কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৬১ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে সরকারি নিরীক্ষায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তর একাধিক গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন, কাজের অস্তিত্বের যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই অর্থ পরিশোধ, একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল প্রদান, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ এবং প্রাক্কলনে অসঙ্গতির মাধ্যমে পৌরসভার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮)-এর বিধি ১২৭(২)(খ) অনুসরণ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অডিটের একটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, একটি আরসিসি ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পে অনুমোদন ছিল ৬৫ মিটার। কিন্তু বাস্তব যাচাইয়ে ৫৫ মিটার কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এরপরও ৬৫ মিটার কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়। এতে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৫ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। আরেকটি আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্লাব নির্মাণের নামে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮২৭ টাকা বিল উত্তোলন করা হলেও কোথায় কতটি স্লাব নির্মাণ হয়েছে, তার কোনো গ্রহণযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। কেবল সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নিরীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, পূর্বে নির্মিত সিসি সড়কের নিচে ফ্ল্যাট সলিং থাকা সত্ত্বেও নতুন আরসিসি কাজের প্রাক্কলনে পুনরায় একই সলিং অন্তর্ভুক্ত করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া একটি ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পে রড ব্যবহার না করেই আরসিসি নির্মাণ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাস্তব যাচাইয়ে রডের ব্যবহার না মিললেও প্রাক্কলনে এমএস বারসহ আরসিসি কাজ দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৬ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। আইইউআইটিপি প্রকল্পের কয়েকটি প্যাকেজেও নকশা অনুযায়ী ১৫০ মিলিমিটার পুরুত্বের আরসিসি থাকার কথা থাকলেও প্রাক্কলনে অতিরিক্ত পুরুত্ব দেখিয়ে বিল পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে। এতে পৌরসভার ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮১২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ এসেছে জরুরি মেরামত কাজ নিয়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুচরা ভাউচারের মাধ্যমে জরুরি মেরামতের কাজ সম্পন্ন করার পর একই ধরনের কাজের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে ৩১ লাখ ১০ হাজার ৯৯৪ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাসিক সভার অনুমোদনের আগেই প্রাক্কলন অনুমোদন এবং পরে তা প্রিন্ট করার ঘটনাও নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার মাহমুদুল হাসান মামুন এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অডিট আপত্তি উত্থাপন করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি অনেক আগের। বর্তমানে তিনি ওই দায়িত্বে নেই, তাই বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারবেন না। কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি স্বপন কুমার বর্মন বলেন, অডিট আপত্তি উত্থাপনের এক বছরের বেশি সময় পার হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিশোরগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর আইনজীবী শেখ মাসুদ ইকবাল বলেন, অডিট আপত্তির ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অডিট আপত্তির বিষয়টি অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। এটি শুধু আমার একার বিষয় নয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি আমাদের একজন কর্মকর্তা। অন্য একজন কর্মকর্তার বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’ এ বিষয়ে পৌর প্রশাসক জেবুন্নাহার শাম্মীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
11:16 pm, Wednesday, 29 July 2026
শিরোনাম :
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর নাম উল্লেখ
-
MIT ERP
- Update Time : 09:47:07 pm, Wednesday, 29 July 2026
- 2
Tag :


















