বিংশ শতাব্দীর বাঙালি মানসের পরম বিস্ময় এবং আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্যের সবচেয়ে উত্তাল তরঙ্গ কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ধূমকেতুর মতো, তবে তার প্রভাব ও উজ্জ্বলতা মহাকালের পাতায় চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে গেছে।
তার সৃষ্টির পরিধি ও প্রাচুর্য মাত্র তেইশ বছরের সাহিত্যিক জীবনে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। মূলত কবিতা ও গানের মাধ্যমেই তিনি কোটি বাঙালির হৃদয় জয় করেছিলেন, তবে সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তিনি নিজের স্বাক্ষর রাখেননি। তিনি কেবল শব্দ ও ছন্দের কারিগর ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যাচার, নিপীড়ন, ঔপনিবেশিক শাসন এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বজ্রকণ্ঠ।
তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদর্শন এবং শোষিত মানুষের প্রতি অগাধ প্রেম বাঙালির জাতীয় মানস গঠনে প্রধানতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আসছে। নজরুলের জীবনের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং অভাবাক্রান্ত পরিবেশে। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম, আর মা জাহেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শৈশবে বাবার অকালমৃত্যু নজরুলকে চরম আর্থিক অনটনের মুখে ঠেলে দেয়। মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে পরিবার প্রতিপালনের তাগিদে এবং নিজের বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে নেমে পড়তে হয় জীবন সংগ্রামে। ডাকনাম দুখু মিয়া যেন তার শৈশবের কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি ছিল।
এ সময় মক্তব থেকে নি¤œ মাধ্যমিক পাস করে তিনি সেই মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন, এবং একই সঙ্গে কাজ নেন মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের সেবক হিসেবে। শৈশবের এই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ তাকে ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গভীর পরিচয় ঘটিয়ে দেয়, যার ছায়া পরবর্তীতে তার অসংখ্য ইসলামি গজল ও কাব্যে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে।
তবে ধর্মীয় আচারের গ-িতে দুখু মিয়ার বাউন্ডুলে মন বেশিদিন আটকে থাকেনি। খুব দ্রুতই তিনি আকৃষ্ট হন লোকশিল্পের প্রতি এবং যোগ দেন রাঢ় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল ‘লেটো’তে। তার জ্যাঠা কাজী বজলে করিমের কাব্যপ্রতিভা এবং স্থানীয় কবিদের অনুপ্রেরণায় নজরুল লেটো দলের জন্য গান ও নাটক রচনা শুরু করেন। ‘চাষার সঙ’, ‘শকুনীবধ’, ‘রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ’, ‘দাতা কর্ণ’-এর মতো লোকনাটক ও গান রচনার মধ্য দিয়েই তার ভেতরের সাহিত্যিক সত্তার প্রাথমিক উন্মেষ ঘটে।
একদিকে মক্তব-মসজিদের খাঁটি ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এবং অন্যদিকে লেটো দলের লৌকিক ও উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক জীবনের মিশ্রণ নজরুলের পরবর্তী সাহিত্যকে অনন্য সর্বজনীন রূপ দান করেছিল। পরবর্তীতে তিনি আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন স্থানে সংগ্রামময় জীবন কাটানোর পর ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুল এবং রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে পড়াশোনা করেন।
কিন্তু ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রি-টেস্ট পরীক্ষা না দিয়েই তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, যা তার জীবনের গতিপথকে সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়। করাচি সেনানিবাসে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার হিসেবে নজরুলের প্রায় আড়াই বছরের সৈনিক জীবন ছিল মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের আসল ভিত্তিভূমি। সেনানিবাসের কঠোর শৃঙ্খলার মাঝে থেকেও তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন এবং দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের চর্চা জারি রাখেন।
করাচিতে বসেই তিনি কলকাতার প্রধান প্রধান সাহিত্য পত্রিকাগুলোর নিয়মিত পাঠক হন এবং নিজেই লিখতে শুরু করেন গল্প, কবিতা ও উপন্যাস। তার প্রথম গদ্য রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ এবং প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ এই সময়ই রচিত হয়। সৈনিক জীবনের ইতি টেনে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফিরে আসার পর নজরুল পূর্ণাঙ্গভাবে নিজেকে সঁপে দেন সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে।
