হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে তা দ্রুত নিচের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৬ আগস্ট নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্যোগটি এই রূঢ় বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এর ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড়ের চূড়ায় বা অনেক উঁচুতে দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর নিচের বাসিন্দাদের কতটা আগে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব?
নেপালের রাসুয়া জেলায় সেদিন সকালে হঠাৎ পাহাড়ের বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ধসে পড়ে। এর পরপরই লেন্দে খোলা নদীতে নেমে আসে পানি, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত। দ্রুত তা উপত্যকা পেরিয়ে নেপাল-চীন সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ঘটনাটি ছিল বড় ধরনের বিপর্যয়ের সূচনা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নেপাল ও সীমান্তের ওপারে তিব্বতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
নিখোঁজ হন অন্তত ৬ হাজার মানুষ। ধ্বংস হয় ১২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু ও বহু বসতবাড়ি। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী আল-জাজিরাকে বলেন, ঘটনার ব্যাপ্তি, ক্ষতির পরিমাণ এবং এর প্রকৃতি—সবদিক থেকেই এটি ব্যতিক্রমী। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বিপর্যয়টির সময় যে বিপুল শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তা হিরোশিমায় ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে নির্গত শক্তির চেয়েও বেশি ছিল।
তবে তিনি এ তুলনা করেছেন কেবল ঘটনার ব্যাপকতা বোঝাতে। একটি দুর্যোগ থেকে তৈরি হতে পারে আরেকটি হিমালয়ে দুর্যোগের ধরন বদলে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে একাধিক ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ, তুষারস্তর, পারমাফ্রস্ট এবং উচ্চভূমির হ্রদগুলোর অবস্থায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ি উপত্যকায় দ্রুত বাড়ছে সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পর্যটনকেন্দ্র ও বসতি।
ফলে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় খুব সহজেই পরবর্তী বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো তুষারধসে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে সাময়িক হ্রদ তৈরি হতে পারে। পরে সেই পানি হঠাৎ বেরিয়ে এলে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোত। সেই স্রোতে সড়ক বা সেতু ভেঙে নদীর গতিপথ আবার আটকে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত নিচের দিকে দেখা দিতে পারে নতুন বন্যা। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই পরস্পর-সংযুক্ত ঝুঁকির বিষয়টিই স্পষ্ট করেছে।
বর্তমান আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট একটি বিপদের ওপর নির্ভরশীল। কোথাও বৃষ্টির পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হয়, কোথাও নদীর পানি বাড়ার তথ্য সংগ্রহ করা হয়, আবার কোথাও হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যার সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু হিমালয়ের সব দুর্যোগ একটি মাত্র কারণ থেকে শুরু হয় না। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিমোড) জুলাইয়ে সতর্ক করে জানিয়েছিল, স্বাভাবিকের তুলনায় কম মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে কম বন্যার ঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যালের মতে, মৌসুমি বৃষ্টির গড় পরিমাণ পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ে নেমে আসা অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাব্য প্রভাবকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। নেপালের ঘটনাটিও শুধু অতিবৃষ্টির ফল ছিল কি না, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বিজ্ঞানীরা বরফ ও পাথরের ধসসহ একাধিক সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো পর্যায়ে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পরে তা হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভয়াবহ স্রোতের জন্ম দিতে পারে।
আইসিমোড ঘটনাটিকে প্রচলিত অর্থে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা না বলে বরফধস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে কিছু গবেষক স্থানীয় ভূকম্পন এবং উচ্চভূমির অন্যান্য ভূ-প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য প্রভাবও পরীক্ষা করছেন। এই পার্থক্যটি আগাম সতর্কতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু বৃষ্টিপাত বা নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করলে পাহাড়ের কয়েক কিলোমিটার উজানে শুরু হওয়া আকস্মিক বিপর্যয়ের খবর নিচের মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
কাশ্মীরেও বাড়ছে ঝুঁকি হিমালয়ের অন্য এলাকাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। চলতি বছর _জার্নাল অব গ্লেসিওলজি_-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় ভারতশাসিত কাশ্মীরের হিমালয় অঞ্চলে ২ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় ১৫৫টি হিমবাহের হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গলতে থাকা হিমবাহের প্রান্তে থাকা এসব হ্রদের মোট আয়তন ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে।
এর মধ্যে পাঁচটি হ্রদকে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক ও বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদ ভেঙে গেলে কয়েক হাজার স্থাপনা, ১৫টি বড় সেতু, সড়ক এবং একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ঝুঁকি শুধু একটি হ্রদে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো হ্রদ ভেঙে নেমে আসা পানি নিচের আরেকটি হ্রদ বা নদীর প্রবাহে প্রভাব ফেললে নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ গবেষক ইরফান রশিদ জানান, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের গলন, পাতলা হয়ে যাওয়া এবং অস্থিতিশীলতার প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে মৌসুমি তুষারস্তর ও পারমাফ্রস্টেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ উচ্চ সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানির সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানেও বাড়ছে আগাম সতর্কতার উদ্যোগ পশ্চিম হিমালয় ও কারাকোরাম অঞ্চলও একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের গিলগিট-বালতিস্তানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক হিমবাহ ও হিমবাহের হ্রদ। এসব এলাকার জনবসতি ও অবকাঠামো আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকি কমাতে পাকিস্তানে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সহায়তায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা সরঞ্জাম, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি স্থাপন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সেন্সর বিপদের সংকেত শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু সেই তথ্য দ্রুত স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর বাস্তবসম্মত পথও থাকতে হবে। সাইরেন বাজলেই মানুষ নিরাপদ হবে না, যদি তারা না জানে কোথায় যেতে হবে। একইভাবে সতর্কবার্তা তখনই কার্যকর, যখন বন্যা বা ধস পৌঁছানোর আগেই সেটি মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা এখন শুধু দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির পরিবর্তে আগাম পদক্ষেপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শাশ্বত সান্যালের মতে, কেবল একটি নির্দিষ্ট ও অনুমানযোগ্য বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকার সময় পেরিয়ে গেছে; এখন আগাম সতর্কতা ও আগাম পদক্ষেপকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে আনতে হবে।


















