বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নটা অনেকের কাছে শুরু হয় একটি ছোট্ট প্রশ্ন দিয়ে—’কোথায় গেলে কাজ পাওয়া যাবে?’ কারো হাতে থাকে পোশাক কারখানায় কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা, কারো দক্ষতা মেশিন চালানোতে, আবার কেউ বছরের পর বছর কাটিয়েছেন গার্মেন্টসের উৎপাদন লাইনে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের এমন বহু দক্ষ কর্মীর কাছে এখন ইউরোপের শ্রমবাজারও ধীরে ধীরে আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠছে। এই সম্ভাবনার আলোচনায় বুলগেরিয়ার নামও আসছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে সুইং অপারেটর, অর্থাৎ সেলাই মেশিনে দক্ষ কর্মীদের জন্য উৎপাদনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ বুলগেরিয়ায় বাংলাদেশ থেকে গিয়ে বৈধভাবে কাজ করতে হলে শুধু কোনো এজেন্টের কথায় টাকা দিলেই হবে না।
প্রয়োজন প্রকৃত নিয়োগদাতা, বৈধ চাকরির চুক্তি, শ্রমবাজারে কাজের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় বসবাস ও ভিসা প্রক্রিয়া। পোশাক কারখানার দক্ষতা হতে পারে ইউরোপে যাওয়ার চাবিকাঠি সুইং অপারেটরের কাজ মূলত পোশাক তৈরির বিভিন্ন অংশ নির্দিষ্ট ধরনের সেলাই মেশিনের মাধ্যমে জোড়া লাগানো। টি-শার্ট, শার্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট কিংবা বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরিতে আলাদা মেশিন ও অপারেশন অনুযায়ী কর্মীদের দায়িত্ব ভাগ করা হয়।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন কর্মী তাই শুধু একজন শ্রমিক ননÑ তিনি একটি নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতার অধিকারী। কোন কাপড়ের জন্য কোন মেশিন ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে সেলাইয়ের মান ঠিক রাখতে হবে, উৎপাদনের গতি কীভাবে বজায় রাখতে হবে এবং ত্রুটি কীভাবে কমাতে হবেÑ এসব অভিজ্ঞতা বিদেশি পোশাক কারখানায়ও মূল্যবান হতে পারে।
তবে ‘বুলগেরিয়ায় সুইং অপারেটরের প্রচুর চাকরি’Ñ এমন সাধারণ দাবি করে কোনো নির্দিষ্ট চাকরিকে বৈধ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চাকরির সুযোগ সবসময় নির্ভর করবে নির্দিষ্ট নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির ওপর। বাংলাদেশি কর্মীর জন্য বৈধ পথ কোনটি? বাংলাদেশ বুলগেরিয়ার জন্য একটি তৃতীয় দেশের নাগরিকের দেশ।
ফলে বাংলাদেশি নাগরিককে সাধারণভাবে বুলগেরিয়ায় কাজ করতে স্থানীয় শ্রমবাজারে বৈধ প্রবেশাধিকার নিতে হয়। বুলগেরিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় দেশের নাগরিকদের স্থানীয় নিয়োগদাতার সঙ্গে চাকরির চুক্তি থাকলে শ্রমবাজারে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী একক বসবাস ও কাজের অনুমতি, কাজের অনুমতি বা অন্যান্য বৈধ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রবেশাধিকার দেওয়া হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিয়োগদাতাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে বসে কোনো দালাল যদি শুধু বলে, ‘বুলগেরিয়ার ভিসা হয়ে যাবে’Ñ তাহলে সেটি যথেষ্ট নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কোন বুলগেরিয়ান কোম্পানি নিয়োগ দিচ্ছে, কী পদে নিয়োগ দিচ্ছে, বেতন কত, কোথায় কাজ, কী ধরনের চুক্তি এবং সেই চাকরির জন্য শ্রমবাজারে অনুমোদন হয়েছে কি না।
শুরুটা হয় চাকরির চুক্তি দিয়ে বৈধভাবে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে প্রকৃত নিয়োগদাতা খুঁজে পাওয়া। ধরা যাক, বুলগেরিয়ার একটি পোশাক কারখানা বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ সুইং অপারেটরকে নিয়োগ দিতে চায়। তখন নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শ্রমবাজারে প্রবেশের অনুমতির প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।
বুলগেরিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় দেশের নাগরিকের শ্রমবাজারে প্রবেশের আবেদন প্রক্রিয়া নিয়োগদাতা বা তার অনুমোদিত পক্ষ শুরু করতে পারে। আবেদন যাচাইয়ের পর অনুমোদনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এই জায়গাটিই একজন বাংলাদেশি কর্মীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাকরির অফার আর বৈধ শ্রমবাজারের অনুমতি এক জিনিস নয়। এরপর আসবে ভিসার পালা শ্রমবাজারে কাজের অনুমতি পাওয়ার পর বাংলাদেশি কর্মীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি থাকার প্রয়োজনীয় ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বুলগেরিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শ্রমবাজারে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পর তৃতীয় দেশের নাগরিকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘ডি’ ধরনের ভিসা প্রয়োজন হতে পারে। এই ভিসার আবেদন সাধারণত সংশ্লিষ্ট বুলগেরিয়ান কনস্যুলার মিশনে করা হয়। ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে পাসপোর্ট, আবেদনপত্র, শ্রমবাজারে প্রবেশের ইতিবাচক সিদ্ধান্তসংক্রান্ত নথি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবীমার কাগজ থাকতে পারে।
বুলগেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের ডি ভিসার ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ হাজার ইউরো কভারেজের ভ্রমণ স্বাস্থ্যবীমার প্রয়োজন হতে পারে। অতএব, ‘ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ শুরু করে দেবেন’Ñ এমন প্রস্তাব থেকে দূরে থাকা জরুরি। বৈধ চাকরির জন্য বৈধ শ্রমবাজারের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট বসবাসের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
বুলগেরিয়ায় পৌঁছেই কাজ শুরু নয় অনেক কর্মী মনে করেন, ভিসা হাতে পেলেই বিমানবন্দরে নেমে পরদিন কাজে যোগ দেওয়া যায়। বাস্তবে প্রক্রিয়াটি আরও একটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। বুলগেরিয়ার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, শ্রমবাজারে প্রবেশের অনুমতি এবং ডি ভিসা পাওয়ার পর তৃতীয় দেশের নাগরিককে প্রয়োজনীয় বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট পরিচয়পত্র বা বসবাসের নথি পাওয়ার পর কাজ শুরু করার অধিকার কার্যকর হয়।
অর্থাৎ বৈধ কর্মসংস্থানের পুরো যাত্রাটি মোটামুটি এমনÑ চাকরির অফার, নিয়োগদাতার প্রক্রিয়া, শ্রমবাজারে অনুমতি, ডি ভিসা, বসবাসের অনুমতি এবং এরপর বৈধভাবে কাজে যোগদান। সুইং অপারেটরের কী দক্ষতা থাকা দরকার? বাংলাদেশ থেকে যারা এই ধরনের চাকরির কথা ভাবছেন, তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। সেলাই মেশিন পরিচালনায় দক্ষতা, নির্দিষ্ট অপারেশনে অভিজ্ঞতা, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সক্ষমতা, কাপড়ের ধরন বোঝা এবং মান নিয়ন্ত্রণের ধারণা থাকলে চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।
বিশেষ করে একজন কর্মী যদি বলতে পারেন তিনি আগে কোন ধরনের পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন, কোন মেশিনে কাজ করেছেন, কোন অপারেশনে দক্ষ এবং কত বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছেÑ এসব থাকা জরুরি ।


















