পাহাড়ের কোলঘেঁষা ছোট্ট গ্রামটির নাম ছিল মেঘঝরনা। গ্রামের ঠিক ওপরে ছিল এক অদ্ভুত কালো পাহাড়। পাহাড়টির গায়ে হাজারো পাথর, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিদিন সকালে দেখা যেত কিছু বড় বড় পাথর যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
গ্রামের বয়স্করা বলতেন, ‘ওই পাহাড়ে থাকে পাথর খেকো পাহাড়ি দৈত্য। রাত হলেই সে বেরিয়ে আসে। দাঁত দিয়ে পাথর চিবিয়ে খায়, আর সেই শব্দে পাহাড় কেঁপে ওঠে। ’ এই গল্প শুনে গ্রামের অন্য শিশুরা ভয় পেত। কিন্তু ১২ বছরের সাহসী ছেলে রুদ্রের মনে ভয় নয়, বরং কৌতূহল জন্মাল। এক পূর্ণিমার রাতে রুদ্র তার বন্ধু মিতুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে রওনা দিল।
সঙ্গে ছিল একটি টর্চ, একটি বাঁশি আর দাদুর দেওয়া ছোট্ট লোহার ঘণ্টা। পাহাড়ের গুহার কাছে পৌঁছাতেই চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। হঠাৎÑ কড়মড়… কড়মড়… কড়মড়…! মনে হলোÑ যেন কেউ বিশাল পাথর চিবিয়ে খাচ্ছে। টর্চের আলো ফেলতেই তারা দেখল, বিশাল এক ছায়ামূর্তি। তার গায়ের রং ধূসর পাথরের মতো, চোখ দুটো জ্বলছে আগুনের মতো লাল।
দাঁতগুলো লোহার শাবলের মতো ধারালো। সে এক হাতে পাহাড় থেকে পাথর ছিঁড়ে এনে মুখে পুরে দিচ্ছে। দৈত্যটি হঠাৎ তাদের গন্ধ পেয়ে গর্জে উঠল। Ñ‘মানুষের বাচ্চা! আমার খাবারের সময় এখানে কেন? ’ তার গর্জনে গুহার ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল। রুদ্র ভয়ে কাঁপলেও দৌড়াল না। সে বলল, ‘তুমি এত পাথর খাও কেন? ’ দৈত্যটি হেসে উঠল।
Ñ‘আমি না খেলে পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার শক্তি জেগে উঠবে। আমি সেই শক্তিকে আটকে রাখি। কিন্তু আজ আমি খুব ক্ষুধার্ত। ’ ঠিক তখনই পাহাড় কেঁপে উঠল। গুহার গভীর থেকে ভেসে এলো কালো ধোঁয়া। ধোঁয়ার ভেতর শত শত জ্বলন্ত চোখ। দৈত্যটি চিৎকার করল, ‘দেরি হয়ে গেছে! ’ কালো ধোঁয়া মুহূর্তে বিশাল ছায়াদানবে পরিণত হলো।
তার হাত নেই, পা নেইÑ শুধু লম্বা ধোঁয়ার দেহ আর অসংখ্য চোখ। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আজ পাহাড় আমার হবে…’ চারদিকে ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল। গাছের ডাল নিজেরাই দুলছে। পাহাড়ের পাথর ফেটে ফেটে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দৈত্যটি একের পর এক পাথর খেতে লাগল। প্রতিবার পাথর চিবোতেই তার শরীর আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। কিন্তু ছায়াদানবও ক্রমে বড় হচ্ছে।
রুদ্রের হঠাৎ দাদুর কথা মনে পড়ল। ‘অশুভ শক্তি অদ্ভুত শব্দ সহ্য করতে পারে না। ’ সে লোহার ঘণ্টাটি জোরে বাজাতে লাগল। টান… টান… টান… মিতুও বাঁশিতে তীক্ষè সুর তুলল। সঙ্গে সঙ্গে ছায়াদানব যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। তার জ্বলন্ত চোখগুলো একে একে নিভে যেতে লাগল। সুযোগ বুঝে পাথর খেকো দৈত্য পাহাড়ের সবচেয়ে বড় নীল পাথরটি তুলে গিলে ফেলল।
মুহূর্তেই পাহাড় কেঁপে উঠে প্রচ- আলো ছড়িয়ে দিল। ছায়াদানব ভেঙে হাজার হাজার কালো ধুলিকণায় মিলিয়ে গেল। গুহার ভেতর নেমে এলো গভীর নীরবতা। দৈত্যটি হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল। তার ভয়ংকর চোখে এবার কোমল আলো। সে বলল, ‘অনেক বছর পর কেউ আমাকে ভয় না পেয়ে সাহায্য করল। ’ তারপর সে নিজের বুক থেকে একটি ছোট্ট নীল পাথর বের করে রুদ্রের হাতে দিল।
‘এটি সাহসের পাথর। যতদিন এটি তোমার কাছে থাকবে, অন্ধকারকে দেখে ভয় পাবে না। ’ ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই বিশাল দৈত্যটি ধীরে ধীরে পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। আজও সেই মূর্তি পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। এরপর থেকে আর কখনো পাহাড়ের পাথর রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যায়নি। তবে পূর্ণিমার নীরব রাতে কেউ যদি মন দিয়ে শোনে, দূর পাহাড়ের বুক থেকে কখনো কখনো খুব ক্ষীণ এক কড়মড়… কড়মড়… শব্দ ভেসে আসে।
গ্রামের মানুষ তখন জানেÑ সাহস, সতর্কতা আর সৎ হৃদয়ের গল্প পাহাড় কখনো ভুলে যায় না।



















