আজ বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৩ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

মাদকের নতুন বাজার: ককটেল ড্রাগে বাড়ছে শঙ্কা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:03:34 pm, Wednesday, 16 September 2026
  • 12

মাদকের নতুন বাজার: ককটেল ড্রাগে বাড়ছে শঙ্কা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একসময় মাদক মানেই ছিল ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে আইস। এখন সেই পরিচিত মাদকবাজারের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে আরেকটি অন্ধকার বাজার। ওষুধের বাজার ঘুরে মাদকের জগতে প্রবেশ করছে আরও কিছু নতুন মাদক।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে ‘ককটেল ড্রাগ’। চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত উচ্চ ঝুঁকির ওষুধ, শক্তিশালী ব্যথানাশক, সিডেটিভ বা মানসিক রোগের কিছু ওষুধ ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দখল করছে এই মাদক রাজ্য। কোথাও জাল প্রেসক্রিপশন, কোথাও অসাধু বিক্রয়, আবার কোথাও অনলাইনভিত্তিক গোপন যোগাযোগ— সব মিলিয়ে প্রচলিত মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বাইরে নতুন ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অপরাধ সাম্রাজ্যে এই মাদকের আরও একটি নাম আছে। সেটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল চকলেট’। অবৈধ মাদক চোরাকারবারিরা সাধারণত আর্থিক লাভ এবং মাদকের তীব্রতা বাড়ানোর জন্য দুটি ভিন্নধর্মী রাসায়নিক উপাদান গুঁড়ো করে একসঙ্গে মিশিয়ে এই চকলেট তৈরি করে। এতে যে ফেন্টানিল বা ফেন্টানাইল মেশানো হয়, এটি সাধারণ মরফিনের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ গুণ এবং হেরোইনের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করলেও এটি তীব্র আসক্তি এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আরেক মিশ্রণ কেটামিনও ভয়ানক। এটি মূলত একটি চেতনানাশক বা অবশ করার ওষুধ, যা মানুষ ও পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মাদক হিসেবে ব্যবহারকারীরা এর মাধ্যমে হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব অনুভূতির অভিজ্ঞতা খোঁজে। চোরাকারবারিরা কেটামিন বা অন্যান্য সাধারণ মাদকের সঙ্গে অল্প পরিমাণ সস্তা ও শক্তিশালী ফেন্টানাইল মিশিয়ে পাউডার বা নকল ট্যাবলেট তৈরি করে।

এতে ব্যবহারকারী বুঝতেও পারেন না যে তিনি ফেন্টানাইলের মতো মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান গ্রহণ করছেন। অবৈধভাবে তৈরি এই পাউডার মিশ্রণগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক অনুপাত বা মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে চকলেট চিপ বিস্কুটের প্রভাব বলা হয়। যেমন একটি বিস্কুটের সব জায়গায় চকলেট চিপস সমানভাবে ছড়ানো থাকে না— কোনো অংশে বেশি থাকে, কোনো অংশে কম।

ঠিক একইভাবে, এই অবৈধ পাউডারের মিশ্রণে ফেন্টানাইলের কণাগুলো সমানভাবে ছড়ায় না। ফলে মিশ্রণটির এক চিমটিতে হয়তো কিছুই হবে না; কিন্তু অন্য চিমটিতে ফেন্টানাইলের একটি প্রাণঘাতী ডোজ (মাত্র ২ মিলিগ্রাম) চলে আসতে পারে, যা তাৎক্ষণিক মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। ওপিওয়েড (ফেন্টানাইল) এবং সিডেটিভ বা চেতনানাশক (কেটামিন) একসঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে তা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রমতে, সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হচ্ছে, এ ধরনের মাদক লেনদেনে ইয়াবার মতো চোখে পড়ার মতো কোনো চিহ্ন থাকে না। একটি প্রেসক্রিপশন, একটি মেসেজ, একটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট কিংবা পরিচিত কোনো ফার্মেসির কাউন্টারই হয়ে উঠতে পারে সরবরাহের মাধ্যম।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অবৈধ অনলাইন বাজারে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ এবং নিয়ন্ত্রিত মাদক বিক্রির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে; বিশেষ করে ফেন্টানিলের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী ওপিওয়েডের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণের ভুল ডোজও প্রাণঘাতী হতে পারে। কেটামিনেরও চিকিৎসাগত ব্যবহার রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানের বাইরে এর অপব্যবহার গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। কিন্তু কাগজের প্রেসক্রিপশন জাল করা তুলনামূলক সহজ হলে সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। একই প্রেসক্রিপশনের ছবি ব্যবহার, চিকিৎসকের নাম বা নিবন্ধন নম্বরের অপব্যবহার, রোগীর তথ্য বদলে দেওয়া কিংবা একাধিক দোকানে একই কাগজ দেখানোর মতো জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর অনলাইন যোগাযোগ যুক্ত হলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্ধ গ্রুপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্য কোনো গোপন যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ হলে প্রচলিত দোকানভিত্তিক নজরদারি দিয়ে পুরো চিত্র পাওয়া কঠিন।

