আজ রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
১৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

রাজধানীর গাবতলীতে ছিনতাইয়ের শিকার স্কুলশিক্ষিকা

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:25:44 pm, Saturday, 29 August 2026
  • 13

রাজধানীর গাবতলীতে ছিনতাইয়ের শিকার স্কুলশিক্ষিকা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বগুড়ার গাবতলী উপজেলা থেকে ঢাকায় চোখের চিকিৎসার জন্য আসেন ৫৫ বছর বয়সি স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীন। শনিবার ভোরে রাজধানীর গাবতলীতে বাস থেকে নেমে রিকশাযোগে ফার্মগেট ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন।

কিন্তু চিকিৎসা করাতে আর হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারেননি। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে পথেই প্রাণ হারান এ স্কুলশিক্ষিকা। চিকিৎসা করাতে এসে লাশ হয়ে ফিরতে হবে, তা কল্পনাতেও আনেননি রনজীলা পারভীনের পরিবার। শুধু স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীনই নন, ঢাকার রাজপথে ছিনতাইকারীদের হাতে এভাবে হরহামেশা প্রাণ দিতে হচ্ছে অনেককে। গত দুই বছরে ছিনতাইকারীদের হাতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন।

শুধু প্রাণ কেড়ে নেওয়াই নয়, ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ে অর্থ, মোবাইলসহ অন্যান্য মালামাল হারানোর পাশাপাশি গুরুতর জখম হচ্ছেন অনেকেই। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ছিনতাই এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে ছিনতাইয়ের যে মহোৎসব শুরু হয়েছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বর্তমান সরকার বা আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে ছিনতাই করেছে।

তবে এখন শঙ্কার বিষয় হলো, আগে ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও এখন ছিনতাইকারীরা এসে আগে আঘাত করে। ফলে অনেকে গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক এখন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। অস্ত্র ঠেকিয়ে দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানোর তালিকায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, এমনকি পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাজপথ কি কখনোই নিরাপদ হয়ে উঠবে না। এভাবে আর কত ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ ও সম্পদ হারাতে হবে? পুলিশের ভাষ্য, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অধিকাংশ ঘটনায় ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কিছুদিন জেলে থাকার পর চক্রের সদস্যরা কতিপয় আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। জামিনে এসে তারা আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন।

পুলিশ চেষ্টা করছে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কমিয়ে আনার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ভোরে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানো স্কুলশিক্ষিকার বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায়। তিনি উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বামীর সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে গতকাল ভোরে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় বাস থেকে নেমে একটি রিকশা নেন।

গন্তব্য ছিল ফার্মগেট ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল। অটোরিকশাযোগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছার পরপরই মোটরসাইকেলে পেছন থেকে আসা দুই যুবক রিকশারোহী শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে টান দেয়। সজোরে টান দেওয়ার কারণে ওই শিক্ষিকা রিকশা থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। পাকা সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় গতকাল রাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করে। সরকারের পতনের সময়ে দেশের কয়েকটি কারাগার থেকে দাগি অপরাধীদের একটি বড় অংশ পালিয়ে যায়।

আবার অনেকে গোপনে জামিনে বেরিয়ে আসে। জেল-পলাতক এবং জামিন পাওয়া আসামিদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এর মধ্যে পুলিশ অভিযান চালিয়ে, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত একাধিক গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে।

কিন্তু এদের অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে শতাধিক এলাকাকে ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ৫ আগস্টের পর ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই নিজ নিজ থানা এলাকার ছিনতাইকারীসহ দাগি অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে থেকে যেসব কর্মকর্তা ঢাকায় পদায়ন হয়েছে, তাদের অনেকেই এলাকা সম্পর্কে এখনো পরিচিত হয়ে উঠতে পারেননি। এ ছাড়া থানায় ছিনতাইকারী চক্রের যে ডাটাবেজ ছিল, সেগুলো অনেক থানায় হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পেশাদার ছিনতাইকারীদের অনেকেরই ডাটাবেজ না থাকায় চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। যদিও গত ২ বছরে নতুন করে পুলিশ ছিনতাইকারীদের বিভিন্ন গ্রুপের ডাটাবেজ তৈরি করেছে।

চলতি বছরের ১ মে আগারগাঁওয়ে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন শিল্পী বেগম নামের এক নারী। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি থাকা অসুস্থ শাশুড়ির চিকিৎসার টাকা নিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় ওই নারীর পথরোধ করে টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় ওই নারীকে ছুরিকাঘাত করে জখম করা হয়। প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনো ওই নারী ও তার পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক হয়ে রয়েছে।

