আজ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩১°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

পরিবেশ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি উদ্যোগ

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:03:19 pm, Friday, 4 September 2026
  • 6

পরিবেশ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি উদ্যোগ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

জলবায়ু সংকটের কারণে আজ সমগ্র বিশ্ব বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান রয়েছে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে। বিশ্বজুড়ে চলমান উষ্ণায়ন, অকাল বন্যা, তীব্র দাবদাহ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার মতো ঘটনাগুলো এখন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সম্প্রতি একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ থিমের আওতায় শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিপিইর সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো এই নির্দেশনা শুধু একটি সরকারি চিঠিমাত্র নয়; বরং এটি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ও পরিবেশ ভাবনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বার্তা বহন করে। ডিপিইর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচির অধীনে বিদ্যালয়গুলোতে কতটি গাছ লাগানো হবে, কোথায় লাগানো হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে—তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়ভিত্তিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে শতভাগ বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই ভাবনার মূল রসদটি লুকিয়ে রয়েছে শিশুর মনস্তত্ত্ব এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মিক মেলবন্ধনের গভীরে। একজন শিশুর হাতে যখন একটি গাছের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন সেই গাছটি আর কেবল একটি উদ্ভিদের তালিকায় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রথম পরিবেশগত বন্ধু।

ফলে শৈশব থেকেই একজন শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠে পরিবেশের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ ও নাগরিক সচেতনতা। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি উচ্ছেদ, নদী দখল এবং অতিরিক্ত ইটভাটা ও শিল্প-কারখানার ধোঁয়ার কারণে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ পার হয়ে আষাঢ়-শ্রাবণেও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির; পরিবর্তে তাপদাহ বা ‘হিটওয়েভ’ বিপর্যস্ত করে তুলছে জনজীবন। শহরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতেও এখন আর সেই আগের মতো ঘন সবুজের ছায়া নেই। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক হলেও আমাদের দেশে কার্যকর বনভূমির পরিমাণ এর অর্ধেকেরও কম।

এই পরিস্থিতিতে নিছক আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণ সপ্তাহের ফিতা কেটে কোটি কোটি চারা রোপণ করে পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। কারণ, প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ মৌসুমে হাজার হাজার চারা রোপণ করা হলেও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার একটি বড় অংশই মরে যায়। ডিপিইর ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি ঠিক এই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটাতে পারে, কারণ এখানে প্রতিটি গাছের সঙ্গে যুক্ত থাকছে একজন নির্দিষ্ট শিশু, যা গাছটির বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা অনেক গুণে বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বইয়ের পাতায় ‘পরিবেশ দূষণ’ কিংবা ‘গাছের প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে বহু অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সম্ভব হলেও সত্যিকারের পরিবেশপ্রেমী হওয়া সম্ভব নয়, কারণ শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন তা আচরণের অংশ হয়ে ওঠে। ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি মূলত পরিবেশ শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল থেকে বের করে এনে মাটির স্পর্শে নিয়ে আসবে।

যখন কোনো শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিজের হাতে একটি চারা গাছ রোপণ করবে এবং তার প্রাথমিকে পড়ার পুরো পাঁচ বছর সেই গাছটিকে একটু একটু করে বড় হতে দেখবে, তখন তার ভেতরে যে জীবনবোধের জন্ম হবে, তা কোনো তাত্ত্বিক পাঠ দিয়ে সম্ভব নয়। শিশুটি প্রতিদিন নিজ হাতে গাছে পানি দেবে, রোদের হাত থেকে তা রক্ষা করবে, ছাগল বা গরু থেকে বাঁচাতে বেড়া দেবে।

এতে গাছ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মনে সহানুভূতি, মানবতা ও দায়িত্বশীলতার মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলী ফুটে উঠবে এবং সে শিখবে যে পরিবেশ রক্ষা কোনো জটিল রাজনীতি নয়, এটি প্রতিদিনের ভালোবাসার চর্চা। অতীতের যেকোনো গতানুগতিক সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তুলনায় এই নির্দেশনার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হলো—এখানে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ক্যালেন্ডার তৈরির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

ডিপিইর জুলাই ২০২৬-এর মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপে বছরের কোন সময়ে চারা প্রস্তুত করা হবে, কোন মাসে রোপণ করা হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে কীভাবে সেটার সেচ নিশ্চিত করা হবে—তার একটি সময়সূচি থাকবে। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে গড়ে ২০০ জন করেও শিক্ষার্থী থাকে, তবে প্রতিবছর এক কোটি ৩০ লাখের বেশি নতুন গাছ যুক্ত হতে পারে আমাদের সবুজ মানচিত্রে, যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি বিশাল সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলন।

তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের সরাসরি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের এই কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করতে হবে, যেন বিষয়টি অতিরিক্ত কাজের বোঝা হিসেবে না দেখে আনন্দের খোরাক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি সফল করতে হলে চারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করাও জরুরি। বিগত কয়েক দশকে আমাদের দেশে ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো বিদেশী প্রজাতি লাগানোর ফলে মাটি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাই এই কর্মসূচির অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবশ্যই আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকী কিংবা কামরাঙার মতো দেশীয় ফলদ গাছ রোপণ করতে হবে, যেন টিফিনের সময় শিশুরা পুষ্টিকর তাজা ফল পাওয়ার সুযোগ পায়।

পাশাপাশি নিম, তুলসী, বহেরা, অর্জুন, বকুল ও শিমুলের মতো ওষধি ও বনজ গাছ রোপণ করা প্রয়োজন, যা পরিবেশের বাতাস বিশুদ্ধ করে এবং প্রাকৃতিক জীবাণুমুক্ত কারক হিসেবে কাজ করে। দেশীয় গাছ রোপণ করলে বিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গ ফিরে আসবে এবং শহরাঞ্চলের কৃত্রিম ইট-পাথরের দেয়ালের মাঝে বড় হওয়া শিশুরা নিজ চোখে পাখির বাসা বাঁধা ও প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখতে পাবে, যা তাদের শৈশবকে করবে আনন্দময় ও প্রকৃতির সান্নিধ্যধন্য।

তবে যেকোনো মহৎ উদ্যোগের পথেই কিছু ব্যবহারিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকে, যা আগে থেকেই চিহ্নিত করে সমাধান করা প্রয়োজন। শহরাঞ্চল বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ বা ফাঁকা জমি না থাকায় টব বা ড্রামে করে ছাদে ও বারান্দায় ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’ বা টব-ভিত্তিক বাগান তৈরি করা যেতে পারে।

একইভাবে গ্রীষ্মকালীন কিংবা দীর্ঘ ছুটির সময়ে যখন বিদ্যালয় বন্ধ থাকে, তখন গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্থানীয় অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি (PTA), পরিচালনা পর্ষদ (SMC) এবং স্থানীয় স্কাউট বা ক্যাব দলকে সম্পৃক্ত করা যায়। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, পরিবেশবাদী দল এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগে যুক্ত করে অর্থের সংস্থান ও সুরক্ষাসামগ্রী জোগাড় করা সম্ভব।

এছাড়া বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার শেষে যে শিশুটি তার গাছের সবচেয়ে ভালো পরিচর্যা করবে, তাকে বার্ষিক প্রতিযোগিতায় ‘সবুজ বন্ধু’ বা ‘পরিবেশ পুরষ্কার’ দেওয়া যেতে পারে, যা শিশুদের মাঝে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। বিশ্বজুড়ে আজ ‘ক্লাইমেট এডুকেশন’ বা জলবায়ু শিক্ষার ওপর চরম জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ বারবার তাগিদ দিচ্ছে যেন শিশুদের শুধু পরিবেশের জলবায়ু বিপর্যয়ের ভীতি না দেখিয়ে সমাধানের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশবিদ ওয়াঙ্গারি মাথাই এর “গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট” কিংবা সুইডেনের তরুণী গ্রেটা থুনবার্গের আন্দোলন বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম চাইলে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি অনুকরণীয় রোল মডেল হতে পারে, কারণ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখেছে, বাংলাদেশ তার বিশাল প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।

আজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে চারাটি রোপণ করা হবে, তা শুধু ওই বিদ্যালয়ের উঠোনকে সবুজ করবে না, বরং আগামীর জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো,গাছ শুধু আমাদের অক্সিজেন দেয় না, তা আমাদের বাঁচতে শেখায়, সহনশীল হতে শেখায় এবং সহমর্মী হতে শেখায়। একটি নিষ্পাপ শিশু যখন একটি ছোট্ট চারার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে বড় করে তোলে, তখন তার হৃদয় থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও রুক্ষতা দূর হয়ে জন্ম নেয় এক বিশাল দরদী মন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত এই ক্যালেন্ডারভিত্তিক ও পরিকল্পিত ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ আন্দোলন কেবল একটি বৃক্ষরোপণ অভিযান নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিপ্লবের সূচনা। আমরা বিশ্বাস করি, ডিপিইর এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত যদি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় সফল বাস্তবায়নের মুখ দেখে, তবে তা বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই সবুজের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে, আর প্রতিটি শিশুর হাতের ছোঁয়ায় এক একটি নতুন চারা ডালপালা মেলে উঠে নিশ্চিত করুক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক নিরাপদ, সুস্থ ও সবুজ পৃথিবী।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