ফেন্টানিল ও কেটামিন চিকিৎসাক্ষেত্রে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ব্যবহার করা হলেও, মাদক হিসেবে এর অপব্যবহার মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য চরম মরণঘাতী; বিশেষ করে ফেন্টানিলকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মাদকের একটি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার সামান্য পরিমাণ হেরোইনের চেয়েও ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী। ফার্মেসি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মশিউর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ফেন্টানিল হলো একটি সিন্থেটিক ওপিওড।

কেটামিন মূলত একটি অ্যানেস্থেটিক বা চেতনানাশক ওষুধ। মাদক হিসেবে এটি ব্যবহার করলে শরীর ও মন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যাকে মাদকসেবীরা কি-হোল বলে থাকে। মাদক হিসেবে এর ব্যবহার সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ফেন্টানিল এতটাই শক্তিশালী যে মাত্র ২ মিলিগ্রাম (একটি লবণের দানার মতো সামান্য পরিমাণ) রক্তে প্রবেশ করলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এটি মস্তিষ্কের সেই অংশকে স্তব্ধ করে দেয়, যা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ব্যবহারকারীর শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে আসে, অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ মুহূর্তের মধ্যে কোমায় চলে যায় বা মারা যায়। মাত্র এক বা দুবার ব্যবহারের পরই ব্যবহারকারী এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা শুরু হয়।

এই ড্রাগ মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটায়। এর অপব্যবহারকারীদের স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং স্থায়ী মানসিক বিকৃতি ঘটতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের ফলে মূত্রথলি বা ব্লাডার সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে তীব্র ব্যথার সঙ্গে রক্ত পায়খানা/ প্রস্রাব হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে কিডনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মশিউর রহমান আরও বলেন, কেটামিন সেবনের পর তীব্র হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিভ্রম হয়। ব্যবহারকারী অবাস্তব জিনিস দেখতে বা শুনতে পায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। এই মাদকের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর ব্যবহারকারী চরম মানসিক অবসাদ, তীব্র হতাশা এবং প্যানিক অ্যাটাকে ভোগে, যা অনেক সময় তাকে আত্মহত্যার দিকে তাড়িত করে।

অতিরিক্ত কেটামিন সেবনের ফলে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। সাময়িকভাবে হাত-পা অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে, যার ফলে যেকোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অঙ্গহানি ঘটতে পারে। মাদক সিন্ডিকেটগুলো অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের অজান্তেই অন্যান্য কম দামি মাদকের, যেমন কোকেন বা ইয়াবার সঙ্গে ফেন্টানিল মিশিয়ে দেয়, যাতে কম খরচে তীব্র নেশা তৈরি করা যায়।

একে বলা হয় ‘ককটেল ড্রাগ’। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অসাধুচক্র এই নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে অনেক বিদেশি নাগরিকও সম্পৃক্ত। ফেন্টানিল ও কেটামিন চোরাচালান, অবৈধ উৎপাদন এবং কেনাবেচার অভিযোগে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (বর্তমানে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’) বেশ কিছু চক্রকে এই সব উচ্চমূল্যের সিন্থেটিক মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে। গত ২৫ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে লি বিন, ইয়াং চুনশেং এবং ইউ ঝে নামে তিন চীনা নাগরিক ও লিকুইড কেটামিন সরবরাহের অভিযোগে দুজন স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে।

