বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় চীনা অর্থায়নের ভূমিকা ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। রেলপথ, টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও নগর অবকাঠামোর মতো বড় প্রকল্পে এসেছে চীনা ঋণ। এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করলেও প্রতিটি ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যতের কিস্তি, সুদ ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের দায়।
একটি প্রকল্পের উদ্বোধন দৃশ্যমান; কিন্তু তার ঋণ পরিশোধের চাপ থাকে বহু বছর। প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে, বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে কিংবা প্রত্যাশিত আয় না এলে সেই দায় আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তখন প্রশ্ন শুধু প্রকল্পটি কতটা আধুনিক হলো তা নয়; প্রকল্পটি তার ঋণের খরচ সামলাতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে তাই খোঁজা হচ্ছে চীনা ঋণের প্রকৃত হিসাব কত ঋণ চুক্তি হয়েছে, কত অর্থ ছাড় হয়েছে, কী শর্তে ঋণ নেওয়া হয়েছে, অর্থের কতটা প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে, কোন প্রকল্প কতটা আয় করছে এবং ভবিষ্যতে কিস্তি ও সুদ পরিশোধের দায় কে বহন করবে। কারণ ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ উন্নয়নের একটি ধাপ; কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
চীনা ঋণের পরিমাণ ও বাংলাদেশের দায় ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা ঋণচুক্তি বাড়ে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, আটটি প্রধান মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো খাতে চীনের সঙ্গে অনুমোদিত ঋণ বা প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ছাড় করা অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ৩ দশমিক ৩ থেকে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
বিপরীতে চুক্তিবদ্ধ ঋণের একটি বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত বা পাইপলাইনে রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঋণের ছাড়, অব্যবহৃত অর্থ ও বর্তমান বকেয়া স্থিতির হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত কিছু হিসাবে চীনের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া ঋণ ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও এ তথ্যের সময়কাল ও হিসাব পদ্ধতি যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের তুলনায় চীনের অংশ আনুমানিক ৬ দশমিক ৮১ থেকে ৭ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণের অংশ বেশি। তবে ঋণের অংশ তুলনামূলক কম হলেও প্রকল্পভিত্তিক ঋণের শর্ত, সুদ, পরিশোধের সময়সীমা ও ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রার দায় বিশ্লেষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি তার শর্ত ও পরিশোধ সক্ষমতাই নির্ধারণ করে প্রকৃত অর্থনৈতিক চাপ। এক দশক আগেও বাংলাদেশের প্রধান ঋণদাতা দেশগুলোর তালিকায় না থাকা চীন ২০২৫ সালে দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম ঋণদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্র্যাক করা শীর্ষ ১০টি ঋণদাতা দেশের তালিকায় ভারতের কোনো স্থান ছিল না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মোট বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণে চীনের অংশ ২০২৫ সালে নাটকীয়ভাবে বেড়ে ৩৪ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২০ সালেও এই অংশ ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং চীন ছিল পঞ্চম বৃহত্তম ঋণদাতা। আর্থিক অঙ্কে ২০২০ সালের মাত্র ৪২২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২০২৫ সালের শেষে চীনের কাছে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩৭…৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
বিপরীতে ২০২৫ সালে শীর্ষ ঋণদাতার তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছে, যা ২০২০ সালে ছিল দ্বিতীয় স্থানে। এই সময়ে বাংলাদেশের মোট বেসরকারি বৈদেশিক ঋণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ অর্ধেক কমে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালের শেষে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ কমে ৭৫১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীনা ঋণে চলমান ও প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্প বাংলাদেশের রেল, সড়ক, টানেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর একাধিক বড় প্রকল্পে চীনা ঋণ ও অর্থায়ন রয়েছে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে প্রায় ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, কর্ণফুলী টানেলে ৭০৫ মিলিয়ন ডলার এবং পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণে প্রায় ৯৭ কোটি ডলার চীনা ঋণ সহায়তা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগার, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ডাবল পাইপলাইন, ইনফো সরকার-৩ প্রকল্প ও চীনা অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চলেও চীনা অর্থায়ন যুক্ত রয়েছে।
মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণচুক্তির প্রক্রিয়া এবং আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নও এই সহযোগিতার অংশ। এর বাইরে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার, দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ পাঁচটি বড় সেতু নির্মাণে প্রায় ৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং টেলিটকের ৪জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে নতুন ঋণের প্রস্তাব বা আলোচনা চলছে।
