নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্য ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, শুধু বাসে ওঠার পর নয়, বাসের জন্য অপেক্ষার সময় এবং বাস থেকে নামার সময়ও নারীদের জন্য নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাসে ওঠা-নামার সময় হয়রানি, অস্বস্তি কিংবা অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে আগ্রহ কমে যায়। তাই নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে মহিলা চালক ও মহিলা কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত শুধু নারী যাত্রীদের জন্য এই বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ রবিউল আলম বলেন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক করতে সরকার কাজ করছে।
ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বাসের ব্যবহার বাড়ানো হবে। ঢাকায় মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও ইভি বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও জানান, নারী যাত্রীদের জন্য ১০০টি পিংক কালারের ইলেকট্রিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি এবং পর্যায়ক্রমে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সেবা দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সীমিত পরিসরে এই পিংক বাস সার্ভিস চালু করেছে বিআরটিসি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস নিয়ে এ সেবা চালু হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে ২টি এবং বগুড়ায় ২টি বাস চলাচল করবে।
ঢাকায় ১০টি রুটে পরিচালিত ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিশেষ বাস সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি—সর্বমোট ১৩৪টি স্টপেজে নারী যাত্রীদের পরিবহন সেবা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি বলেন, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটিসির বিশেষ ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এ সার্ভিসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু নারী যাত্রীই নন, বাসের চালক ও কন্ডাক্টরও নারী। তিনি আরও বলেন, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এসব বাসে ই-টিকিটিং, সিসি ক্যামেরা এবং ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, সময়োপযোগী এ উদ্যোগের আওতায় আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি এবং ছয় মাসের মধ্যে ১০০টি ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বাস নারী যাত্রীদের জন্য পরিচালিত বিশেষ পিংক বাস সার্ভিসে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা হিসেবে বিআরটিসিকে আরও আধুনিক, যাত্রীবান্ধব ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস এবং ভবিষ্যতে সিটি সার্ভিসে ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্যে অর্থায়ন ও ঋণসহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহিলা বাস সার্ভিসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করেছে বিআরটিসি। সম্প্রতি বিআরটিসি ও ‘সহজ’ ডটকমের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত মহিলা বাস সার্ভিসে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে বাসে ওঠার আগে টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং যাত্রীদের অপেক্ষার সময় ও কাউন্টারনির্ভরতা কমবে। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি বাসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং একটি বাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি বাসে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি সব বাসে সম্প্রসারণ করা হবে।
মহিলা বাস সার্ভিসের রুটগুলো হলো ঢাকা মহানগর ১. নতুন বাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল ২. তালতলা-মতিঝিল ৩. ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও ৪. মিরপুর-১০-মতিঝিল ৫. মিরপুর-মতিঝিল ৬. মিরপুর-১২-মতিঝিল ৭. নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা ৮. মোহাম্মদপুর-মতিঝিল ৯. আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল ১০. গাজীপুর-বিমানবন্দর বগুড়া ১১. শেরপুর-মাটিডালি ১২. বনানী-মোকামতলা স্ট্যান্ড চট্টগ্রাম ১৩. কালুরঘাট-পতেঙ্গা বিআরটিসি সূত্রে জানা যায়, নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা ও রুট পর্যায়ক্রমে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন পারভীন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান, বিআরটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, মহিলা বাস সার্ভিসের যাত্রী ও সেবাগ্রহীতা এবং পরিবহন খাতের বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।



