তারা তরল কেটামিন প্রসেস করে পাউডারে রূপান্তর ও সাউন্ড সিস্টেমের ভেতরে লুকিয়ে শ্রীলঙ্কায় পাচার করত। গত বছর সেপ্টেম্বরে টঙ্গীতে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় থেকে ইতালিতে পাচারের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা ৬.৪৪ কেজি কেটামিন উদ্ধার করা হয়। এ সময় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য সন্দেহে মাসুদুর ও আরিফুর নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তারা সাদা তোয়ালের ফেব্রিকের ভেতর অভিনব কায়দায় কেটামিন তরল আকারে মিশিয়ে পাচার করার চেষ্টা করছিল। এর আগে র‌্যাব গুলশানে একটি বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে ওনাইসি সাঈদ নামে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণকে গ্রেপ্তার করে। সাঈদ অভিজাত শ্রেণির ক্রেতাদের টার্গেট করে, অনলাইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ব্যবহার করে এসব মাদক দেশে আনত। তার কাছ থেকে ফেন্টানিল, কুশ, এক্সট্যাসিসহ বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে যে কেটামিন মাদক হিসেবে ধরা পড়ছে, তা স্থানীয় কোনো কারখানায় কাঁচামাল থেকে তৈরি হচ্ছে না। অপরাধীরা বৈধ ফার্মেসি বা কালোবাজার থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত তরল কেটামিন সংগ্রহ করে তাদের নিজস্ব ‘মিনি ল্যাবে’ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ফুটিয়ে স্ফটিক বা ক্ষতিকারক পাউডারে রূপান্তর করছে।

চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় এসব ওষুধের প্রধান কাঁচামাল মূলত চীন এবং ভারত থেকে উৎপাদিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়ায়। এ ছাড়া উন্নতমানের ফেন্টানিল ও সিন্থেটিক ড্রাগের চোরাচালানগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। এই চক্রের সঙ্গে পুলিশ ও কাস্টমসের কিছু অসৎ কর্মকর্তা সম্পৃক্ত বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, মাদক চোরাকারবারিরা দেশে এই সিন্থেটিক ড্রাগ আনতে এবং বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে আধুনিক ও ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করছে।

মাদক সিন্ডিকেটগুলো সাধারণ ইন্টারনেটের বাইরে গোপন নেটওয়ার্ক ‘ডার্ক ওয়েব’ ব্যবহার করে অর্ডার দেয়। ট্র্যাকিং এড়াতে তারা টাকার বদলে বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পেমেন্ট করে। এই মাদকগুলো কোনো লাগেজ বা ব্যাগে সরাসরি আনা হয় না। যুক্তরাজ্য বা আমেরিকা থেকে আসা ব্র্যান্ডেড চকলেটের বাক্স, কফি বা প্রসাধনীর পার্সেলের ভেতর ফেন্টানিল বা এমডিএমএর মতো পাউডার ও ট্যাবলেট লুকিয়ে কুরিয়ারে পাঠানো হয়।

এ ছাড়া দেশের কিছু অসাধু ড্রাগ হোলসেলার বা ফার্মেসি বিক্রেতা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই গোপনে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ করা তরল কেটামিন মাদকচক্রের হাতে চড়া দামে তুলে দিচ্ছে। কেটামিনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে অন্য দেশে (যেমন ইতালি, স্পেন, মালয়েশিয়া) পাচারের জন্য। সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ রেজাউল হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডার্ক ওয়েব শব্দটি মাদকসংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু কোনো অনলাইন মাদকচক্রের অস্তিত্বের কথা বললেই সেটি ডার্ক ওয়েব, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনেক অবৈধ লেনদেন সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, বন্ধ গ্রুপ বা পরিচিত ব্যক্তির নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও হতে পারে। অপরাধ তদন্তে তাই শুধু ডার্ক ওয়েব খোঁজা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিকস, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কুরিয়ার ও ডেলিভারি চেইন, মোবাইল যোগাযোগ এবং ওষুধ বিক্রির অস্বাভাবিক প্যাটার্ন বিশ্লেষণ।

তিনি আরও বলেন, গোপন অনলাইন গ্রুপ শনাক্ত করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল যোগাযোগকে বাস্তব সরবরাহচক্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। কার সঙ্গে যোগাযোগ, কোথা থেকে পণ্য আসছে, কীভাবে টাকা যাচ্ছে এবং কীভাবে পণ্য পৌঁছাচ্ছে— এই চারটি স্তর একসঙ্গে তদন্ত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শুধু মাদক শনাক্ত নয়, মাদক সরবরাহের অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল কাঠামোও অনুসরণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সাইবার ইউনিট এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অভিযোজন ক্ষমতা। একটি সরবরাহপথ বন্ধ হলে অন্য পথ তৈরি হয়। প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হতে পারে নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চ ঝুঁকির ওষুধ বিক্রির তথ্যভিত্তিক নজরদারি। একই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন জালিয়াতি ঠেকাতে ডিজিটাল যাচাইয়ের ব্যবস্থা, সন্দেহজনক অনলাইন বিক্রির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং ফার্মেসির কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মাদকের নতুন বাজার: ককটেল ড্রাগে বাড়ছে শঙ্কা

