‘র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ বা ‘র‌্যাব’ নামটি আর নেই। সেই জায়গায় এসেছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা ‘এসআরবি’। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে পুলিশের অধীনে নতুন এই বিশেষায়িত ইউনিট। কিন্তু বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, নাম বদলালেও বাস্তবে কতটা বদলেছে বাহিনীটি?
নতুন আইন অনুসারে র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, দায়, চুক্তি, রেজিস্টার ও নথিপত্র এসআরবিতে স্থানান্তর হবে। বিদ্যমান থাকবে র‌্যাবের প্রশাসনিক ও আইনি ধারাবাহিকতাও। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, র‌্যাবের বড় একটি অংশ কি নতুন নামে নতুন কাঠামোয় বহাল থাকছে? এসআরবির প্রধান মো. আহসান হাবীব পলাশ জানান, গেজেট হওয়ার পর বুধবার থেকে এসআরবি নাম ব্যবহার করে সব কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
একই দিন সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহৃত বাহিনীর লোগোতেও র‌্যাবের পরিবর্তে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ দেখা যায়। তবে লোগোর মূল নকশায় পরিবর্তন আনা হয়নি। গত মঙ্গলবার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ২০২৬’ আইনের গেজেট প্রকাশ করে সরকার। মানবাধিকার বিশ্লেষক নুর খান লিটন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘র‌্যাব গঠন হওয়ার পর থেকে গুম, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেনি।
এখনো তাদের হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে। আমরা এই সব কারণেই দীর্ঘদিন যাবৎ র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি করে আসছিলাম। বিএনপিরও ঘোষণা ছিল, তারা সরকারে গেলে র‌্যাব বিলুপ্ত করবে। র‌্যাবকে বিলুপ্ত করে এসআরবি নামে নতুন ইউনিট চালু হয়েছে। কিন্তু সেখানে আগের জনবলই বিদ্যমান রয়েছে। এখানেই আশঙ্কার বিষয়, শুধুই কি নাম পরিবর্তন হয়েছে, নাকি বাহিনীটির কর্মকাণ্ড পরিবর্তনেরও দিকে নজর দেবে সরকার?
এখন যেটা হয়েছে, তা নতুন মোড়কে পুরোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ’ সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, র‌্যাবের যারা বাহিনীতে এখনো আছেন, তাদের নিজ নিজ বাহিনীতে সরিয়ে নিয়ে এসআরবিতে নতুন কর্মকর্তা ও সদস্যদের পদায়ন করতে হবে। এ ছাড়া সরকার যাতে নিজস্ব স্বার্থে বাহিনীকে কাজে না লাগায়, র‌্যাবের মতো কোনো সরকারের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।
ড. তৌহিদ আশা প্রকাশ করে বলেন, র‌্যাব যেমন প্রথম দিকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সেভাবে এসআরবিও প্রশংসা কুড়াবে সব সময়। বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটির মাধ্যমে র‌্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি করা ২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস-সংক্রান্ত বিধান থেকে র‌্যাবের অংশ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের পথ তৈরি করা হয়।
সরকারের বক্তব্য, এটি র‌্যাবকে নতুন নামে চালু করা নয়; বরং র‌্যাব বিলুপ্ত করে আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। সরকারের মতে, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, মানব পাচার ও সাইবার অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় এমন একটি বাহিনী প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের প্রশ্ন, পুরোনো বাহিনীর জনবল, অবকাঠামো, সম্পদ ও কার্যক্রমের বড় অংশ যদি নতুন ইউনিটে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে মৌলিক পরিবর্তনটি কোথায়?
এসআরবি আইন ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা সম্ভবত এখানেই। সরকারের অনুমোদিত খসড়াতেই বলা হয়েছিল, র‌্যাবের জনবল, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, সম্পদ, হিসাব, রেকর্ড ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হবে। পরে সংসদে পাস হওয়া আইনের কাঠামোতেও র‌্যাবের সম্পদ, দায়, চুক্তি, নথিপত্র ও জনবলের ধারাবাহিকতা রাখার বিষয়টি এসেছে; অর্থাৎ একটি বাহিনীর আইনি পরিচয় শেষ হচ্ছে, কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক অনেক উপাদানই নতুন প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে।
এমনকি নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের বিদ্যমান বিধি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসহ কার্যকর রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ছিন্ন হচ্ছে না। এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে, এটি কি সম্পূর্ণ নতুন বাহিনী, নাকি পুরোনো বাহিনীর অবকাঠামো ও অভিজ্ঞ জনবলকে নতুন আইনি কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া?
তবে এসআরবির কাঠামোয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও রয়েছে। র‌্যাবের পরিবর্তে এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এর মহাপরিচালক হবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। প্রয়োজনে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠনের সুযোগ থাকবে। সদর দপ্তর হবে ঢাকায়। দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রয়োজন অনুযায়ী ইউনিট স্থাপন করা যাবে।
পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের প্রেষণে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে যৌথবাহিনীর বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না। তবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুলিশের অধীন একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এটি র‌্যাবের আগের কাঠামোর তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। এসআরবিকে শুধু বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট হিসেবে রাখা হচ্ছে না।
নতুন আইনে অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতারও বিধান রয়েছে। সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানব পাচার, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক, অপহরণ, হত্যা, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় কাজ করবে বাহিনীটি। আদালত, সরকার কিংবা আইজিপির নির্দেশেও তদন্তের দায়িত্ব নিতে পারবে; অর্থাৎ এসআরবির হাতে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি তদন্তের ক্ষমতাও থাকছে।
এখানেই মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্নটি সামনে আসে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়া প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে জবাবদিহির কাঠামো কতটা শক্তিশালী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না।
র‌্যাবের একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতি নিয়ে এসআরবি গড়ে উঠলে তা হবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু খোলস বদলানো। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসআরবি আইনে অভিযোগ প্রতিকারের জন্য একটি কমিটির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগের পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে জবাবদিহি বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন থাকছে কমিটির স্বাধীনতা নিয়ে। অভিযোগের তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বিশেষায়িত অপরাধ দমন বাহিনী হিসেবে র‌্যাবের যাত্রা শুরু হয়। দুই দশকের বেশি সময়ে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দমনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বাহিনীটির ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান।
তবে র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগও ওঠে এই সময়ে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‌্যাব এবং বাহিনীর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে বয়ে যায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কারবিষয়ক কমিটি র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল।
পরে নির্বাচিত বিএনপি সরকার র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেয়।



















