জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া নরসিংদীতে মাত্র ৫ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে নরসিংদী জেলার নান্দনিক ও সৃজনশীল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য জেলাবাসী গর্ববোধ করছেন।
এক কথায় সাহস, সততা এবং কর্মযোগ্যতা দিয়ে নরসিংদীর মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। প্রতিটি সমাজেই কিছু নির্মোহ মানুষ থাকেন, যারা তাদের নিজস্ব আলোয় আলোকিত করেছেন রাষ্ট্র এবং মুক্ত জীবনের প্রাঙ্গণ। উদ্ভাসিত করেন সমাজ-সংসার। বিকশিত করেন সামাজিক মূল্যবোধ, আর্তমানবতার সেবায় আর অসহায়দের কল্যাণে নিবেদিত করেন জীবনের অফুরান সময়।
যারা তাদের সৎ ও আদর্শিক কর্মপ্রতিভার দীপ্তি দিয়ে মুক্ত আকাশে শুকতারা হয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলেন। তেমনি একটি তারার নাম ইসরাত জাহান কেয়া। যিনি তার স্বীয় কর্মপ্রতিভার বিচ্ছুরণ দিয়ে স্পর্শ করে চলেছেন প্রতিটি মানুষের মন। ইসরাত জাহান কেয়া মনে করেন, প্রতিটি মানুষ যদি তার স্বীয় কর্মকে সৃষ্টিশীলতা দিয়ে আন্তরিকতার সাথে সর্বোচ্চ নিপুণভাবে সম্পন্ন করেন তবে তা অবশ্যই প্রশংসিত হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, আমি অ্যাওয়ার্ড বা পুরস্কার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় কোন কাজ করি না। আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব, নীতি এবং আদর্শের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ সৃজনশীলতা ও আন্তরিকতা দিয়ে করার চেষ্টা করি। এতে যদি কোন প্রাপ্তি এসে যায় নিশ্চয়ই তা আমাকে প্রেরণা জোগায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বখ্যাত অন্ধ লেখিকা হেলেন কেলার আমাদের মতো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন আমি অন্ধ, তোমরা যারা দেখতে পাও তাদের একটা কথা আমি বলে যেতে চাই, চোখ দুটোকে তোমরা এমনভাবে ব্যবহার করো যেন আগামীকালই তুমি অন্ধ হয়ে যাবে, আর দেখবে না। তোমার অপর সব ইন্দ্রিয়ের বেলায়ও এমন করেই ভাবতে শেখো। সুরের আওয়াজ, পাখির গান, বাদ্যকারের বাজনা এমনভাবে শুনবে যেন কালই তুমি বধির হয়ে যাবে।
প্রতিটি জিনিস এমনভাবে ছুঁয়ে দেখবে যেন সর্বশক্তি অবলুপ্ত হবে আগামীকালই। এভাবে নেবে ফুলের ঘ্রান, আর খাদ্যের স্বাদ, যেন আগামীকাল আর গন্ধ কিংবা স্বাদের অনুভ‚তি অবশিষ্ট থাকবে না। সব ইন্দ্রিয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করো, প্রকৃতির সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করো। হেলেন কেলারের এই উক্তিগুলোর মতোই যদি যে কোনো কাজে ইচ্ছে শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করি, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে স্বীয় কর্মকে সম্পন্ন করা যায় নিশ্চয়ই প্রশংসিত হবে।
ইসরাত জাহান কেয়া ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার শুভাঢ্যা গ্রামের এক সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতার নাম মো. মাহাবুব আলী। পারিবারিক ঐতিহ্যগত কারণেই ইসরাত জাহান কেয়া জাতীয়তাবাদী আদর্শিক চেতনায় বড় হয়েছেন। যার ফলে তার সকল কাজে জাতীয়তাবাদী আদর্শিক চেতনা লক্ষ্য করা যায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ই ও স্বপ্নচারী নারী।
তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেন। ইসরাত জাহান কেয়া ২৮তম ব্যাচে বাংলাদেশ সিভিল সাভির্সের প্রসাশন ক্যাডারে যোগদান করেন। জেলা প্রশাসক নরসিংদী হিসেবে পদায়ন হওয়ার আগে তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত ছিলেন। তিনি চলতি ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল নরসিংদী জেলার ২২তম জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন।
এ জেলায় তিনি দ্বিতীয় নারী জেলা প্রশাসক। ইসরাত জাহান কেয়া নরসিংদীতে যোগদানের পর থেকে যেসব কাজে নরসিংদী জেলার নান্দনিক সৃজনশীল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য এখানকার মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন সেগুলো হচ্ছে- নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয় শিবপুর উপজেলার কারারচর গ্রামের বাসিন্দা মো: সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) ও তার ১৮ মাস বয়সি শিশু সাফওয়ান ওরফে হাসেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয় এবং সুজন মিয়ার হাতে অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পূর্বেরচর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা হারেছা বেগম (৭০) এর পরিবারের ৬ জন সদস্যই প্রতিবন্ধী।
এ পরিবারটির দূরবস্থার কথা চিন্তা করে মানবতার ফেরিওয়ালা নরসিংদী জেলা প্রসাশক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করেন এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াশোনা করার জন্য আসবাবপত্র ও ১টি গাভী প্রদান করেন। পরে তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে প্রেরণ করেন।
ইতিমধ্যে তাদের ৩ জনের চোখের চিকিৎসা ও প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ও এনজিও প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের আর্থিক সহযোগিতায় ১টি টিনের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে নরসিংদী-৫ রায়পুরা থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এর পক্ষ থেকে এই পরিবারটিকে আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করেন।
এ ছাড়াও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইমরান নামে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এক মেধাবী শিক্ষার্থীকে ১টি ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। ইসরাত জাহান কেয়া মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বুধবার দিনব্যাপী গণশুনানি করেন। গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নিয়ে দ্রুত সমাধান করেন।
এ ছাড়া ফুলকুঁড়ি পোটর্স ২০২৬, মাদকমুক্ত নরসিংদী গড়া, রাস্তাঘাট নির্মাণ, কিশোরগ্যাং মুক্ত নরসিংদী, ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ, যানজট নিরশন, চিকিৎসা ব্যবস্থা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেনতা বৃদ্ধি ও পরিস্কার পরিচ্ছনতার ওপর গুরুত্বআরোপ, অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ, ভেজাল খাদ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ভ‚মি সেবার উন্নয়ন এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের স্মৃতিকে চিরস্বরণীয় করে রাখতে নান্দনিক স্মৃতি মুর‌্যাল নির্মাণসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে সর্বমহলে প্রশংসায় ভাসছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া।



