Update Time : 10:03:34 pm, Wednesday, 16 September 2026

একসময় মাদক মানেই ছিল ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে আইস। এখন সেই পরিচিত মাদকবাজারের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে আরেকটি অন্ধকার বাজার। ওষুধের বাজার ঘুরে মাদকের জগতে প্রবেশ করছে আরও কিছু নতুন মাদক।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে ‘ককটেল ড্রাগ’। চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত উচ্চ ঝুঁকির ওষুধ, শক্তিশালী ব্যথানাশক, সিডেটিভ বা মানসিক রোগের কিছু ওষুধ ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দখল করছে এই মাদক রাজ্য। কোথাও জাল প্রেসক্রিপশন, কোথাও অসাধু বিক্রয়, আবার কোথাও অনলাইনভিত্তিক গোপন যোগাযোগ— সব মিলিয়ে প্রচলিত মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বাইরে নতুন ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অপরাধ সাম্রাজ্যে এই মাদকের আরও একটি নাম আছে। সেটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল চকলেট’। অবৈধ মাদক চোরাকারবারিরা সাধারণত আর্থিক লাভ এবং মাদকের তীব্রতা বাড়ানোর জন্য দুটি ভিন্নধর্মী রাসায়নিক উপাদান গুঁড়ো করে একসঙ্গে মিশিয়ে এই চকলেট তৈরি করে। এতে যে ফেন্টানিল বা ফেন্টানাইল মেশানো হয়, এটি সাধারণ মরফিনের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ গুণ এবং হেরোইনের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করলেও এটি তীব্র আসক্তি এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আরেক মিশ্রণ কেটামিনও ভয়ানক। এটি মূলত একটি চেতনানাশক বা অবশ করার ওষুধ, যা মানুষ ও পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মাদক হিসেবে ব্যবহারকারীরা এর মাধ্যমে হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব অনুভূতির অভিজ্ঞতা খোঁজে। চোরাকারবারিরা কেটামিন বা অন্যান্য সাধারণ মাদকের সঙ্গে অল্প পরিমাণ সস্তা ও শক্তিশালী ফেন্টানাইল মিশিয়ে পাউডার বা নকল ট্যাবলেট তৈরি করে।

এতে ব্যবহারকারী বুঝতেও পারেন না যে তিনি ফেন্টানাইলের মতো মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান গ্রহণ করছেন। অবৈধভাবে তৈরি এই পাউডার মিশ্রণগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক অনুপাত বা মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে চকলেট চিপ বিস্কুটের প্রভাব বলা হয়। যেমন একটি বিস্কুটের সব জায়গায় চকলেট চিপস সমানভাবে ছড়ানো থাকে না— কোনো অংশে বেশি থাকে, কোনো অংশে কম।

ঠিক একইভাবে, এই অবৈধ পাউডারের মিশ্রণে ফেন্টানাইলের কণাগুলো সমানভাবে ছড়ায় না। ফলে মিশ্রণটির এক চিমটিতে হয়তো কিছুই হবে না; কিন্তু অন্য চিমটিতে ফেন্টানাইলের একটি প্রাণঘাতী ডোজ (মাত্র ২ মিলিগ্রাম) চলে আসতে পারে, যা তাৎক্ষণিক মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। ওপিওয়েড (ফেন্টানাইল) এবং সিডেটিভ বা চেতনানাশক (কেটামিন) একসঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে তা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রমতে, সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হচ্ছে, এ ধরনের মাদক লেনদেনে ইয়াবার মতো চোখে পড়ার মতো কোনো চিহ্ন থাকে না। একটি প্রেসক্রিপশন, একটি মেসেজ, একটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট কিংবা পরিচিত কোনো ফার্মেসির কাউন্টারই হয়ে উঠতে পারে সরবরাহের মাধ্যম।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অবৈধ অনলাইন বাজারে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ এবং নিয়ন্ত্রিত মাদক বিক্রির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে; বিশেষ করে ফেন্টানিলের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী ওপিওয়েডের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণের ভুল ডোজও প্রাণঘাতী হতে পারে। কেটামিনেরও চিকিৎসাগত ব্যবহার রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানের বাইরে এর অপব্যবহার গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। কিন্তু কাগজের প্রেসক্রিপশন জাল করা তুলনামূলক সহজ হলে সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। একই প্রেসক্রিপশনের ছবি ব্যবহার, চিকিৎসকের নাম বা নিবন্ধন নম্বরের অপব্যবহার, রোগীর তথ্য বদলে দেওয়া কিংবা একাধিক দোকানে একই কাগজ দেখানোর মতো জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর অনলাইন যোগাযোগ যুক্ত হলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্ধ গ্রুপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্য কোনো গোপন যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ হলে প্রচলিত দোকানভিত্তিক নজরদারি দিয়ে পুরো চিত্র পাওয়া কঠিন।

