কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভান্ডার পূর্ণ হয়। অথচ সেই কৃষককেই ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ সার সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি লাইনে দাঁড়াতে হয়, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হয় কিংবা খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়, তাহলে কৃষি ব্যবস্থাপনার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
সরকার কৃষকের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করে, সরকারি গুদামে সার মজুত রাখে, ডিলারদের মাধ্যমে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যদি হয় সার আছে, কৃষক পাচ্ছেন না তাহলে সমস্যাটি শুধু সারের নয়; এটি ব্যবস্থাপনারও। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি এবং কৃষকের দুর্ভোগের অভিযোগ সামনে এসেছে।
কোথাও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ, কোথাও আবার পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের হাতে সার না পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে ৫০ কেজির এক বস্তা সারে ৪০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি দাম নেওয়া হলেও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। অথচ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দাবি, সেখানে চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ রয়েছে। একই সময়ে কিশোরগঞ্জে কোথাও ইউরিয়া কেজিতে ৮ টাকা বেশি, আর ডিএপি ও টিএসপি ৬-৮ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দোকানিরা সার নেই বললেও জেলা কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানিয়েছে।
প্রশ্ন তাই একটাই সরকারি বরাদ্দ ও মজুত থাকার পরও কৃষককে কেন বাড়তি দামে সার কিনতে হবে? সংকটটা কি সত্যিই সারের, নাকি সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থাতেই বড় কোনো গলদ রয়েছে? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকটের সময় কৃষককে অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়। জমিতে সার দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় পেরিয়ে গেলে শুধু সার না পাওয়ার ক্ষতি নয়, ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
ফলে কৃষকের হাতে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। প্রয়োজনের তাগিদে তাকে বেশি দামেই সার কিনতে হতে পারে। বাজারের এই দুর্বল অবস্থানই অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সরকারি গুদামে সার থাকে, তাহলে কৃষকের কাছে সেই সার পৌঁছায় না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। সরকার কত সার আমদানি করছে, কোন জেলায় কত বরাদ্দ দিচ্ছে, কোন ডিলার কত পাচ্ছেন, কখন গুদাম থেকে সার বের হচ্ছে, কত দামে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ধাপের তথ্য যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে মাঝপথে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যায়।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ভুরুঙ্গামারীতে একটি ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে বস্তা বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় ১০ হাজার কেজি সার নেওয়ার ঘটনা ঘটে এবং পরে ৩৩ জন কৃষক সার দিয়ে ফেরত দিয়েছেন; তাদের মধ্যে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও এসেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।
কেন কৃষকের মধ্যে এমন মরিয়া পরিস্থিতি তৈরি হলো? কেন একজন কৃষক মনে করলেন, সার পাওয়ার জন্য তাকে গুদামের দরজা ভাঙার পর্যায়ে যেতে হবে? অবশ্যই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতির পেছনে থাকা সংকটটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কৃষকের প্রয়োজন ও সরবরাহের মধ্যে যদি বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে।
সেই চাপ যদি সময়মতো প্রশাসনের নজরে না আসে, তাহলে সংকট আরও তীব্র হয়। তাই শুধু সংকটের পর অভিযান চালানো নয়, সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা দরকার। সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা। প্রতিটি জেলায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কোন উপজেলায় কত গেছে, কোন ডিলার কত পেয়েছেন এবং কত সার বিক্রি হয়েছে এসব তথ্য জনসম্মুখে থাকা উচিত।
কৃষক যেন নিজের মোবাইল ফোন থেকেই জানতে পারেন, তার এলাকার ডিলারের কাছে কত সার বরাদ্দ হয়েছে এবং সরকার নির্ধারিত দাম কত। এতে দুটি সুবিধা হবে। প্রথমত, কৃষক নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, ডিলার বা ব্যবসায়ীর পক্ষেও অনিয়ম করা কঠিন হবে। কারণ বরাদ্দ ও বিক্রির তথ্য যদি সবার সামনে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বা সার গোপন করে রাখার মতো ঘটনা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
শুধু তথ্য প্রকাশ করলেই অবশ্য সব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি। ডিলারশিপ দেওয়ার পর তার কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কোনো ডিলার সরকারি বরাদ্দের সার অন্যত্র পাচার করছেন কি-না, মজুত করছেন কি-না, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছেন কি-না এসব নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। কালোবাজারি বা মজুতদারির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবতে হবে।
কারণ শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দিলে অনেক সময় তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে না। অনিয়ম যদি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়, তাহলে শাস্তির ভয়ও কার্যকর থাকে না। প্রয়োজনে ডিলারশিপ বাতিল, লাইসেন্স স্থগিত এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সার যেন সময়মতো এবং নির্ধারিত দামে পাওয়া যায়।
কারণ ফসল উৎপাদনের সময়সূচি কোনো প্রশাসনিক ফাইলের মতো অপেক্ষা করে না। জমিতে সার দেওয়ার সময় চলে গেলে পরে সার পেলেও কৃষকের ক্ষতি পূরণ নাও হতে পারে। এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সার সংকট শুধু কৃষকের সমস্যা নয় বরং এটি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সমস্যায় পরিণত হয়। কৃষক যদি বেশি দামে সার কিনে বেশি খরচে উৎপাদন করেন, সেই ব্যয় ফসলের বাজারদরেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ সারের বাজারে অনিয়মের প্রভাব কৃষকের জমি পেরিয়ে ভোক্তার বাজার পর্যন্ত পৌঁছায়। সরকারের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত সারের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। শুধু ‘সার সংকট নেই’ বলা যথেষ্ট নয়। মাঠে গিয়ে দেখতে হবে কৃষক সার পাচ্ছেন কি-না। সরকারি গুদামে কত মজুত আছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ কৃষকের ঘরে যাওয়ার পথে সেই সার কোথায় আটকে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা, প্রশাসন, ডিলার ও কৃষক প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। কোনো এলাকায় চাহিদা বেশি হলে দ্রুত সেই তথ্য ওপরের পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে। বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই চাহিদা নিরূপণ করে সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক বেশি কার্যকর। কৃষককে শুধু উৎপাদনের দায়িত্ব দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না।
কৃষকের প্রয়োজনীয় বীজ, সার, সেচ ও অন্যান্য উপকরণ পাওয়ার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন কৃষক যখন জমিতে ফসল ফলান, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য উৎপাদন করেন না বরং তার উৎপাদনের সঙ্গে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও জড়িয়ে থাকে। তাই সারের সংকটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি কৃষকের আয়, উৎপাদন খরচ, খাদ্যের দাম এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারি ভর্তুকি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ সরকার যদি কৃষকের জন্য সার বরাদ্দ দেয়, ভর্তুকি দেয় এবং সরবরাহের ব্যবস্থা করে, তাহলে সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাবে না কেন? ‌ কৃষকের সারপ্রাপ্তি কোনো দয়া নয়, এটি তার উৎপাদনের প্রয়োজন এবং ন্যায্য অধিকার। তাই এখন শুধু সার সংকট নেই এমন আশ্বাস নয়; প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কৃষক নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত দামে, কোনো দালাল বা অতিরিক্ত অর্থের চাপ ছাড়াই প্রয়োজনীয় সার কিনে বাড়ি ফিরতে পারেন।
কারণ কৃষকের জমিতে সময়মতো সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি কৃষি উপকরণ পৌঁছানো নয় এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং কৃষকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
