তবে এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ ঋণ, অনুমোদিত অর্থ, ছাড় হওয়া অর্থ ও প্রস্তাবিত অর্থায়ন আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। চীনা ঋণের শর্ত কী চীনা ঋণের শর্ত প্রকল্প ও ঋণের ধরনভেদে ভিন্ন হলেও সরকারি নমনীয় ঋণে সুদের হার সাধারণত ২-৩ শতাংশ এবং গ্রেস পিরিয়ড প্রায় পাঁচ বছর। সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ছাড়পত্র ঋণের সুদ ১ শতাংশে নামানো এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২০ বছর থেকে ৩০ বছর করার বিষয়ে চীনের নীতিগত সম্মতিও পাওয়া গেছে। তবে ঋণের সঙ্গে কমিটমেন্ট ও ম্যানেজমেন্ট ফিসহ অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হতে পারে। ডলারের পাশাপাশি ইউয়ানভিত্তিক ঋণের ব্যবহারও বাড়ছে। ইতোমধ্যে যেসব প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়েছে, সেগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করেছে বাংলাদেশ। প্রকল্পভেদে কিস্তির পরিমাণ ভিন্ন; যেমন কর্ণফুলী টানেলের ঋণের বিপরীতে আসল ও সুদ মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
বাংলাদেশের বড় চীনা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক ও চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান ঋণ দিয়ে থাকে। চীনের ঋণ বনাম বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীন গুরুত্বপূর্ণ ঋণদাতা হলেও মোট বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগ এসেছে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৩২-৩৫ শতাংশ বা ৩২-৩৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে এসেছে প্রায় ২২-২৪ শতাংশ বা ২২-২৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, শুধু বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকেই এসেছে মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
জাপানের জাইকা ও বাংলাদেশের অন্যতম বড় দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা; মোট ঋণের প্রায় ১৭-১৯ শতাংশ বা ১৭ থেকে ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার তাদের। চীনের এক্সিম ও চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (সিডিবি) থেকে চুক্তিবদ্ধ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়। মোট বৈদেশিক ঋণে চীনের অংশ আনুমানিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কারণে রাশিয়ার অংশও উল্লেখযোগ্য। তবে ঋণের পরিমাণ দিয়ে এককভাবে ঝুঁকি বিচার করা যায় না। ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড, মুদ্রা, কিস্তি শুরুর সময় এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল— সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশের মোট ঋণের বড় অংশ বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের তুলনামূলক নমনীয় ঋণ হলেও চীন ও রাশিয়ার কিছু বড় প্রকল্পের ঋণের কিস্তি একই সময়ে শুরু হওয়ায় আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের চাপের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঝুঁকি কোথায়? চীন অর্থায়িত বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো দেশের যোগাযোগ, শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যখন প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল সময়মতো আসে না।
বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং প্রকল্পের নিজস্ব আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধে ঘাটতি— এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত সরকারের আর্থিক দায় বাড়াতে পারে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং অর্থায়নের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ও ঋণের পরিমাণ প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
একই সঙ্গে প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় শুরু হতে দেরি হলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও পিছিয়ে যায়। প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক রিটার্ন না আসা কোনো মেগা প্রকল্প নির্মাণের পরও যদি পর্যাপ্ত যানবাহন, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি না হয়, তাহলে প্রকল্পের আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে। যেমন— কর্ণফুলী টানেল চালু হলেও টানেলকেন্দ্রিক শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে না বাড়লে টোল আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় ও ঋণসংক্রান্ত দায় মেটানো কঠিন হতে পারে।
ফলে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিনিময় হারের ঝুঁকি বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়ন সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। প্রকল্প থেকে আয় যদি মূলত টাকায় হয়, কিন্তু ঋণের কিস্তি ও সুদ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়, তাহলে একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধে আগের তুলনায় বেশি টাকা প্রয়োজন হবে।
ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি সরকারি অর্থের ওপর পড়তে পারে। সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক দায় কোনো প্রকল্প নিজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের পর্যাপ্ত অর্থ তৈরি করতে না পারলে সরকারকে বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দিতে হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকল্পের আর্থিক ঘাটতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়ে পরিণত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের দায় বাড়তে থাকলে সরকারের অন্যান্য অগ্রাধিকার খাত যেমন— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই চীনা অর্থায়িত প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্পের আকার বা অবকাঠামোগত সাফল্য নয়, ঋণের শর্ত, বৈদেশিক মুদ্রায় দায়, প্রকল্পের সম্ভাব্য আয়, রিটার্ন, বাস্তবায়ন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর আর্থিক দায় কতটা তৈরি হবে— এসব বিষয়ও সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় নেওয়া ঋণের বর্তমান চিত্র, প্রকল্পভিত্তিক অর্থছাড় এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের দায়— সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি এখন আরও নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও ঊজউ-এর সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চীনা ঋণের ক্ষেত্রে শুধু মোট ঋণের পরিমাণ নয়; কত অর্থ ছাড় হয়েছে, কতটা এখনো পাইপলাইনে রয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে কত অর্থ পরিশোধ করতে হবে— এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের কাছে বাংলাদেশের মোট ঋণ কত— এ বিষয়ে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে বাংলাদেশের মোট চুক্তিবদ্ধ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তিবদ্ধ ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অবমুক্ত হয়নি। সাম্প্রতিক সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যেও ১৩টি প্রকল্পের বিপরীতে ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি এবং ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের তথ্য পাওয়া যায়।