ফেন্টানিল ও কেটামিন চিকিৎসাক্ষেত্রে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ব্যবহার করা হলেও, মাদক হিসেবে এর অপব্যবহার মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য চরম মরণঘাতী; বিশেষ করে ফেন্টানিলকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মাদকের একটি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার সামান্য পরিমাণ হেরোইনের চেয়েও ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী। ফার্মেসি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মশিউর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ফেন্টানিল হলো একটি সিন্থেটিক ওপিওড।

কেটামিন মূলত একটি অ্যানেস্থেটিক বা চেতনানাশক ওষুধ। মাদক হিসেবে এটি ব্যবহার করলে শরীর ও মন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যাকে মাদকসেবীরা কি-হোল বলে থাকে। মাদক হিসেবে এর ব্যবহার সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ফেন্টানিল এতটাই শক্তিশালী যে মাত্র ২ মিলিগ্রাম (একটি লবণের দানার মতো সামান্য পরিমাণ) রক্তে প্রবেশ করলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এটি মস্তিষ্কের সেই অংশকে স্তব্ধ করে দেয়, যা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ব্যবহারকারীর শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে আসে, অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ মুহূর্তের মধ্যে কোমায় চলে যায় বা মারা যায়। মাত্র এক বা দুবার ব্যবহারের পরই ব্যবহারকারী এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা শুরু হয়।

এই ড্রাগ মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটায়। এর অপব্যবহারকারীদের স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং স্থায়ী মানসিক বিকৃতি ঘটতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের ফলে মূত্রথলি বা ব্লাডার সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে তীব্র ব্যথার সঙ্গে রক্ত পায়খানা/ প্রস্রাব হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে কিডনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মশিউর রহমান আরও বলেন, কেটামিন সেবনের পর তীব্র হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিভ্রম হয়। ব্যবহারকারী অবাস্তব জিনিস দেখতে বা শুনতে পায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। এই মাদকের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর ব্যবহারকারী চরম মানসিক অবসাদ, তীব্র হতাশা এবং প্যানিক অ্যাটাকে ভোগে, যা অনেক সময় তাকে আত্মহত্যার দিকে তাড়িত করে।

অতিরিক্ত কেটামিন সেবনের ফলে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। সাময়িকভাবে হাত-পা অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে, যার ফলে যেকোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অঙ্গহানি ঘটতে পারে। মাদক সিন্ডিকেটগুলো অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের অজান্তেই অন্যান্য কম দামি মাদকের, যেমন কোকেন বা ইয়াবার সঙ্গে ফেন্টানিল মিশিয়ে দেয়, যাতে কম খরচে তীব্র নেশা তৈরি করা যায়।

একে বলা হয় ‘ককটেল ড্রাগ’। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অসাধুচক্র এই নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে অনেক বিদেশি নাগরিকও সম্পৃক্ত। ফেন্টানিল ও কেটামিন চোরাচালান, অবৈধ উৎপাদন এবং কেনাবেচার অভিযোগে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (বর্তমানে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’) বেশ কিছু চক্রকে এই সব উচ্চমূল্যের সিন্থেটিক মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে। গত ২৫ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে লি বিন, ইয়াং চুনশেং এবং ইউ ঝে নামে তিন চীনা নাগরিক ও লিকুইড কেটামিন সরবরাহের অভিযোগে দুজন স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে।

