সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বের হন মো. শাহ আলম। গন্তব্য আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন। সেখানে পারাবত ট্রেনে ঢাকা থেকে আসা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সংগ্রহ করে সাইকেলের পেছনে বেঁধে শুরু করেন প্রতিদিনের পথচলা।
দোকান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ ঘুরে তিনি পৌঁছে দেন পাঠকের হাতে দিনের খবর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মেরাশানি গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম (৫০-এর বেশি) টানা ৩৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির পেশায় যুক্ত। প্রতিদিন প্রায় ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আখাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ও বিজয়নগরের কিছু অংশে পত্রিকা বিলি করেন তিনি।
রোদ, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তার এই নিরলস যাত্রা। আজমপুর স্টেশনে পত্রিকা ভাঁজ করার ফাঁকে শাহ আলম বলেন, সকাল ৯টার আগেই তিনি স্টেশনে পৌঁছে যান। ট্রেন থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে আখাউড়া পৌরশহরের সড়ক বাজার, উপজেলা পরিষদ, লালবাজার, বড়বাজার, খড়মপুর, দুর্গাপুর, আজমপুর, সিঙ্গারবিল, বিষ্ণুপুর হয়ে মেরাশানি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পত্রিকা পৌঁছে দেন।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা ৬–৭টা বেজে যায়। তিনি জানান, একসময় পত্রিকার চাহিদা অনেক বেশি ছিল। এখন মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন চলে আসায় পাঠক কমেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কপি পত্রিকা বিক্রি হয়। কমিশন বাবদ তার আয় হয় মাত্র ৪০০ টাকার মতো, যা দিয়ে সাত সদস্যের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ঝড়-বৃষ্টির দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শাহ আলম বলেন, রাস্তায় পানি জমে গেলে সাইকেল চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।
পত্রিকা ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, আবার ভাঙা সড়কে চলতে গিয়ে সময়ও বেশি লাগে। ১৯৯১ সালে হরষপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি বুকস্টল থেকে অন্যের জন্য পত্রিকা এনে দেওয়ার মাধ্যমে এ পেশায় তার যাত্রা শুরু। পরে নিজেই পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় আখাউড়ায় বুকস্টলসহ ১৪–১৫ জন হকার ছিল।
তখন আয়ও ভালো ছিল। এখন সবাই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন, শুধু আমি আছি। ’ দিনভর ১০–১২ ঘণ্টা পরিশ্রমের পরও আয় অপ্রতুল হলেও পেশাটি ছাড়তে চান না শাহ আলম। তার ভাষায়, পত্রিকা বিক্রি আমার কাছে শুধু পেশা নয়, ৩৫ বছরের অভ্যাস আর জীবনের ভালোবাসা। মানুষের সহযোগিতা আর আল্লাহর রহমতেই এখনো টিকে আছি।




















