বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার আলতাফনগরে অবস্থিত সরকারি শহিদ এম মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরি করছেন মো. ইব্রাহিম আলী খান। এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়োগকালীন শর্ত অনুযায়ী কাম্য যোগ্যতা ছিল না।
পাশাপাশি তার দাখিল করা মাস্টার্সের সনদও ভুয়া বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিদর্শন প্রতিবেদনেও সনদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এই প্রভাষকের উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ এত নিয়ম এবং সে সম্পর্কে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে নির্দেশনা থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বহাল তবিয়তেই চাকরি করে যাচ্ছেন প্রভাষক ইব্রাহিম।
দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে প্রভাষক মো. ইব্রাহিম আলীর নিয়োগ ও সনদসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গত ২২ জুলাই ‘দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ’ পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘এখনো বহাল ভুয়া সনদে প্রভাষক ইব্রাহিম আলী’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ডিআইএর সে সময়ের পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হয়ে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবেন বললেও অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
অন্যদিকে এবার প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খানের বিরুদ্ধে গভর্নিং বডির রেজল্যুশন রেজিস্টারে তার নিজ হাতের লেখা এবং সাংবাদিকের সামনে দেওয়া স্বীকারোক্তিতেই বেরিয়ে এসেছে নজিরবিহীন প্রতারণার চিত্র। এবার সেই জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে গিয়ে তিনি নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন তৈরির সময় গত ২২ জুলাই অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়ে প্রভাষক ইব্রাহিম দাবি করেছিলেন, তিনি প্রথম বা দ্বিতীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেননি; বরং পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিধিসম্মতভাবেই নিয়োগ পেয়েছেন।
তবে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের নিবিড় অনুসন্ধানে তার এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গভর্নিং বডির রেজল্যুশন রেজিস্টারের ওপর ভর করে ইব্রাহিম আলী নিজের নিয়োগকে ‘বৈধ’ প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু আসল থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে যখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে রেজল্যুশন খাতার ওই বিতর্কিত কার্যবিবরণী ইব্রাহিম আলীর নিজের হাতেই লেখা।
প্রতিবেদকের সমানে প্রভাষক ইব্রাহিম নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। নিজ নিয়োগ বৈধ করতে রেজল্যুশন জালিয়াতির এমন অভিনব ঘটনা স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে বিরল। প্রভাষকের এই স্বীকারোক্তির সময় উপস্থিত ছিলেন কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শহীদুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক সাইফুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক মো. শাজাহান আলী সরকার (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. রেজাউল করিম (রাজু)।
এদিকে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় সুশীল সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তবে সংবাদ প্রকাশের আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিআইএতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ওই সময় ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়। ডিআইএর সাবেক পরিচালক ওই সময় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।
তবে সংবাদ প্রকাশের পর এ বিষয়ে বিধি মোতাবেক তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। তবে সংবাদ প্রকাশের পর দীর্ঘদিন পার হলেও প্রভাষকের অনিয়ম ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে গত মাসের শেষ দিকে ডিআইএর এই সাবেক পরিচালককে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক পদে বদলি করা হয়।
এদিকে ডিআইএর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খানের কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে সাবেক ডিআইএর পরিচালকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি ডিআইএর পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রফেসর মো. আফলাতুন। গতকাল মঙ্গলবার ডিআইএর নবনিযুক্ত পরিচালককে সরকারি শহিদ এম মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খানের অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হয়।
পাশাপাশি ডিআইএ সূত্রের পরামর্শ অনুযায়ী এ-সংক্রান্ত অনিয়ম অবহিত করে তদন্তের জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়। নবনিযুক্ত পরিচালক প্রফেসর মো. আফলাতুন এ বিষয়ে নিয়মমাফিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমি এসে পুরোনো প্রায় ৫ হাজার ফাইল নামিয়েছি, যেগুলো নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। আপাতত অডিট বন্ধ রেখে এগুলো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করছি।
’ জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিআইএকে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে মন্তব্য করেন নবনিযুক্ত পরিচালক। পরবর্তীতে এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকেও অবহিত করা হয়। এদিকে ডিআইএর অডিট রিপোর্টে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার দীর্ঘ দুই দশক অতিক্রম হওয়া এবং নতুন করে রেজল্যুশন জালিয়াতির বিষয় সামনে আসার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহল।
অবিলম্বে জালিয়াতিতে জড়িত প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খানের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে বেতন-ভাতা হিসেবে অবৈধভাবে উত্তোলিত সমুদয় সরকারি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত সংবাদে বলা হয়েছিল, বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার আলতাফনগরে অবস্থিত সরকারি শহিদ এম. মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালে।
কলেজটি সরকারীকরণ করা হয় ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর। প্রতিষ্ঠার পর সরকারি-বেসরকারি হিসেবে ৩১ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে কলেজটি। এই কলেজের প্রভাষক মো. ইব্রাহিম আলী খানের বিরুদ্ধে নিয়োগকালীন মাস্টার্সে শর্ত অনুযায়ী কাম্য যোগ্যতা না থাকা এবং মাস্টার্সের ভুয়া সনদ দাখিলের তথ্য জানা গেছে। ডিআইএর পরিদর্শন প্রতিবেদনেও সনদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এই প্রভাষকের উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ডিআইএর আপত্তির বিষয়ে ব্রডশিট জবাবে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতির সুপারিশে অভিযুক্ত প্রভাষকের সনদের তারিখ ভুল ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন রয়েছে, নিয়োগের সময় থেকে সনদের তারিখ ভুল চিহ্নিত হওয়ার লম্বা সময়ে ওই প্রভাষকের নিয়োগ বৈধকরণসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ কোন সনদকে ভিত্তি করে হয়েছে?
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানপ্রধান ডিআইএর কাছে ব্রডশিট জবাবে প্রভাষক পদে নিয়োগে ‘মাস্টার্স পরীক্ষার্থীরাও’ আবেদন করতে পারবেন উল্লেখ করলেও ১৯৯৮ সালে কলেজের অর্গানাইজিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী, পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অর্থনীতি বিষয়ে প্রভাষক পদে কাম্য যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্সের কথা উল্লেখ ছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৫ জুলাই তৎকালীন কলেজের গভর্নিং বডির রেজল্যুশন অনুযায়ী একই বছরের ১৯ জুলাই স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে অর্থনীতি বিষয়েও প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অর্থনীতি বিষয়ে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি থাকার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।

