এর আগে ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান ফজলে রাব্বি সুমন নামে ২৫ বছর বয়সি এক যুবক। ওই দিন ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে নিয়ে রিকশাযোগে বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় ঘুরতে যান। দুপুরের দিকে ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দেওয়ায় তাকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুমনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কেশেরা গরুবাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আব্দুল কুদ্দুস নামে ৫৫ বছর বয়সি এক মাছ ব্যবসায়ী। ২০২২ সালের অক্টোবরে ভোরের দিকে হাঁটতে বের হয়ে ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন।

২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর কারওয়ান বাজার প্রিন্স হোটেলের সামনে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন কেশব চন্দ্র রায়। তিনি সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। আগের বছর (২০২২) ১১ আগস্ট রাতে উত্তরায় একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় বুথের ভেতরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন ব্যবসায়ী শরিফ উল্লা। একই বছর ২৯ জুলাই পল্লবীতে আরমান নামের এক রিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার পর তার রিকশাটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

ওই বছরের ৬ জুলাই কামরাঙ্গীরচরে ছিনতাইকারীরা সাঈদ নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। ওই একই বছরের ২৭ মার্চ ভোরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী বুলবুল প্রাণ হারান। ২০২২ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে রাজধানীতেই ছিনতাইকারীদের হাতে ৩০ জনের প্রাণ গেছে। একইভাবে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর জেলা ও উপজেলায় এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খুন হন।

পুলিশের প্রায় ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছরই ছিনতাই বেড়ে চলেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত হওয়া মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪৭ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ছিল ৬ হাজার ৮৮০, ২০২০ সালে ৭ হাজার ২০০, ২০২১ সালে ৮ হাজার ৪৯৮, ২০২২ সালে ৯ হাজার ৫৯১, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭৫ এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৮৩টি ঘটনা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ এলাকায় ১৫ হাজার ৪১৯টি। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জে ৭ হাজার ৭৪৬টি। তবে অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় যান না। সে হিসাবে ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ডিএমপির ছিনতাই প্রতিরোধে গঠিত টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ২৭৭টি ছিনতাইয়ের মামলায় দুই শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে।

ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছে এক হাজার ৮৪১ জন। এ সময়ে জামিন পেয়েছে প্রায় এক হাজার ৭৮৬ জন। এই এক বছরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১১২টি দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার আসামিদের বেশির ভাগই জামিনের পরপরই ফের ছিনতাইয়ে জড়িয়েছে। এমনকি জামিনের তিন দিন পরই ছিনতাই করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ারও নজির রয়েছে।

ডিএমপিতে গত দেড় বছরে (২০২৫ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) ছিনতাইয়ের মামলা ও গ্রেপ্তারের চিত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে ছিনতাইয়ের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ৭০৩টি মামলা হয়েছে। এ সময় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৮৩৭ জন। বছর হিসাবে ধরলে ২০২৫ সালে রমনা ডিভিশন এলাকায় ৪১টি মামলাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৪ জন।

একইভাবে লালবাগ ডিভিশনে ২৭ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৯৩টি, গ্রেপ্তার ২১৭ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ১০১, গ্রেপ্তার ১৪৪ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ১৪৬, গ্রেপ্তার ৫১০ জন। মিরপুর বিভাগে মামলা হয়েছে ৫৫, গ্রেপ্তার ২১৯ জন। গুলশান বিভাগে মামলা হয়েছে ২৭, গ্রেপ্তার ৭৩ জন। উত্তরা বিভাগে মামলা হয়েছে ৪১, গ্রেপ্তার ৭৫ জন।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ৫৩১টি মামলা আর গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৩৫ জন। একইভাবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রমনা বিভাগে মামলা হয়েছে ১৭টি, গ্রেপ্তার ৩৭ জন। লালবাগ বিভাগে মামলা হয়েছে ৫টি, গ্রেপ্তার ৭ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৮টি, গ্রেপ্তার ৯৮ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ২৫, গ্রেপ্তার ৩৬ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৪, গ্রেপ্তার ১৩৮।

মিরপুর বিভাগে মামলা ১৬, গ্রেপ্তার ৪০ জন। গুলশান বিভাগে মামলা ২০, গ্রেপ্তার ৩১ এবং উত্তরা বিভাগে ১৭ মামলা, গ্রেপ্তার ১৫ জন। সবমিলিয়ে ১৭২টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৪০২ জন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনায় মামলা করেন না ভুক্তভোগীরা। গুরুতর আহত বা বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে মামলা হয় না। মামলা দিয়ে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানান, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা গ্রহণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ছিনতাইয়ের সময় তারা শুধু সম্পদ লুটেই ক্ষান্ত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে হত্যা বা গুরুতর আহতও করে। তাই ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংগঠিত গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

অন্যথায় শুধু মাঠ পর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বাস্তব অপরাধকে যথাযথভাবে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