৩২নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির কার্যালয়ে মুজফ্? ফর আহমদের সঙ্গে বসবাস শুরু করে তিনি তৎকালীন কলকাতার প্রভাবশালী সাহিত্যিক আড্ডা ও রাজনৈতিক পরিম-লে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নেন। সাংবাদিক হিসেবে নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে শেরে-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার মাধ্যমে। সেখানে তার ক্ষুরধার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কলাম পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করার মতো ঘটনার জন্ম দেয় এবং ব্রিটিশ সরকারের চোখে তাকে একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
তবে সাহিত্যিক হিসেবে নজরুলের জাতীয় খ্যাতি অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছায় ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে রচিত এবং ১৯২২-এ প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কাব্যধারায় নজিরবিহীন বিপ্লব এনেছিল। এতে তিনি অত্যাচারিত মানুষের ক্রন্দনরোল থামানোর জন্য এবং অন্যায়ের বিনাশ ঘটাতে নিজের চির-উন্নত শির নিয়ে বিশ্বকে স্পর্শ করার ঘোষণা দেন।
এই একটি কবিতাই তাকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিদ্রোহী কবির আসনে আসীন করে। একই সময় প্রকাশিত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর প্রলয়োল্লাস, কামাল পাশা ও শাত-ইল-আরব কবিতাগুলো ভারতীয় যুবসমাজকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। রাজনীতি ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে নজরুলের ভূমিকা কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন সরাসরি আন্দোলনের অগ্রগামী সৈনিক।
১৯২২ সালে তিনি প্রকাশ করেন অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’, যার জন্য বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশীর্বাদবাণী পাঠিয়েছিলেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’-র জন্য নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারে তার এক বছরের সশ্রম কারাদ- হয়।
চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে বিচারালয়ে নজরুল যে লিখিত জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ নামে কালজয়ী দলিল হিসেবে সংরক্ষিত আছে। কারাগারে থাকাকালেই রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন, যা নজরুলের বিপ্লবী সত্তার প্রতি বিশ্বকবির পরম শ্রদ্ধার নিদর্শন।
জেলে বন্দিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল ৩৯ দিনব্যাপী আমরণ অনশনও পালন করেছিলেন। নজরুলের ব্যক্তিসত্তা ও রাজনৈতিক দর্শন গড়ে উঠেছিল পূর্ণাঙ্গ সাম্যবাদী ভাবধারার ওপর। তিনি রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ভারতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ছড়ানোর কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি কেবল স্বরাজ অর্জনে নয়, বরং সর্বহারা ও কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব।
তার ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করেন সাম্যবাদী ও সর্বহারা কবিতাসমূহ। নজরুলই একমাত্র বাঙালি কবি, যিনি কোনো প্রকার সামাজিক বা ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে স্থান না দিয়ে উচ্চকণ্ঠে নারী ও পুরুষের সমতার জয়গান গেয়েছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি যেমন চমৎকার ইসলামি গজল ও হামদ-নাত রচনা করে মুসলিম মননকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি অসংখ্য ভক্তিপূর্ণ শ্যামাসংগীত ও কীর্তন রচনা করে হিন্দু ঐতিহ্যকে আপন করে নিয়েছেন।
নজরুল স্বয়ং তার শেষ ভাষণে বলেছিলেন, তিনি হিন্দু ও মুসলিমকে এক জায়গায় এনে গালাগালিকে গলাগলিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনে নজরুল ছিলেন গভীর প্রেমিক ও দরদী পুরুষ। কুমিল্লায় বিরজাসুন্দরী দেবীর গৃহে পরিচয় সূত্রে তিনি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তৎকালীন সমাজে এই আন্তঃধর্মীয় বিবাহ ছিল বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