পরিবেশ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি উদ্যোগ

পরিবেশ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি উদ্যোগ

Update Time : 03:03:19 pm, Friday, 4 September 2026

জলবায়ু সংকটের কারণে আজ সমগ্র বিশ্ব বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান রয়েছে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে। বিশ্বজুড়ে চলমান উষ্ণায়ন, অকাল বন্যা, তীব্র দাবদাহ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার মতো ঘটনাগুলো এখন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সম্প্রতি একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ থিমের আওতায় শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিপিইর সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো এই নির্দেশনা শুধু একটি সরকারি চিঠিমাত্র নয়; বরং এটি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ও পরিবেশ ভাবনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বার্তা বহন করে। ডিপিইর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচির অধীনে বিদ্যালয়গুলোতে কতটি গাছ লাগানো হবে, কোথায় লাগানো হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে—তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়ভিত্তিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে শতভাগ বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই ভাবনার মূল রসদটি লুকিয়ে রয়েছে শিশুর মনস্তত্ত্ব এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মিক মেলবন্ধনের গভীরে। একজন শিশুর হাতে যখন একটি গাছের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন সেই গাছটি আর কেবল একটি উদ্ভিদের তালিকায় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রথম পরিবেশগত বন্ধু।

ফলে শৈশব থেকেই একজন শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠে পরিবেশের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ ও নাগরিক সচেতনতা। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি উচ্ছেদ, নদী দখল এবং অতিরিক্ত ইটভাটা ও শিল্প-কারখানার ধোঁয়ার কারণে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ পার হয়ে আষাঢ়-শ্রাবণেও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির; পরিবর্তে তাপদাহ বা ‘হিটওয়েভ’ বিপর্যস্ত করে তুলছে জনজীবন। শহরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতেও এখন আর সেই আগের মতো ঘন সবুজের ছায়া নেই। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক হলেও আমাদের দেশে কার্যকর বনভূমির পরিমাণ এর অর্ধেকেরও কম।

এই পরিস্থিতিতে নিছক আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণ সপ্তাহের ফিতা কেটে কোটি কোটি চারা রোপণ করে পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। কারণ, প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ মৌসুমে হাজার হাজার চারা রোপণ করা হলেও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার একটি বড় অংশই মরে যায়। ডিপিইর ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি ঠিক এই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটাতে পারে, কারণ এখানে প্রতিটি গাছের সঙ্গে যুক্ত থাকছে একজন নির্দিষ্ট শিশু, যা গাছটির বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা অনেক গুণে বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বইয়ের পাতায় ‘পরিবেশ দূষণ’ কিংবা ‘গাছের প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে বহু অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সম্ভব হলেও সত্যিকারের পরিবেশপ্রেমী হওয়া সম্ভব নয়, কারণ শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন তা আচরণের অংশ হয়ে ওঠে। ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি মূলত পরিবেশ শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল থেকে বের করে এনে মাটির স্পর্শে নিয়ে আসবে।

যখন কোনো শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিজের হাতে একটি চারা গাছ রোপণ করবে এবং তার প্রাথমিকে পড়ার পুরো পাঁচ বছর সেই গাছটিকে একটু একটু করে বড় হতে দেখবে, তখন তার ভেতরে যে জীবনবোধের জন্ম হবে, তা কোনো তাত্ত্বিক পাঠ দিয়ে সম্ভব নয়। শিশুটি প্রতিদিন নিজ হাতে গাছে পানি দেবে, রোদের হাত থেকে তা রক্ষা করবে, ছাগল বা গরু থেকে বাঁচাতে বেড়া দেবে।

এতে গাছ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মনে সহানুভূতি, মানবতা ও দায়িত্বশীলতার মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলী ফুটে উঠবে এবং সে শিখবে যে পরিবেশ রক্ষা কোনো জটিল রাজনীতি নয়, এটি প্রতিদিনের ভালোবাসার চর্চা। অতীতের যেকোনো গতানুগতিক সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তুলনায় এই নির্দেশনার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হলো—এখানে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ক্যালেন্ডার তৈরির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

ডিপিইর জুলাই ২০২৬-এর মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপে বছরের কোন সময়ে চারা প্রস্তুত করা হবে, কোন মাসে রোপণ করা হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে কীভাবে সেটার সেচ নিশ্চিত করা হবে—তার একটি সময়সূচি থাকবে। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে গড়ে ২০০ জন করেও শিক্ষার্থী থাকে, তবে প্রতিবছর এক কোটি ৩০ লাখের বেশি নতুন গাছ যুক্ত হতে পারে আমাদের সবুজ মানচিত্রে, যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি বিশাল সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলন।

তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের সরাসরি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের এই কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করতে হবে, যেন বিষয়টি অতিরিক্ত কাজের বোঝা হিসেবে না দেখে আনন্দের খোরাক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি সফল করতে হলে চারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করাও জরুরি। বিগত কয়েক দশকে আমাদের দেশে ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো বিদেশী প্রজাতি লাগানোর ফলে মাটি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাই এই কর্মসূচির অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবশ্যই আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকী কিংবা কামরাঙার মতো দেশীয় ফলদ গাছ রোপণ করতে হবে, যেন টিফিনের সময় শিশুরা পুষ্টিকর তাজা ফল পাওয়ার সুযোগ পায়।

পাশাপাশি নিম, তুলসী, বহেরা, অর্জুন, বকুল ও শিমুলের মতো ওষধি ও বনজ গাছ রোপণ করা প্রয়োজন, যা পরিবেশের বাতাস বিশুদ্ধ করে এবং প্রাকৃতিক জীবাণুমুক্ত কারক হিসেবে কাজ করে। দেশীয় গাছ রোপণ করলে বিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গ ফিরে আসবে এবং শহরাঞ্চলের কৃত্রিম ইট-পাথরের দেয়ালের মাঝে বড় হওয়া শিশুরা নিজ চোখে পাখির বাসা বাঁধা ও প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখতে পাবে, যা তাদের শৈশবকে করবে আনন্দময় ও প্রকৃতির সান্নিধ্যধন্য।

তবে যেকোনো মহৎ উদ্যোগের পথেই কিছু ব্যবহারিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকে, যা আগে থেকেই চিহ্নিত করে সমাধান করা প্রয়োজন। শহরাঞ্চল বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ বা ফাঁকা জমি না থাকায় টব বা ড্রামে করে ছাদে ও বারান্দায় ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’ বা টব-ভিত্তিক বাগান তৈরি করা যেতে পারে।

একইভাবে গ্রীষ্মকালীন কিংবা দীর্ঘ ছুটির সময়ে যখন বিদ্যালয় বন্ধ থাকে, তখন গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্থানীয় অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি (PTA), পরিচালনা পর্ষদ (SMC) এবং স্থানীয় স্কাউট বা ক্যাব দলকে সম্পৃক্ত করা যায়। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, পরিবেশবাদী দল এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগে যুক্ত করে অর্থের সংস্থান ও সুরক্ষাসামগ্রী জোগাড় করা সম্ভব।

এছাড়া বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার শেষে যে শিশুটি তার গাছের সবচেয়ে ভালো পরিচর্যা করবে, তাকে বার্ষিক প্রতিযোগিতায় ‘সবুজ বন্ধু’ বা ‘পরিবেশ পুরষ্কার’ দেওয়া যেতে পারে, যা শিশুদের মাঝে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। বিশ্বজুড়ে আজ ‘ক্লাইমেট এডুকেশন’ বা জলবায়ু শিক্ষার ওপর চরম জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ বারবার তাগিদ দিচ্ছে যেন শিশুদের শুধু পরিবেশের জলবায়ু বিপর্যয়ের ভীতি না দেখিয়ে সমাধানের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশবিদ ওয়াঙ্গারি মাথাই এর “গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট” কিংবা সুইডেনের তরুণী গ্রেটা থুনবার্গের আন্দোলন বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম চাইলে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি অনুকরণীয় রোল মডেল হতে পারে, কারণ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখেছে, বাংলাদেশ তার বিশাল প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।

আজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে চারাটি রোপণ করা হবে, তা শুধু ওই বিদ্যালয়ের উঠোনকে সবুজ করবে না, বরং আগামীর জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো,গাছ শুধু আমাদের অক্সিজেন দেয় না, তা আমাদের বাঁচতে শেখায়, সহনশীল হতে শেখায় এবং সহমর্মী হতে শেখায়। একটি নিষ্পাপ শিশু যখন একটি ছোট্ট চারার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে বড় করে তোলে, তখন তার হৃদয় থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও রুক্ষতা দূর হয়ে জন্ম নেয় এক বিশাল দরদী মন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত এই ক্যালেন্ডারভিত্তিক ও পরিকল্পিত ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ আন্দোলন কেবল একটি বৃক্ষরোপণ অভিযান নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিপ্লবের সূচনা। আমরা বিশ্বাস করি, ডিপিইর এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত যদি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় সফল বাস্তবায়নের মুখ দেখে, তবে তা বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই সবুজের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে, আর প্রতিটি শিশুর হাতের ছোঁয়ায় এক একটি নতুন চারা ডালপালা মেলে উঠে নিশ্চিত করুক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক নিরাপদ, সুস্থ ও সবুজ পৃথিবী।