বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতকে যে ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গেছে, তা থেকে বের হতে পারছে না বিপুল ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারও। স্বাস্থ্য খাতে একদিকে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়ে চরম স্থবিরতা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কার্যক্রমে বরাদ্দ থাকলেও এর কোনো টাকাই খরচ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দুই বিভাগ। ফলে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতাল নির্মাণ, যন্ত্রপাতি কেনা, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। এর থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ধরে এগোনোর আহ্বান জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, এর থেকে বেরিয়ে আসতে এখনই একটি গতিশীল সুষ্ঠু পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
নইলে এই সরকারকেও ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হতে হবে। নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু বিশাল এই বরাদ্দের বিপরীতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র উদ্বেগজনক; বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কার্যত শূন্যের কাছাকাছি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থছাড়, ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রকল্প অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ধীরগতির কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়নি বললেই চলে। রেকর্ড বরাদ্দ, কিন্তু বাস্তবায়নে স্থবিরতা চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়।
এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য ১৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য প্রায় ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য ৮ হাজার ২২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে; অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকলেও অর্থবছরের প্রথম মাসেই বাস্তবায়ন প্রশ্নে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ।
‘শূন্য ব্যয়’ কেন সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, নতুন অর্থবছরের এডিপি অনুমোদনের পর প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, অর্থ অবমুক্তি, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, টেন্ডার এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জুলাই মাসেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
একই সঙ্গে ৯ জুলাই এপিপি অনুমোদনসহ যথাসময়ে ক্রয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনাও জারি করা হয়। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এ থেকেই বোঝা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাসে বহু প্রকল্প এখনো ক্রয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়েই ছিল। তবে প্রশ্ন হলো, প্রতিবছরই যদি অর্থবছরের শুরুতে প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে কয়েক মাস চলে যায়, তাহলে বছরের শেষ দিকে গিয়ে বিপুল অর্থ দ্রুত ব্যয় করার প্রবণতা তৈরি হবে কি না।
তিনি বলেন, ‘এই সরকার দায়িত্ব নিয়েই হামের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। এখন আবার ডেঙ্গুর মৌসুম। এ ছাড়া আমরা দেখছি অনেক বড় বড় অবকাঠামো অবহেলায় পড়ে আছে। জনবল নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ওই জনবল কোথায় কীভাবে নিয়োগ করা হবে, এর কোনো পরিকল্পনা নেই কারও কাছে। তাহলে অগ্রগতি কতদূর হবে আসলে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার বিষয় রয়েছে। ’ বছরের শেষে তড়িঘড়ি ব্যয়ের আশঙ্কা এমন পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বছরের প্রথমার্ধে ধীরগতি এবং শেষ কয়েক মাসে ব্যয়ের চাপ নতুন কোনো ঘটনা নয়।
স্বাস্থ্য খাতেও এর নজির রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা। ফলে অব্যবহৃত থেকে যায় প্রায় ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন হারও ছিল মাত্র ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ; অর্থাৎ গত অর্থবছরের দুর্বল বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নতুন অর্থবছরের শুরুতেও পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীর বাস্তবায়নের প্রভাব শুধু বাজেটের খরচের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং প্রতিষ্ঠান, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণ- সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জনগণের চিকিৎসাসেবা। গত অর্থবছরের হিসাবটি তাই বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হওয়া মানে পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় অংশই বাস্তবায়নের বাইরে থেকে গেছে। কাগজে প্রকল্প, মাঠে কাজ নেই স্বাস্থ্য খাতে একাধিক প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর উদ্দেশ্য হাসপাতাল নির্মাণ, পুরোনো হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা তৈরি করা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রকল্প তালিকায় নরসিংদী জেলা সদর হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ, মিরপুরে আধুনিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন এবং ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম মাসেই যদি এসব প্রকল্পে বাস্তব ব্যয় শুরু না হয়, তাহলে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে বলে মন্তব্য করেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে গতিশীল করতে পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলের আওতায় আনা উচিত। প্রয়োজনে সরকার এতে ভর্তুকি দেবে। এর তদারকির জন্য প্রয়োজনে নজরদারির জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্যবিমা করা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন। প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক সংস্থা ও দপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, নকশা অনুমোদন, জমিসংক্রান্ত জটিলতা, দরপত্র, ক্রয় অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন, অর্থছাড় এবং কাজের তদারকি- প্রতিটি ধাপেই সময় লাগে। এর সঙ্গে যোগ হয় প্রকল্প সংশোধন ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা। ফলে অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু না হলে বছরের শেষদিকে গিয়ে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। এতে একদিকে অর্থ ফেরত যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে দ্রুত ব্যয় দেখাতে গিয়ে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
অর্থবছরের শুরুতেই সতর্কতা চলতি অর্থবছরে অর্থ বিভাগও পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কিছু ব্যয় স্থগিত বা হ্রাস করার বিষয়ে ৮ জুলাই নোটিশ জারি করেছে। তবে স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রে কোন কোন প্রকল্প বা খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে, তা প্রকল্পভিত্তিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নিজস্ব নথিতেও চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রকাশ করেছে। ‘বরাদ্দ’ আর ‘ব্যয়’ এক নয় স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধিকে অনেক সময় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার বৃদ্ধির সূচক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণ যতই বাড়ানো হোক, প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে সেই অর্থ মানুষের চিকিৎসাসেবায় রূপান্তরিত হয় না।
এখানেই চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসের চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের অঙ্ক বড় হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের গতি যদি শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি থাকে, তাহলে কাগজে স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায় বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার্বিক এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ের বাস্তবায়ন।
স্বাস্থ্য খাতের আগের বছরের দুর্বল বাস্তবায়নের সঙ্গে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসের ধীরগতি যোগ হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কারণ চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে শুধু বরাদ্দই বাড়ানো হয়নি; একই সঙ্গে নতুন হাসপাতাল, জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণের মতো বড় বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রথম থেকেই প্রকল্পভিত্তিক সময়সূচি, ক্রয় পরিকল্পনা এবং মাসভিত্তিক ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ জরুরি। প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক জবাবদিহি স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের স্থবিরতা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা সাধারণত কয়েকটি বিষয়ে জোর দিয়ে থাকেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই, দ্রুত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, সময়মতো টেন্ডার, জমি ও নকশা জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি, নিয়মিত প্রকল্প মনিটরিং এবং মাসভিত্তিক ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শুধু কত টাকা খরচ হলো তা নয়, খরচের বিনিময়ে কতটুকু স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা তৈরি হলো সেটিও মূল্যায়ন করা। কারণ হাসপাতাল তৈরি হলো কিন্তু চালু হলো না, যন্ত্রপাতি কেনা হলো কিন্তু ব্যবহার হলো না, কিংবা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা চালু হলো না- এমন উন্নয়ন জনগণের জন্য প্রকৃত উন্নয়ন নয়।
তবে সরকার সব বাধা পেরিয়ে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্নীতিতে খাতটিতে যে স্থবির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, গত ছয় মাসে আমরা তার বেশির ভাগই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাকিটাও করতে পারব ইনশা আল্লাহ।




















