গণঅধিকার নিশ্চিতে ছয় দফা দাবি আদায়ে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছে ১১ দলীয় জোট। একই সঙ্গে এসব দাবি মানা না হলে সরকার পতন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ থেকে জোট নেতারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধে সরকারের প্রতি কঠোর বার্তা দেন তারা। শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়।
লংমার্চটি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা কর্মসূচি পালন করে। এর অংশ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীত পথসভার আয়োজন করে। লংমার্চের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইবে, তাদের মোকাবিলায় ইনশাআল্লাহ সাড়ে ১৫ বছর সময় লাগবে না।
আমরা তাদের চিনি। আমরা এই মাটির সন্তান, এখানেই একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে চলেছি। কার কতটুকু বুকের পাটা, আমরা জানি। তিনি বলেন, দেখতে পাচ্ছি আমাদের কর্মসূচি ওষুধের মতো কাজ করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চের কুমিল্লা সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে। আমাদের স্পষ্ট ৬ দফা দাবির পর সপ্তম দফা দাবি হচ্ছে কোনো চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে আমরা বরদাস্ত করব না। ’ দেশের মানুষ বর্তমান সরকারের কাছ থেকে মুক্তি চায় মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া কথা রক্ষা করেনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কাজ হিসেবে জুলাই সনদের সঙ্গে বেইমানি করেছে। যে জুলাই সনদ সামনে রেখে তারা জনগণকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ তারা সেই সনদ অস্বীকার করছে। জামায়াত আমির বলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় আসা এই সরকারের আমলে দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও চরম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে আজ চারদিকে শুধু হাহাকার।
তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। এখন ওনার সেই প্ল্যান কি শেষ হয়ে গেছে? যে কারণে এখন বিরোধী দলের কাছে প্ল্যান চান? আমরা তো প্ল্যান দিয়েছি, কিন্তু সেই প্ল্যান শোনার পর ওনারা আর কোনো কথা বলছেন না। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহর প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘পড়ার টেবিলে বসে থাকা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে রাগে-ক্ষোভে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করে সিফাত কিছু গালমন্দ করেছিল।
আমরা তার অশালীন ভাষা সমর্থন করি না, তবে তাকে গ্রেপ্তারের পর মারাত্মক প্রহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘হিম্মত থাকলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের হত্যাকারী, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরের হামলাকারীদের বিচার করুন। বদলে আমাকে জেলে নিয়ে যান, তা-ও ওই সব হত্যাকারীর বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করান।
জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছেন। তার পরও আমরা তা মেনে নিয়েছি। জনগণকে বিভিন্ন ওয়াদা দিয়েছেন। সেই ওয়াদা পূরণ করুন। এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আমরা সংসদে বিরোধী দলের ৯০ জন সংসদ সদস্য রয়েছি। অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন। অন্যথায় ৬ দফা আন্দোলন ১ দফায় পরিণত হবে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ড. আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, সরকারকে ‘ওয়েক-আপ কল’ হিসেবে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছে।
সরকা কে মানুষের দাবি এবং তাদের ভাষা বুঝতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অনেক দুঃখ-কষ্টে আছে। জনগণ তাদের দুর্দশা লাঘবে মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তা থেকে দূরে সরে গেছে। মানুষ সরকারের ওপর থেকে আস্তে আস্তে তাদের সমর্থন তুলে নিচ্ছে। মানুষ নানা দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের মধ্যে রয়েছে। জনগণের ন্যায্য দাবি পূরণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সরকার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দিনে দিনে দুর্ভোগ বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জনগণকে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সরকারকে সংসদে ভুল স্বীকার করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। লংমার্চে অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন হচ্ছে।
