নাটোরের বাগাতিপাড়ায় কৃষকদের সেচসুবিধা নিশ্চিত করতে প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৩০০ একর জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু সংস্কারের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ড্রেনের প্রায় ৮ কিলোমিটারই অচল অবস্থায় পড়ে আছে। বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ১ কিলোমিটার। ফলে প্রকল্পের আওতায় সেচসুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ১৫০ বিঘা বা প্রায় ৫০ একর জমির কৃষকেরা। এতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সংস্কার করা প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অধিকাংশ কৃষক। পাশাপাশি বিকল্প পদ্ধতিতে সেচ দিতে গিয়ে তাদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেনের অধিকাংশই ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। কোথাও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা, কোথাও পড়ে আছে মাটির স্তূপ। আবার কোনো কোনো স্থানে ড্রেনের ভেতরে রাখা হয়েছে খড়ের গাদা। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ড্রেনগুলোর এমন বেহাল অবস্থা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংস্কারের পর মাত্র এক মৌসুম ড্রেন দিয়ে সেচের পানি সরবরাহ করা হয়েছিল।
এরপর থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে তিনটি ইউনিট। সেচের খরচের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে কৃষকের খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যদিকে প্রকল্পের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা।
অর্থাৎ প্রতি বিঘায় কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে আর্থিক চাপে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে ১৯৬৪-৬৫ অর্থবছরে উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় হালকা সেচ পাম্প প্রকল্পটি স্থাপন করা হয়। শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার ৩০০ একর জমিতে সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে প্রকল্পটি। অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করে কৃষকদের সেচসুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেনগুলো সংস্কার করা হয়। তবে সংস্কারের পরও প্রকল্পটির মাধ্যমে সেচসুবিধা পাওয়ার আওতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে বাড়েনি। বরং গত বছর যেখানে ২৫০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়েছিল, চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫০ বিঘায়।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সেচের আওতাধীন জমির পরিমাণ কমেছে ১০০ বিঘা। ড্রেনের অধিকাংশ অংশ ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। জামনগর ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৮৬ সালের পর প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর এ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়েছে।
এরপর প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর সেচ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কয়েক বছর আগে আবার ড্রেনগুলো সংস্কার করা হলেও কৃষকেরা নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের বিকল্প পদ্ধতিতে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের পাম্পের মাধ্যমে প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে খরচ হতো ১ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ বিকল্প পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
অনেক কৃষক বাড়িতে বোরিং স্থাপন করে সেখান থেকে জমিতে পানি দিচ্ছেন। অন্যদিকে ড্রেনগুলো বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একই ইউনিয়নের মুনসিপাড়া এলাকার কৃষক মুনছের আলী বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেন নির্মাণ করলেও তা কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না। প্রথম দিকে এক মৌসুম সেচ কার্যক্রম চালু ছিল।
এরপর থেকে ড্রেন দিয়ে আর পানি আসে না। সেচের পানি না পেয়ে অনেক কৃষক বিকল্প ফসল চাষ করছেন। আবার কেউ কেউ স্যালো মেশিনের সাহায্যে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, সেচ প্রকল্পের আশপাশের কিছু জমিতে পানি পাওয়া গেলেও তাদের এলাকার ড্রেনগুলোতে বহু বছর ধরে পানি আসে না। এ প্রকল্পের পানি তাঁদের এলাকায় পৌঁছালে কৃষকেরা কম খরচে জমিতে সেচ দিতে পারতেন।
বাঁশবাড়িয়া সেচ প্রকল্পের সভাপতি আফাজ উদ্দিন বলেন, গত বছর প্রকল্পের আওতায় ২৫০ বিঘা জমিতে চাষাবাদ হলেও এ বছর তা কমে ১৫০ বিঘায় দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে কৃষকেরা বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল থাকায় এ বছর সেচ প্রকল্পের আওতায় ধানের আবাদ কম হয়েছে। মুনসিপাড়াসহ ওই এলাকার কৃষকেরা প্রকল্পের পানি নিতে চান না। তারা পানি নিতে চাইলে সরবরাহ করা হবে।
কৃষকেরা পানি নিতে না আসায় ওই এলাকার ড্রেনগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ বিষয়ে নাটোর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত করিম বলেন, বড়াল নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানির প্রবাহ কমেছে। ফলে সেচের আওতা সংকুচিত হয়েছে। বড়াল নদী খনন করা হলে পানির প্রাপ্যতা বাড়বে। এরপর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সেচের আওতাধীন এলাকা বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা ড্রেনগুলো পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা সচল করা হোক। এতে প্রকল্পের সুফল আরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি তাদের উৎপাদন খরচও কমবে।





















