উন্নত ও সুস্থ জীবনের প্রত্যাশায় সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দুই বাসিন্দার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনদের হাসি-আনন্দের অপেক্ষা পরিণত হয়েছে গভীর শোক ও কান্নায়। শেষবারের মতো তাদের মুখটি দেখে নিজ ধর্মীয় রীতিতে বিদায় জানাতে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জোর আকুতি জানিয়েছেন স্বজনরা। নিহত দুজন হলেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের মৃত ইউনুচ সরদারের ছেলে ঘের ব্যবসায়ী আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫) এবং একই ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের শ্রমিক ভবেশ সরকারের স্ত্রী রেবতী সরকার (৩৬)।
স্বজনদের সূত্র জানায়, উন্নত চিকিৎসার জন্য ৫-৬ দিন আগে ভারতে যান আলিমুজ্জামান সাজু। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও যাবতীয় কাজ শেষ করে দেশে ফেরার উদ্দেশে কলকাতার ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১০-১২ দিন ধরে চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থান করছিলেন রেবতী সরকার। দুই সন্তানের জননী রেবতীর স্বামী পেশায় একজন শ্রমিক।
তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোররাত আনুমানিক ৩টার দিকে কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন ওই আবাসিক হোটেলের চতুর্থ তলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এতে শ্বাসরুদ্ধ ও তীব্র তাপে মারা যান তারা। টেলিভিশনে আগুন লাগার খবর দেখে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা ভারতে থাকা আত্মীয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন।
বুধবার গভীর রাতে রেবতী সরকারের পরিবারেও মৃত্যুর খবর পৌঁছায়। স্বজনদের এমন অকাল ও মর্মান্তিক প্রয়াণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন পুরো এলাকার মানুষ। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে বরেয়া গ্রামে নিহত আলিমুজ্জামান সাজুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের সাগরে ভাসছেন পরিবারের সদস্যরা। চোখের জল মুছতে মুছতে সাজুর বড় ভাই সাহেব সরদার বলেন, চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার কথা ছিল ওর।
খবর পেয়ে কলকাতায় আত্মীয়দের মাধ্যমে ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হই সাজু আর নেই। সরকারের কাছে একটাই আকুল আবেদন, মরদেহটা যেন দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা শেষবারের মতো ওকে দেখতে চাই। সাজুর শৈশবের বন্ধু রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, একসাথে বড় হয়েছি, পড়াশোনা করেছি। ডাক্তার দেখাতে গিয়ে বন্ধু এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, মানতে পারছি না।
অন্তত বন্ধুকে নিজ হাতে যেন শেষ বিদায় জানাতে পারি, এটাই চাওয়া। একই দিন তেঁতুলিয়া গ্রামে রেবতী সরকারের বাড়িতেও নেমে আসে নিস্তব্ধ শোক। মর্মান্তিক এই সংবাদ পেয়ে নিহত রেবতীর দুই সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ইতোমধ্যে ভারতে রওনা হয়েছেন। এ বিষয়ে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিনুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডে দুইজনের মৃত্যুর বিষয়টি তারা শুনেছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ আশ্বস্ত করে জানান, নিহতদের মরদেহ দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রাখছেন। জীবন বাঁচানোর আশায় ওপারে গিয়ে প্রিয়জনেরা লাশ হয়ে ফিরছেন— এই কঠিন বাস্তবতায় পুরো তারালী ইউনিয়নে এখন চলছে মাতম।
প্রিয়জনদের শেষবারের মতো একবার ছুঁয়ে দেখার প্রহর গুনছেন শোকার্ত স্বজনেরা।

