মোট কতটি প্রকল্পে ঋণচুক্তি হয়েছে— এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জি-টু-জি (এ২এ) কাঠামো এবং অগ্রাধিকারমূলক বায়ার্স ক্রেডিটের (চইঈ) আওতায় এ পর্যন্ত বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের ১৩টি প্রকল্পের বিপরীতে আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি হয়েছে। তবে চুক্তি হওয়া এবং পুরো অর্থ ছাড় হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি, প্রশাসনিক অনুমোদন ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার ওপর অর্থছাড়ের গতি নির্ভর করে।
কত অর্থ ছাড় হয়েছে এবং কতটা বাকি— এ বিষয়ে তিনি বলেন, চুক্তিবদ্ধ ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৩ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার এখনো ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকলে পাইপলাইনে থাকা অর্থ অবমুক্ত হতেও সময় লাগে। চীনের ঋণচুক্তির ক্ষেত্রেও কোভিড-পরবর্তী জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির প্রভাব পড়েছে বলে সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বর্তমানে চীনের কাছে বাংলাদেশের ঋণের স্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ছাড়কৃত অর্থ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে আসল পরিশোধ শুরু হয়েছে। ফলে মোট ছাড়কৃত অর্থ এবং বর্তমানে বকেয়া মূল ঋণের পরিমাণ এক নয়। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০টি প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছিল এবং মোট পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৪৮৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। চীনা ঋণের সুদের হার সম্পর্কে তিনি বলেন, ঋণের ধরন ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সুদের হার ও অন্যান্য ফি ভিন্ন হতে পারে।
তাই গড় সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত সুদের হার নয়, কমিটমেন্ট ফি, ম্যানেজমেন্ট ফি, গ্রেস পিরিয়ড ও পরিশোধের মেয়াদসহ পুরো ঋণ প্যাকেজ বিবেচনা করতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ সম্পর্কে তিনি বলেন, বড় প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনা ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে। ফলে আগামী বছরগুলোতে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও ইতোমধ্যে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। কোন প্রকল্পে চীনা ঋণের পরিমাণ বেশি— এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প চীনা অর্থায়নের অন্যতম বড় প্রকল্প।
এ ধরনের বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, প্রকল্প চালুর পর প্রত্যাশিত ব্যবহার, আয়, পরিচালন ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোন প্রকল্প নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে— এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী আয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ভিন্ন। বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বন্দরভিত্তিক কিছু প্রকল্পের সরাসরি বাণিজ্যিক আয় থাকতে পারে।
অন্যদিকে রেল যোগাযোগ, সড়ক বা টানেলের মতো অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সরাসরি রাজস্বের পাশাপাশি সময় সাশ্রয়, পরিবহন ব্যয় কমানো, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মতো পরোক্ষ সুফলও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে একটি প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের সফরের সময় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (ইজও) যোগ দেয়।
তখন চীন বিআরআই প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং যৌথ উদ্যোগের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারসহ মোট ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পগুলো মূলত পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা দেশের উন্নয়নের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারও হয়ে উঠেছে, যারা তৈরি পোশাক, চামড়া এবং ইলেকট্রনিকসসহ প্রধান রপ্তানি শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহ করে থাকে। ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নির্ভর করবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের আধুনিকায়নের ওপর।
তিনি যোগ করেন, চীনা বিনিয়োগের সুবিধা পুরোপুরি পেতে হলে স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া, শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। ঋণ স্থায়িত্বের উদ্বেগে মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, অবকাঠামোগত অর্থায়ন বাড়ানোর সময় ঋণের স্থায়িত্বের বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখা উচিত।
তিনি হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অধীনে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হলে কীভাবে ভারী বৈদেশিক ঋণ আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে, তা তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে বাংলাদেশের উচিত কঠোর সম্ভাব্যতা যাচাই, স্বচ্ছ ঋণের শর্তাবলি, উন্নয়ন অংশীদারদের বৈচিত্র্যকরণ এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা।


















