দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জ্বালানি খাত। জ্বালানি শুধু অর্থনীতির একটি খাত নয়, এটি জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও জনজীবনে মারাত্মক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। জ¦ালানি গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প-কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সঙ্গে জ¦ালানি তেলের প্রাপ্যতার ঘাটতি চরমভাবে ভোগাচ্ছে দেশের শিল্প খাতকে। এর ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সক্ষমতা কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় জ¦ালানির দাম বাড়ছে এবং তেল ও পণ্য পরিবহন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ¦ালানির দাম বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে। ফলে জ¦ালানির পাশাপাশি কাঁচামালের দাম হু হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এখনো জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
তার উপর তীব্র লোডশেডিং সংকট আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের চলমান জ¦ালানি সংকট হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার ফল। ফ্যাসিবাদী আমলের দুর্নীতিÑ অনিয়মের খেসারত গুনছে দেশ। বাসাবাড়িতে চুলা জ¦লছে না, ফ্যান ঘুরছে না। গাড়ির চাকা ঘুরছে না। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। কৃষি কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিল্পের চাকা।
ইতোমধ্যে বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারের তালিকা বড় হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর ছোট বড় সব কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ী শিল্পপতি এবং শ্রমিকদের মধ্যে হাহাকার চলছে। যার ফলে রপ্তানিমুখী সব রখম শিল্পের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়ে পড়ছে। গত ১ সপ্তাহে বন্ধ হয়ে গেছে ৩০০ অধিক কারখানা। জ¦ালানি সংকটে শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ায় গত আট মাসে ৬২ হাজার লোক চাকরি হারিয়েছে।
দেশের প্রাথমিক জ¦ালানি চাহিদার বড় একটি অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। একই সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। বাড়তি চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সম্প্রতি মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ¦ালানি পাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। জ¦ালানি সংকট এখন আর একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পড়ছে জীবন ও অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে।
সামগ্রিকভাবে জ¦ালানি সংকট ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে আরও বেহাল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে। সম্প্রতি জ¦ালানি সংকট উৎপাদন সেক্টরে সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রয়োজনীয় জ¦ালানি গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার অধিকাংশ ইউনিট ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে গেছে।
বর্তমান সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলে শুধু কর্মসংস্থান না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করবে। সাম্প্রতিক যুদ্ধপরিস্থিতি, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দিয়ে বর্তমান সংকটের পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বর্তমান জ¦ালানি সংকটের রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দুর্নীতি, বিদেশি চাপ, দেশীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে অনাগ্রহতা, আমদানি-নির্ভরতা এবং জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি কারণে বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রয়োজনের সময় তা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অতি ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা জমে আছে। জ¦ালানি আমদানি ব্যয় সংকট, ভর্তুকি ও মূল্য সমন্বয়ের চাপ-সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে একযোগে চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিকটিও গভীর।
তাই পুরো জ¦ালানি ব্যবস্থার আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাতে মানুষের ঘুমে বেঘাত ঘটছে। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় মানুষের সময়, আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থনীতিÑ সর্বক্ষেত্রেই লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে।
বর্তমানে দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার মেঘাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেঘাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ১২ হাজার মেঘাওয়াটে নেমে আসার ঘটনাও ঘটেছে। পল্লীবিদ্যুৎ নির্ভর এলাকার পরিস্থিতি আরও কঠিন, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বিগত আওয়ামিলীগ সরকারের সময়ে বেসরকারি খাতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হলেও এসব কেন্দ্র চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি জ¦ালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি।
একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস, কয়লা অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে উৎপাদন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জ¦ালানি খাতের বিকল্প উৎস তৈরির উদ্যোগও প্রত্যাশিত গতি পায়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ¦ালানি নিরাপত্তা বাড়েনি। বরং এলএনজি ও অন্যান্য আমদানি করা জ¦ালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিগত হাসিনা সরকারের সময়ে দেশীয় মজুত খনি থেকে গ্যাস অনুসন্ধান না করেই দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকার ঘোষণা দেয়।
অথচ ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলন করে দেশের চাহিদা মোকাবিলা করে বিদেশেও রপ্তানি করছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছেÑ ভারত আমাদের সমুদ্র হতে গোপনে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস চুরি করে তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা কর্মসংস্থানসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবকিছু মিলিয়ে জনজীবনে এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা। দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রয়োজন অনুযায়ী তেল-গ্যাস আমদানি ও সরবরাহ বাড়ানো এবং কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির প্রসার, আধুনিক সঞ্চালনব্যবস্থা এবং কার্যকর বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
লোডশেডিং ও ও গ্যাস সংকট নিরসনে টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান সংকটের দ্রুত সমাধান, একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলেই কেবল এই দুর্বিষহ সংকট থেকে দেশকে বের করে আনা সম্ভব।
















