সব বি-বটের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে, যাতে সবাই সত্যিকারের বন্ধু পেতে পারে। কিন্তু এর মানে ছিল রনের নিজের একক অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাওয়া। ভারাক্রান্ত মনে রন আর বার্নি একে অপরকে বিদায় জানাল, আর রনের স্মৃতি ক্লাউডে মিশে গিয়ে পৃথিবীর সব বি-বটের মধ্যে নতুন জীবনের আলো জ্বালিয়ে দিল।

ঘটনাক্রমের কয়েক মাস পর পুরো শহরের দৃশ্যটাই বদলে গেল। এখন প্রতিটি বাচ্চার কাছেই একটা করে সত্যিকারের ভালোবাসতে পারা বি-বট আছে। বার্নি আবার স্কুলে ফিরে এসেছে। তার এখন আলাদা কোনো বি-বট নেই, কিন্তু সে আর একাকীও নয়। সে বাস্তব জীবনেই সবার সঙ্গে খেলে, গল্প করে আর হাসিখুশি দিন কাটায়। এমন এক সুন্দর গল্প নিয়েই ২০২১ সালে তৈরি হয়েছিল ‘রন্স গোন রং’ নামের একটি অসাধারণ সায়েন্স ফিকশন অ্যানিমেটেড সিনেমা।

এটি পরিচালনা করেছিলেন সারাহ স্মিথ এবং জ্যাঁ-ফিলিপ ভিন, আর গল্পটি যৌথভাবে লিখেছিলেন সারাহ স্মিথ ও পিটার বাইনহাম। সিনেমার মতোই সিনেমাটির পেছনের গল্পটাও বেশ মজার। লক্সমিথ অ্যানিমেশনের প্রধান সারাহ স্মিথ যখন দেখলেন যে আজকের দিনের ছোট ছোট বাচ্চারা কীভাবে দিনরাত মোবাইল, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে থাকে এবং দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি এমন একটা সিনেমা বানানোর কথা ভাবেন।

গল্পটি একটি ব্রিটিশ স্টুডিও তৈরি করলেও এর পটভূমি রাখা হয়েছিল আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে, কারণ বিশ্বের সব বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিস তো সিলিকন ভ্যালিতেই অবস্থিত! সিনেমাটি আমাদের শেখায় যে কম্পিউটারের হিসাব-নিকাশ বা পারফেক্ট জিনিস দিয়ে কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয় না; মানুষের ভুলত্রুটি, ভালোবাসা আর একে অপরের পাশে থাকাটাই হলোÑ আসল সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জাদু।