যদি সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে এই লংমার্চের ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা বাংলাদেশের মানুষ লংমার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে সবাই ঢাকায় একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল। এবার আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য বিভাগের উদ্দেশে লংমার্চের যাত্রা শুরু করেছি। নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে যাচ্ছে, সেই স্বৈরাচার হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এই লংমার্চ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে লংমার্চ। এই লংমার্চ যারা তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে লংমার্চ। এই লংমার্চ যারা ৭০ শতাংশ জনগণের গণরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে লংমার্চ। এনসিপি সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কর্মসূচি ঘিরে মানুষের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা আর থামানো যাবে না।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত জনতার যে জোয়ার তৈরি হয়েছে, সেই জোয়ার থামানোর ক্ষমতা কারো নেই। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ করুন। জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুন। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, মানুষের ঘরে হারিকেন-মোমবাতি ফিরে এসেছে, লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই অথচ সবকিছুর দাম বেড়েছে। এভাবে পেছনে যেতে যেতে বাংলাদেশ প্রস্তর যুগে চলে যেতে পারে। আসিফ মাহমুদ বলেন, এই সরকার গঠনের পর থেকে মূল সমস্যায় হাত না দিয়ে ইতোমধ্যে ব্যর্থ হওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা খাল খনন করতে গেলেও সেখানে প্রতিদিন দুর্নীতির অভিযোগ আসছে। বিভিন্ন জায়গায় খাল খনন না করেই অর্থ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, জমিনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই ৬ দফা দাবি আদায়ের জন্য মাঠে নেমেছি। সরকারকে বলব, আপনারা দাবিগুলো মেনে নেন। যদি দাবি না মানেন, এই ৬ দফা এক দফায় রূপান্তর হবে— সেটি হলো সরকারের পদত্যাগ। তিনি বলেন, সরকারের গদি নড়ে গেছে। আপনারা সবাই মাঠে থাকবেন।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, একটা সরকার গঠন হওয়ার পর লোকে বলে এই সরকার টিকবে না। মানুষ এটা কখন বলে? সারাক্ষণ দেখছি নারীরা, পুরুষেরা নিজের জুতা নিজের কপালে মারছে, বলছে আর কখনো বিএনপিকে ভোট দেব না। তিনি বলেন, তারেক রহমান সাহেব চেষ্টা করতে পারেন, দেখেন আপনার লোকগুলো ঘুম থেকে ওঠে কি না।
কারণ উনারা এবাদত করেন, অনেক দেরিতে ঘুমান। গত ছয় মাসে বিএনপি সরকারের বলার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, দেড়শ টাকার লাঞ্চের গল্প আর ৫০ হাজার ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া সরকারের অর্জন হিসেবে দেখানোর মতো কিছু নেই। মঞ্জু বলেন, ৩১ দফার স্বপ্ন দেখানো এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকারকারী দলের কার্যক্রমে ইতোমধ্যে মানুষ হতাশ হতে শুরু করেছে।
আরও বলেন, বিএনপিকে ভোট দিয়ে মানুষ এখন আফসোস করছে। অসহনীয় লোডশেডিং ও ভৌতিক বিদ্যুৎ বিলের কারণে রাগে-ক্ষোভে মানুষ অশ্লীল গালিগালাজ করতেও দ্বিধা করছে না। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জাতিকে ভুল পথে নিতে চাইলে হাত-পায়ে ধরে অনুরোধ করা হবে, তবু যদি সঠিক পথে না আসেন, তাহলে ঘাড় ধরতে এক চুল পরিমাণও হাত কাঁপবে না।
সরকার তার যাত্রার শুরুতে ছয় মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপির বিরুদ্ধে হত্যা, বাড়ি-জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলাদেশে আমাদের দাবি পরিষ্কার। গণভোটের লাইন নিতে হবে। দিতে হবে। না দিতে পারলে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
সারা বাংলাদেশে বিএনপি জালিমের মতো হয়েছে। তারা মানুষ হত্যা করেছে, বাড়ি দখল করছে, জমি দখল করছে। মানুষকে জিম্মি করে কিস্তিতে চাঁদা তোলা শুরু করেছে। এর আগে গতকাল সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়। লংমার্চটি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা কর্মসূচি পালন করে।
এর অংশ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীতে পথসভার আয়োজন করে। ১১-দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবিগুলো অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।






















