আজ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

সোনার দরপতনের আভাস: বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:55:57 pm, Saturday, 19 September 2026
  • 18

সোনার দরপতনের আভাস: বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড গড়ে প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ৬০২ ডলারে ঠেকেছিল এবং বাংলাদেশেও প্রতি ভরি সোনা দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে গত কয়েক মাসে বাজারে একটি নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে সামনে সোনার দাম আরও কমবে নাকি আবারও লাফ দিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমছে কেন?

শুরু করা যাক আন্তর্জাতিক বাজার দিয়ে। বছরের শুরুতে যে সোনা ৫ হাজার ৬০০ ডলারের ওপরে ছিল, তা কমতে কমতে এখন ৪ হাজার ৩৫০ বা তার আশপাশে নেমে এসেছে। দাম কমার পেছনে মূলত দুটো বড় কারণ কাজ করছে:

১. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ২. মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতি: আমেরিকার সেন্ট্রাল ব্যাংক বা ফেড সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে চড়া রাখতে পারে। অর্থনীতিতে সুদের হার বাড়লে মানুষ সোনা থেকে মুখ ফেরিয়ে নেয়, কারণ সোনার কোনো নিজস্ব সুদ নেই; কিন্তু ব্যাংকে টাকা রাখলে নিশ্চিত লাভ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার কারণেও বাজারে একটা ধাক্কা লেগেছে। ফলে সব মিলিয়ে স্বর্ণের দাম কিছুটা চাপে পড়ে নিচের দিকে নেমেছে।

কেন সোনা সরিয়ে নিচ্ছে বড় দেশগুলো?

নানা জল্পনা-কল্পনার মাঝে এবার সবচেয়ে বড় একটা চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় জমা রাখা তাদের নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ দ্রুত দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেমন—নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা উত্তর আমেরিকা থেকে টনকে টন সোনা নিজেদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু কেন এমন করছে তারা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে কালকেই দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে বা কোনো বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসছে। বরং বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে দেশগুলো এখন অনেক বেশি সতর্ক। তারা বুঝে গেছে, বিপদের দিনে নিজের সোনা নিজের দেশের কাছে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।

এবার আসা যাক আমাদের দেশের বাজারে। মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশে এক ভরি সোনা ছিল এক লাখ টাকার ঘরে। আর চলতি বছরে এসে তা ছাড়িয়ে গেছে দুই লাখ কুড়ি থেকে ত্রিশ হাজার টাকার ঘর।

যদিও গত কিছুদিন ধরে দাম কিছুটা ওঠানামার মধ্যে আছে, তবুও সাধারণ ক্রেতাদের হাত এখন প্রায় শূন্য। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) পরিষ্কার জানিয়েছে, রাশিয়া রিজার্ভের সোনা বিক্রি করছে, অন্যদিকে চীন প্রতি মাসে গহনা বা সোনা কিনে রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা কমা এবং যুদ্ধের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কিনে জমা করছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দাম কি আরও কমবে? অর্থনীতিবিদ এবং খাতসংশ্লিষ্টরা একবাক্যে বলছেন—না। বর্তমান অবস্থা থেকে সোনার দাম খুব বেশি কমার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, গত চার বছর ধরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি বছর গড়ে এক হাজার টন সোনা জমা করছে, যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ। বিখ্যাত গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

বিশেষজ্ঞ ড. আহসান হাবীবের মতে, সোনাকে মূলত একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখনই অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, মানুষ হু হু করে সোনার দিকে ছুটে চলে। আর ঠিক এই কারণেই ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সোনা কেনা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সারকথা হলো—স্বল্পসময়ের জন্য সুদের হার বা বাজারের চালে সোনার দামে একটু উনিশ-বিশ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে সোনা তার দীপ্তি হারাবে না; বরং এর দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সম্ভাবনাই শতভাগ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

রাঙ্গাবালীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

সোনার দরপতনের আভাস: বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন

Update Time : 02:55:57 pm, Saturday, 19 September 2026

চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড গড়ে প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ৬০২ ডলারে ঠেকেছিল এবং বাংলাদেশেও প্রতি ভরি সোনা দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে গত কয়েক মাসে বাজারে একটি নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে সামনে সোনার দাম আরও কমবে নাকি আবারও লাফ দিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমছে কেন?

শুরু করা যাক আন্তর্জাতিক বাজার দিয়ে। বছরের শুরুতে যে সোনা ৫ হাজার ৬০০ ডলারের ওপরে ছিল, তা কমতে কমতে এখন ৪ হাজার ৩৫০ বা তার আশপাশে নেমে এসেছে। দাম কমার পেছনে মূলত দুটো বড় কারণ কাজ করছে:

১. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ২. মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতি: আমেরিকার সেন্ট্রাল ব্যাংক বা ফেড সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে চড়া রাখতে পারে। অর্থনীতিতে সুদের হার বাড়লে মানুষ সোনা থেকে মুখ ফেরিয়ে নেয়, কারণ সোনার কোনো নিজস্ব সুদ নেই; কিন্তু ব্যাংকে টাকা রাখলে নিশ্চিত লাভ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার কারণেও বাজারে একটা ধাক্কা লেগেছে। ফলে সব মিলিয়ে স্বর্ণের দাম কিছুটা চাপে পড়ে নিচের দিকে নেমেছে।

কেন সোনা সরিয়ে নিচ্ছে বড় দেশগুলো?

নানা জল্পনা-কল্পনার মাঝে এবার সবচেয়ে বড় একটা চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় জমা রাখা তাদের নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ দ্রুত দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেমন—নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা উত্তর আমেরিকা থেকে টনকে টন সোনা নিজেদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু কেন এমন করছে তারা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে কালকেই দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে বা কোনো বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসছে। বরং বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে দেশগুলো এখন অনেক বেশি সতর্ক। তারা বুঝে গেছে, বিপদের দিনে নিজের সোনা নিজের দেশের কাছে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।

এবার আসা যাক আমাদের দেশের বাজারে। মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশে এক ভরি সোনা ছিল এক লাখ টাকার ঘরে। আর চলতি বছরে এসে তা ছাড়িয়ে গেছে দুই লাখ কুড়ি থেকে ত্রিশ হাজার টাকার ঘর।

যদিও গত কিছুদিন ধরে দাম কিছুটা ওঠানামার মধ্যে আছে, তবুও সাধারণ ক্রেতাদের হাত এখন প্রায় শূন্য। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) পরিষ্কার জানিয়েছে, রাশিয়া রিজার্ভের সোনা বিক্রি করছে, অন্যদিকে চীন প্রতি মাসে গহনা বা সোনা কিনে রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা কমা এবং যুদ্ধের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কিনে জমা করছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দাম কি আরও কমবে? অর্থনীতিবিদ এবং খাতসংশ্লিষ্টরা একবাক্যে বলছেন—না। বর্তমান অবস্থা থেকে সোনার দাম খুব বেশি কমার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, গত চার বছর ধরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি বছর গড়ে এক হাজার টন সোনা জমা করছে, যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ। বিখ্যাত গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

বিশেষজ্ঞ ড. আহসান হাবীবের মতে, সোনাকে মূলত একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখনই অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, মানুষ হু হু করে সোনার দিকে ছুটে চলে। আর ঠিক এই কারণেই ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সোনা কেনা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সারকথা হলো—স্বল্পসময়ের জন্য সুদের হার বা বাজারের চালে সোনার দামে একটু উনিশ-বিশ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে সোনা তার দীপ্তি হারাবে না; বরং এর দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সম্ভাবনাই শতভাগ।