পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারার খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে গত ৩০ বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েক শত কৃষক। নিজেদের অর্থায়নে ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে তৈরি করা একটি জীর্ণ ভাসমান সেতুই বর্তমানে তাঁদের যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা।
পাখিমারার খালটি প্রায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত। খালটি পেরিয়েই সবজির জন্য পরিচিত কুমিরমারা, নেয়ামতপুর ও এলেমপুর গ্রামের কৃষকদের পাখিমারার পাইকারি বাজারে যেতে হয়। বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তায় হাঁটুসমান কাদা জমে যাওয়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। তখন অনেক কৃষককে নৌকায় করে কৃষিপণ্য পরিবহন করতে হয়। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এসব গ্রামে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নের এসব গ্রাম থেকে উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ সবজির চাহিদা পূরণ করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান। উৎপাদিত সবজির একটি বড় অংশ প্রতিদিন বাস, ট্রাক ও পিকআপে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘ তিন দশক ধরে তারা একটি স্থায়ী ব্রিজ ও পাকা সড়কের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু আজও সেই দাবি বাস্তবায়ন হয়নি।
ফলে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে গিয়ে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। অনেক সময় যোগাযোগ সমস্যার কারণে উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হয়ে যায় বলেও জানান তারা। স্থানীয় কৃষক আব্দুল আজিজ হাওলাদার বলেন, পাখিমারার খাল পারাপারের জন্য কৃষকরাই নিজেদের অর্থায়নে ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে ভাসমান সেতু তৈরি করেছেন। কয়েক দফায় নিজেদের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন জিও-এনজিওর সহায়তায় এটি মেরামত করা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে সেতুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কুমিরমারার প্রবীণ কৃষক সুলতান গাজী জানান, তিনি প্রায় ৪০–৪৫ বছর ধরে সবজি চাষ করছেন। কুমিরমারাসহ আশপাশের তিনটি গ্রামের প্রায় সাড়ে পাঁচশ কৃষক প্রতিবছর কমপক্ষে ২০–২৫ কোটি টাকার সবজিসহ কৃষিপণ্য পাখিমারার আড়তে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৬ সালে আরপাঙ্গাশিয়া নদীর ওপর চাকামইয়া এলাকায় ভেঙে পড়া একটি আয়রন ব্রিজের কিছু মালামাল এনে পাখিমারার খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল।
তবে নির্মাণের দুই বছরের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময় ভালো খুঁটি ও স্লিপার বিক্রি করে নিম্নমানের ও অকেজো মালামাল ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে সেই আয়রন ব্রিজের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে। এর পরিবর্তে কৃষকদের নিজেদের অর্থায়নে তৈরি ভাসমান ড্রাম সেতুটিই তাদের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন—যে এলাকার কৃষকরা প্রতিবছর ২০–২৫ কোটি টাকার কৃষিপণ্য সরবরাহ করছেন, তাদের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন? কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পাখিমারার খালের ওপর একটি স্থায়ী গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট কাঁচা সড়কগুলো পাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, ব্রিজটি নির্মাণ হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে পণ্য বাজারজাত করার আরও সুযোগ পাবেন। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান জানান, পাখিমারার খালের ওপর একটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এটি বাস্তবায়ন করবে।
নীলগঞ্জের সবজি চাষীদের দুর্ভোগ কমানো এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে সুবিধা সৃষ্টি করতেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, কুমিরমারাসহ আশপাশের এলাকার কৃষকদের কৃষিপণ্য পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে পাখিমারার খালের ওপর ৪৯০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্রিজটির ডিজাইন প্রক্রিয়া শেষের পথে এবং নেভিগেশন ছাড়পত্রও নেওয়া হয়েছে।
এখন একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


