গুমের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড ও ক্ষতিপূরণের বিধান রেখে প্রস্তাবিত আইন, স্বাধীন তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ

রাজধানীর গাবতলীতে ছিনতাইয়ের শিকার স্কুলশিক্ষিকা

Update Time : 11:25:44 pm, Saturday, 29 August 2026

বগুড়ার গাবতলী উপজেলা থেকে ঢাকায় চোখের চিকিৎসার জন্য আসেন ৫৫ বছর বয়সি স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীন। শনিবার ভোরে রাজধানীর গাবতলীতে বাস থেকে নেমে রিকশাযোগে ফার্মগেট ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন।

কিন্তু চিকিৎসা করাতে আর হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারেননি। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে পথেই প্রাণ হারান এ স্কুলশিক্ষিকা। চিকিৎসা করাতে এসে লাশ হয়ে ফিরতে হবে, তা কল্পনাতেও আনেননি রনজীলা পারভীনের পরিবার। শুধু স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীনই নন, ঢাকার রাজপথে ছিনতাইকারীদের হাতে এভাবে হরহামেশা প্রাণ দিতে হচ্ছে অনেককে। গত দুই বছরে ছিনতাইকারীদের হাতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন।

শুধু প্রাণ কেড়ে নেওয়াই নয়, ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ে অর্থ, মোবাইলসহ অন্যান্য মালামাল হারানোর পাশাপাশি গুরুতর জখম হচ্ছেন অনেকেই। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ছিনতাই এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে ছিনতাইয়ের যে মহোৎসব শুরু হয়েছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বর্তমান সরকার বা আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে ছিনতাই করেছে।

তবে এখন শঙ্কার বিষয় হলো, আগে ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও এখন ছিনতাইকারীরা এসে আগে আঘাত করে। ফলে অনেকে গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক এখন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। অস্ত্র ঠেকিয়ে দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানোর তালিকায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, এমনকি পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাজপথ কি কখনোই নিরাপদ হয়ে উঠবে না। এভাবে আর কত ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ ও সম্পদ হারাতে হবে? পুলিশের ভাষ্য, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অধিকাংশ ঘটনায় ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কিছুদিন জেলে থাকার পর চক্রের সদস্যরা কতিপয় আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। জামিনে এসে তারা আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন।

পুলিশ চেষ্টা করছে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কমিয়ে আনার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ভোরে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানো স্কুলশিক্ষিকার বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায়। তিনি উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বামীর সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে গতকাল ভোরে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় বাস থেকে নেমে একটি রিকশা নেন।

গন্তব্য ছিল ফার্মগেট ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল। অটোরিকশাযোগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছার পরপরই মোটরসাইকেলে পেছন থেকে আসা দুই যুবক রিকশারোহী শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে টান দেয়। সজোরে টান দেওয়ার কারণে ওই শিক্ষিকা রিকশা থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। পাকা সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় গতকাল রাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করে। সরকারের পতনের সময়ে দেশের কয়েকটি কারাগার থেকে দাগি অপরাধীদের একটি বড় অংশ পালিয়ে যায়।

আবার অনেকে গোপনে জামিনে বেরিয়ে আসে। জেল-পলাতক এবং জামিন পাওয়া আসামিদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এর মধ্যে পুলিশ অভিযান চালিয়ে, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত একাধিক গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে।

কিন্তু এদের অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে শতাধিক এলাকাকে ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ৫ আগস্টের পর ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই নিজ নিজ থানা এলাকার ছিনতাইকারীসহ দাগি অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে থেকে যেসব কর্মকর্তা ঢাকায় পদায়ন হয়েছে, তাদের অনেকেই এলাকা সম্পর্কে এখনো পরিচিত হয়ে উঠতে পারেননি। এ ছাড়া থানায় ছিনতাইকারী চক্রের যে ডাটাবেজ ছিল, সেগুলো অনেক থানায় হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পেশাদার ছিনতাইকারীদের অনেকেরই ডাটাবেজ না থাকায় চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। যদিও গত ২ বছরে নতুন করে পুলিশ ছিনতাইকারীদের বিভিন্ন গ্রুপের ডাটাবেজ তৈরি করেছে।

চলতি বছরের ১ মে আগারগাঁওয়ে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন শিল্পী বেগম নামের এক নারী। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি থাকা অসুস্থ শাশুড়ির চিকিৎসার টাকা নিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় ওই নারীর পথরোধ করে টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় ওই নারীকে ছুরিকাঘাত করে জখম করা হয়। প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনো ওই নারী ও তার পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক হয়ে রয়েছে।