নজরুলের পরম সাম্যবাদী মানসিকতার প্রতিফলন পাওয়া যায় তার চার সন্তানের নামকরণেও। নামগুলো হলো- কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। জ্যেষ্ঠ পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যু নজরুলের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, যার করুণ সুর পরবর্তীকালে তার বিভিন্ন সৃষ্টিতে বেজে উঠেছে। পারিবারিক শত দারিদ্র্য ও আঘাতের মধ্যেও নজরুল তার সৃষ্টিশীলতা থামতে দেননি।
সংগীতের জগতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান বিশাল ও বিস্ময়কর অধ্যায়। তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত ও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। রেডিও, চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বাংলা গানের প্রতিটি ধারায় অভাবনীয় বিপ্লব ঘটান। ক্লাসিক্যাল বা শাস্ত্রীয় সংগীতকে তিনি জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
লুপ্তপ্রায় ভারতীয় রাগ-রাগিণী উদ্ধার করে ‘হারামণি’ ও ‘নবরাগমালিকা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি বহু নতুন সুরের জন্ম দেন। গজলের ক্ষেত্রে তার সৃষ্টি বাংলা গানকে নতুন উচ্চতা এনে দেয়। পাশাপাশি তিনি ছায়াছবি পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন এবং বহু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা ও কাহিনি রচনার কাজও দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করেছেন।
‘ধূপছায়া’, ‘ধ্রুব’, ‘পাতালপুরী’, ‘গোরা’ ও ‘সাপুড়ে’-র মতো চলচ্চিত্রগুলোতে তার অবদান সংগীত ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয়। নজরুল যখন তার সৃষ্টির সেরা সময়ে এবং সুগঠিত দেহ ও প্রাণখোলা হাসির মাধ্যমে সবাইকে আপ্লুত করে রাখছেন, ঠিক তখনই ঘাতক ব্যাধি তার ওপর থাবা বসায়।
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি মারাত্মক ¯œায়বিক অসুস্থতায় (পিকস্ ডিজিজ) আক্রান্ত হন। আকস্মিকভাবে তিনি তার বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। যে কবির কণ্ঠে উদাত্ত আহ্বান ফুটত, সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯৪২ সালের পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছর কবিকে সম্পূর্ণ নীরব ও সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করুণ জীবনযাপন করতে হয়।
দেশ-বিদেশের চিকিৎসা সত্ত্বেও তার সেই মানস-আঘাত ও শারীরিক জটিলতা থেকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে ও ভারত সরকারের সম্মতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলকে সপরিবারে কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ঢাকাতেই কবির জীবনের শেষ চার বছর অতিবাহিত হয়।
তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং ১৯৭৬ সালে সরকারি আদেশের মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছরে কবিকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তার আগেই ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রিতে ভূষিত করেছিল। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট ঢাকায় পিজি হাসপাতালে এই মহান কবি চিরবিদায় নেন।
তার বিখ্যাত একটি গানের বাণী ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই/যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’Ñঅনুসারে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। দেশের সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ তার জানাজায় শরিক হয়ে এই মহান আত্মাকে শেষ বিদায় জানায়। নজরুলের প্রয়াণে বাংলাদেশে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয় এবং ভারতের আইনসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
তার রচিত কালজয়ী চরণ ‘চল্? চল্? চল্? , ঊর্ধগগনে বাজে মাদল’ বর্তমানে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিংশ শতাব্দীর একজন কবি বা সংগীতজ্ঞ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। শোষিত মানুষের মুখে ভাষা ফুটিয়ে তোলা, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গাওয়া এবং ধর্মান্ধতার দেয়াল গুঁড়িয়ে সাম্যের পতাকা ওড়ানোর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
তার মানবিক আবেদন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে তীব্র স্লোগান তিনি তুলেছিলেন, তা আজ এক শতাব্দী পরেও সমান উদ্দীপক ও প্রাসঙ্গিক। আসানসোলের এক দরিদ্র দুখু মিয়া থেকে শুরু করে উপমহাদেশের মহাবিদ্রোহী কবি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ যাত্রা নজরুল অতিক্রম করেছেন, তা বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।