তারা তরল কেটামিন প্রসেস করে পাউডারে রূপান্তর ও সাউন্ড সিস্টেমের ভেতরে লুকিয়ে শ্রীলঙ্কায় পাচার করত। গত বছর সেপ্টেম্বরে টঙ্গীতে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় থেকে ইতালিতে পাচারের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা ৬.৪৪ কেজি কেটামিন উদ্ধার করা হয়। এ সময় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য সন্দেহে মাসুদুর ও আরিফুর নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তারা সাদা তোয়ালের ফেব্রিকের ভেতর অভিনব কায়দায় কেটামিন তরল আকারে মিশিয়ে পাচার করার চেষ্টা করছিল। এর আগে র‌্যাব গুলশানে একটি বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে ওনাইসি সাঈদ নামে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণকে গ্রেপ্তার করে। সাঈদ অভিজাত শ্রেণির ক্রেতাদের টার্গেট করে, অনলাইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ব্যবহার করে এসব মাদক দেশে আনত। তার কাছ থেকে ফেন্টানিল, কুশ, এক্সট্যাসিসহ বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে যে কেটামিন মাদক হিসেবে ধরা পড়ছে, তা স্থানীয় কোনো কারখানায় কাঁচামাল থেকে তৈরি হচ্ছে না। অপরাধীরা বৈধ ফার্মেসি বা কালোবাজার থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত তরল কেটামিন সংগ্রহ করে তাদের নিজস্ব ‘মিনি ল্যাবে’ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ফুটিয়ে স্ফটিক বা ক্ষতিকারক পাউডারে রূপান্তর করছে।

চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় এসব ওষুধের প্রধান কাঁচামাল মূলত চীন এবং ভারত থেকে উৎপাদিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়ায়। এ ছাড়া উন্নতমানের ফেন্টানিল ও সিন্থেটিক ড্রাগের চোরাচালানগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। এই চক্রের সঙ্গে পুলিশ ও কাস্টমসের কিছু অসৎ কর্মকর্তা সম্পৃক্ত বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, মাদক চোরাকারবারিরা দেশে এই সিন্থেটিক ড্রাগ আনতে এবং বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে আধুনিক ও ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করছে।

মাদক সিন্ডিকেটগুলো সাধারণ ইন্টারনেটের বাইরে গোপন নেটওয়ার্ক ‘ডার্ক ওয়েব’ ব্যবহার করে অর্ডার দেয়। ট্র্যাকিং এড়াতে তারা টাকার বদলে বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পেমেন্ট করে। এই মাদকগুলো কোনো লাগেজ বা ব্যাগে সরাসরি আনা হয় না। যুক্তরাজ্য বা আমেরিকা থেকে আসা ব্র্যান্ডেড চকলেটের বাক্স, কফি বা প্রসাধনীর পার্সেলের ভেতর ফেন্টানিল বা এমডিএমএর মতো পাউডার ও ট্যাবলেট লুকিয়ে কুরিয়ারে পাঠানো হয়।

এ ছাড়া দেশের কিছু অসাধু ড্রাগ হোলসেলার বা ফার্মেসি বিক্রেতা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই গোপনে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ করা তরল কেটামিন মাদকচক্রের হাতে চড়া দামে তুলে দিচ্ছে। কেটামিনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে অন্য দেশে (যেমন ইতালি, স্পেন, মালয়েশিয়া) পাচারের জন্য। সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ রেজাউল হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডার্ক ওয়েব শব্দটি মাদকসংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু কোনো অনলাইন মাদকচক্রের অস্তিত্বের কথা বললেই সেটি ডার্ক ওয়েব, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনেক অবৈধ লেনদেন সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, বন্ধ গ্রুপ বা পরিচিত ব্যক্তির নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও হতে পারে। অপরাধ তদন্তে তাই শুধু ডার্ক ওয়েব খোঁজা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিকস, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কুরিয়ার ও ডেলিভারি চেইন, মোবাইল যোগাযোগ এবং ওষুধ বিক্রির অস্বাভাবিক প্যাটার্ন বিশ্লেষণ।

তিনি আরও বলেন, গোপন অনলাইন গ্রুপ শনাক্ত করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল যোগাযোগকে বাস্তব সরবরাহচক্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। কার সঙ্গে যোগাযোগ, কোথা থেকে পণ্য আসছে, কীভাবে টাকা যাচ্ছে এবং কীভাবে পণ্য পৌঁছাচ্ছে— এই চারটি স্তর একসঙ্গে তদন্ত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শুধু মাদক শনাক্ত নয়, মাদক সরবরাহের অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল কাঠামোও অনুসরণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সাইবার ইউনিট এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অভিযোজন ক্ষমতা। একটি সরবরাহপথ বন্ধ হলে অন্য পথ তৈরি হয়। প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হতে পারে নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চ ঝুঁকির ওষুধ বিক্রির তথ্যভিত্তিক নজরদারি। একই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন জালিয়াতি ঠেকাতে ডিজিটাল যাচাইয়ের ব্যবস্থা, সন্দেহজনক অনলাইন বিক্রির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং ফার্মেসির কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।