এর আগে ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান ফজলে রাব্বি সুমন নামে ২৫ বছর বয়সি এক যুবক। ওই দিন ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে নিয়ে রিকশাযোগে বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় ঘুরতে যান। দুপুরের দিকে ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দেওয়ায় তাকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুমনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কেশেরা গরুবাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আব্দুল কুদ্দুস নামে ৫৫ বছর বয়সি এক মাছ ব্যবসায়ী। ২০২২ সালের অক্টোবরে ভোরের দিকে হাঁটতে বের হয়ে ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন।

২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর কারওয়ান বাজার প্রিন্স হোটেলের সামনে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন কেশব চন্দ্র রায়। তিনি সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। আগের বছর (২০২২) ১১ আগস্ট রাতে উত্তরায় একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় বুথের ভেতরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন ব্যবসায়ী শরিফ উল্লা। একই বছর ২৯ জুলাই পল্লবীতে আরমান নামের এক রিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার পর তার রিকশাটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

ওই বছরের ৬ জুলাই কামরাঙ্গীরচরে ছিনতাইকারীরা সাঈদ নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। ওই একই বছরের ২৭ মার্চ ভোরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী বুলবুল প্রাণ হারান। ২০২২ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে রাজধানীতেই ছিনতাইকারীদের হাতে ৩০ জনের প্রাণ গেছে। একইভাবে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর জেলা ও উপজেলায় এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খুন হন।

পুলিশের প্রায় ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছরই ছিনতাই বেড়ে চলেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত হওয়া মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪৭ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ছিল ৬ হাজার ৮৮০, ২০২০ সালে ৭ হাজার ২০০, ২০২১ সালে ৮ হাজার ৪৯৮, ২০২২ সালে ৯ হাজার ৫৯১, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭৫ এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৮৩টি ঘটনা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ এলাকায় ১৫ হাজার ৪১৯টি। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জে ৭ হাজার ৭৪৬টি। তবে অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় যান না। সে হিসাবে ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ডিএমপির ছিনতাই প্রতিরোধে গঠিত টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ২৭৭টি ছিনতাইয়ের মামলায় দুই শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে।

ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছে এক হাজার ৮৪১ জন। এ সময়ে জামিন পেয়েছে প্রায় এক হাজার ৭৮৬ জন। এই এক বছরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১১২টি দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার আসামিদের বেশির ভাগই জামিনের পরপরই ফের ছিনতাইয়ে জড়িয়েছে। এমনকি জামিনের তিন দিন পরই ছিনতাই করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ারও নজির রয়েছে।

ডিএমপিতে গত দেড় বছরে (২০২৫ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) ছিনতাইয়ের মামলা ও গ্রেপ্তারের চিত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে ছিনতাইয়ের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ৭০৩টি মামলা হয়েছে। এ সময় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৮৩৭ জন। বছর হিসাবে ধরলে ২০২৫ সালে রমনা ডিভিশন এলাকায় ৪১টি মামলাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৪ জন।

একইভাবে লালবাগ ডিভিশনে ২৭ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৯৩টি, গ্রেপ্তার ২১৭ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ১০১, গ্রেপ্তার ১৪৪ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ১৪৬, গ্রেপ্তার ৫১০ জন। মিরপুর বিভাগে মামলা হয়েছে ৫৫, গ্রেপ্তার ২১৯ জন। গুলশান বিভাগে মামলা হয়েছে ২৭, গ্রেপ্তার ৭৩ জন। উত্তরা বিভাগে মামলা হয়েছে ৪১, গ্রেপ্তার ৭৫ জন।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ৫৩১টি মামলা আর গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৩৫ জন। একইভাবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রমনা বিভাগে মামলা হয়েছে ১৭টি, গ্রেপ্তার ৩৭ জন। লালবাগ বিভাগে মামলা হয়েছে ৫টি, গ্রেপ্তার ৭ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৮টি, গ্রেপ্তার ৯৮ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ২৫, গ্রেপ্তার ৩৬ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৪, গ্রেপ্তার ১৩৮।

মিরপুর বিভাগে মামলা ১৬, গ্রেপ্তার ৪০ জন। গুলশান বিভাগে মামলা ২০, গ্রেপ্তার ৩১ এবং উত্তরা বিভাগে ১৭ মামলা, গ্রেপ্তার ১৫ জন। সবমিলিয়ে ১৭২টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৪০২ জন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনায় মামলা করেন না ভুক্তভোগীরা। গুরুতর আহত বা বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে মামলা হয় না। মামলা দিয়ে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানান, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা গ্রহণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ছিনতাইয়ের সময় তারা শুধু সম্পদ লুটেই ক্ষান্ত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে হত্যা বা গুরুতর আহতও করে। তাই ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংগঠিত গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

অন্যথায় শুধু মাঠ পর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বাস্তব অপরাধকে যথাযথভাবে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।