যুক্তরাজ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন করা আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা। অনেকের কাছে যুক্তরাজ্যের ড্রাইভিং পরীক্ষা খুব কঠিন মনে হয়, আবার কেউ কেউ এটিকে সহজ হিসেবেও দেখেন।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি আসলে মাঝামাঝি। তবে সঠিক প্রস্তুতি, নিয়মিত অনুশীলন ও ধৈর্য থাকলে এই পরীক্ষায় সফল হওয়া অবশ্যই সম্ভব। শুরুটা যেভাবে : যুক্তরাজ্যে গাড়ি চালানোর জন্য প্রথমে আমি প্রভিশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিই। এই লাইসেন্স ইস্যু করে ড্রাইভিং অ্যান্ড ভেহিকল লাইসেন্সিং এজেন্সি (ডিভিএলএ)। এরপর থিওরি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি।
ড্রাইভিং অ্যান্ড ভেহিকল স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি (ডিভিএসএ) পরিচালিত এই পরীক্ষায় মূলত ট্রাফিক আইন, সড়কের বিভিন্ন পরিস্থিতি এবং বিপদ শনাক্ত করার দক্ষতা যাচাই করা হয়। থিওরি পরীক্ষায় পাস করার পর শুরু হয় আসল প্রস্তুতিÑপ্র্যাকটিক্যাল ড্রাইভিং। একজন প্রশিক্ষকের কাছ থেকে নিয়মিত গাড়ি চালানোর অনুশীলন করতে থাকি। প্রতিটি ধাপে ছিল খরচ : প্রতি ঘণ্টার ড্রাইভিং লেসনের জন্য আমাকে ৪০ পাউন্ড দিতে হয়েছে।
মোট ১৩টি লেসন নেওয়ার পর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিই। তবে পরীক্ষার পথটা এত সহজ ছিল না। প্রথমবার পরীক্ষায় ফেল করি। দ্বিতীয়বারও কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। পরপর দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু হাল ছাড়িনি। ভুলগুলো খুঁজে বের করে আবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। অবশেষে তৃতীয়বার পরীক্ষায় সফল হইÑআলহামদুলিল্লাহ।
প্রতিবার পরীক্ষার সময় প্রশিক্ষকের গাড়ি ব্যবহার করার জন্য আলাদাভাবে ১৫০ পাউন্ড দিতে হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার দিন সকালে এক ঘণ্টার লেসন এবং পরীক্ষার সময় গাড়ি ব্যবহারের খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুধু গাড়ি চালাতে জানলেই হয় না : যুক্তরাজ্যের ড্রাইভিং পরীক্ষায় গাড়ি চালানোর দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে গাড়ি চালানোর বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এখানে শুধু স্টিয়ারিং ঘোরানো, গিয়ার পরিবর্তন কিংবা গাড়ি থামাতে পারলেই হয় না; চালকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষকরা অনেক সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ্য করেন। ফলে পরীক্ষার সময় মনোযোগের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাও জরুরি। নতুনরা যেসব কারণে ফেল করেন : আমার অভিজ্ঞতায় নতুন চালকদের পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যবেক্ষণের ঘাটতি। আয়নায় নিয়মিত নজর না দেওয়া, অন্ধ জায়গা বা ব্লাইন্ড স্পট না দেখা কিংবা মোড়ে যাওয়ার আগে পর্যাপ্তভাবে রাস্তা পর্যবেক্ষণ না করা বড় ধরনের ভুল হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই আবার পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত নার্ভাস হয়ে পড়েন। ভয় বা চাপের কারণে যে কাজগুলো অনুশীলনের সময় সহজেই করা যায়, পরীক্ষার সময় সেগুলোতেই ভুল হয়ে যায়।
এ ছাড়া ভুল লেনে অবস্থান করা, গোলচত্বরে ভুল লেন নেওয়া, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা কম গতিতে গাড়ি চালানো এবং মোড় কিংবা গোলচত্বরে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াও পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। ছোট ভুল আর বড় ভুলের পার্থক্য : যুক্তরাজ্যের প্র্যাকটিক্যাল ড্রাইভিং পরীক্ষায় ভুলকে সাধারণত ড্রাইভিং ফল্ট এবং গুরুতর বা বিপজ্জনক ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ছোটখাটো ভুল একবার হলে সরাসরি ফেল নাও হতে পারে। তবে এ ধরনের ভুলের সংখ্যা বেশি হলে পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে হয়। অন্যদিকে, গুরুতর বা বিপজ্জনক