সিলেট বিভাগে হাম এবং হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী প্রকাশ পাওয়া এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনায় গোটা অঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিন শিশুর প্রাণহানির পর বিভাগজুড়ে মোট মৃত্যু ১৫১ জনে পৌঁছেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলাতেই ১১৮ জনের বাস, যেখানে প্রতি জেলায় ৫৯ জন করে শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জে ২০ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৩ জন শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। বিভাগের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে এখন রোগীদের ঠাঁই দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৩৫৬ জন রোগীর মধ্যে কেবল এ দুই হাসপাতালেই ২৫০ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী হওয়ায় একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আর সংকটজনক শিশুদের জন্য পেডিয়াট্রিক আইসিইউ শয্যার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূল টিকাদান কর্মসূচির বড় ধরনের ঘাটতিই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। বিশেষ করে সিলেটের দূরবর্তী হাওর এবং চা-বাগান এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত এমআর টিকার আওতা থেকে বাদ পড়ে গেছে।
এ ছাড়া চিকিৎসকেরা লক্ষ করছেন, ৯ মাসের কম বয়সী অনেক শিশুই আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করছে, যা মূলত তাদের মায়েদের মাধ্যমে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার সংকেত দেয়। করোনা-উত্তর সময়ে মাঠপর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে টিকাদানের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়াও এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে বিশেষ টিকাদান দল। হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন বেডের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষক দল ইতোমধ্যে সিলেটের সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনে এসে চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিটি শিশুর কাছে দ্রুততম সময়ে টিকা না পৌঁছাতে পারলে সামনে সংক্রমণের তীব্রতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
২৪ ঘণ্টায় হাম-উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু, আক্রান্ত ৯৪৩ এদিকে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৩ জন। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৬৩।
এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে দুজন এবং খুলনা বিভাগে একজন মারা গেছে। এ সময় ৫৭ জনের দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। এতে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮ হাজার ৮৫৩ জনে। একই সময়ে আরও ৮৮৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এতে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৮ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।


