ভুল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমনÑঅন্য গাড়ি বা পথচারীকে প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার না দেওয়া, পর্যবেক্ষণ না করে রাস্তা বা মোড় থেকে বের হওয়া কিংবা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাতে অন্য সড়ক ব্যবহারকারীর ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ধরনের একটি গুরুতর ভুলই পরীক্ষায় ফেল করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। পর্যবেক্ষণই সাফল্যের চাবিকাঠি : আমার কাছে যুক্তরাজ্যের ড্রাইভিং পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে হয়েছে পর্যবেক্ষণ। লেন পরিবর্তন, মোড় নেওয়া কিংবা গাড়ি চালানোর বিভিন্ন ধাপে আয়নায় নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। গাড়ি চালানোর সময় আয়না, সংকেত এবং এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপÑএই ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ি চালু করার সময় কিংবা পার্কিংয়ের মতো পরিস্থিতিতে ব্লাইন্ড স্পটও ভালোভাবে দেখতে হয়। মোড়ে পৌঁছানোর পর ডান-বাম-ডান দেখে নিরাপদ সুযোগ বুঝে এগিয়ে যেতে হয়। গোলচত্বরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় লেন নির্বাচন, সংকেত এবং আশপাশের গাড়ির অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। পথচারীদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। জেব্রা ক্রসিং, স্কুলের আশপাশ কিংবা পথচারী চলাচলের জায়গায় চালককে পরিস্থিতি বুঝে গতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
আন্তর্জাতিক লাইসেন্সের সুবিধা : আমার জানা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে নিজ দেশের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে যুক্তরাজ্যে এসে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গাড়ি চালানোর সুযোগ থাকে। তাই যারা যুক্তরাজ্যে আসার আগে নিজ দেশে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স করে আসতে পারেন, তাদের জন্য শুরুটা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে কতদিন এবং কোন শর্তে বিদেশি লাইসেন্স ব্যবহার করা যাবে, তা ব্যক্তির লাইসেন্স, বসবাসের ধরন ও আইনি অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
তাই গাড়ি চালানো শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ম অবশ্যই যাচাই করা উচিত। নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ : নতুন যারা যুক্তরাজ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের প্রথম পরামর্শÑনিয়মিত অনুশীলন করুন। ড্রাইভিং লেসন ফাঁকি না দিয়ে প্রতিটি লেসনে নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। থিওরি পরীক্ষাকেও কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
সড়কের নিয়ম ও পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতিও অনেক সহজ হয়। একজন ভালো ও ধৈর্যশীল প্রশিক্ষক নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার আগে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে আলাদাভাবে অনুশীলন করা দরকার। একই সঙ্গে সম্ভাব্য খরচের বিষয়টিও আগে থেকে মাথায় রাখতে হবে। ব্যর্থতা শেষ কথা নয় : দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বারে আমি সফল হয়েছি।
তাই আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হওয়া মানেই আপনি গাড়ি চালাতে পারবেন নাÑ এমন নয়। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা নিজের ভুলগুলো বোঝার একটি সুযোগ। যুক্তরাজ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া সহজও নয়, আবার অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন নিয়ম মেনে শেখার মানসিকতা, পর্যাপ্ত অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং ধৈর্য। আমি নিজে তিনবার চেষ্টা করে সফল হয়েছি।
তাই যারা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের বলবÑ ভুল থেকে শিখুন, অনুশীলন চালিয়ে যান এবং হাল ছাড়বেন না। চেষ্টা থাকলে সফলতা আসবেই।


















