আজ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪১%

বেগম জিয়ার প্রতি কুয়েতের কূটনীতি ও আদালতের ঐতিহাসিক ইনসাফ

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:02:30 am, Tuesday, 29 September 2026
  • 23

বেগম জিয়ার প্রতি কুয়েতের কূটনীতি ও আদালতের ঐতিহাসিক ইনসাফ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সম্প্রতি জাতিসংঘে কুয়েতের স্থায়ী মিশনে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই সম্পর্ক আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল। এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে আমার সরাসরি যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স যখন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন বাংলাদেশের তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার কর্তৃক মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কুয়েতের দাপ্তরিক নথি সংগ্রহ ও সত্য তুলে ধরার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আমি সরাসরি তার সঙ্গে কাজ করেছি।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কুয়েতের নীতিগত অবস্থান, কূটনৈতিক সততা এবং সাম্প্রতিক বৈঠকের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এতে সেই সময় কীভাবে ক্রাউন প্রিন্সের নেতৃত্বে কুয়েতের গৌরবময় অবস্থান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আওয়ামী লীগ’-এর চক্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ খালাস ও তারেক রহমানকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়েছিল এর সার সংক্ষেপ তুলে ধরছি।

পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে যখন রাজনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে কূটনৈতিক বিচক্ষণতার মিশ্রণ ঘটে, তখন ইতিহাসের সাক্ষ্য দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আমরা যেভাবে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছি, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত (স্পেশাল এনভয়) হিসেবে আমি নিজে অত্যন্ত কাছ থেকে কুয়েতের আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক নথি প্রাপ্তি এবং এর পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য সুসংহত করার জন্য সরাসরি কাজ করেছি।

এর উদ্দেশ্য ছিল কুয়েত রাষ্ট্র, তার সরকার ও নেতৃত্বের অনন্য কূটনৈতিক সততা এবং নৈতিক অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা।

সম্পূর্ণ সত্যের ইতিহাস, যা আওয়ামী লীগ সরকার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির আড়ালে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, বিশেষ করে ১৯৯১ সালে, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সুদৃঢ় সম্পর্কের অংশ হিসেবে কুয়েতের তৎকালীন আমির মরহুম শেখ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ (আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন) শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি এতিমখানা নির্মাণের জন্য ১.২৫৫ মিলিয়ন (১২ লাখ ৫৫ হাজার) মার্কিন ডলার ব্যক্তিগত অনুদান ও উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন।

এই উদার কুয়েতি আমিরি অনুদানটি ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময়ে কুয়েতের মরহুম আমির শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি কুয়েতি কূটনীতির মূল ভিত্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছিলেন।

২০১২ থেকে ১৪ সালে সাজানো মামলা ও গভীর চক্রান্তের তীব্রতা এবং পর্দার আড়ালে আমাদের প্রচেষ্টা: বছরের পর বছর পার হওয়ার পর, ‘আওয়ামী লীগ’ শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আমাদের গর্ব ও আস্থার প্রতীক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে, যা ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলা নামে পরিচিত হয়।

তৎকালীন সরকার চতুরতার সঙ্গে ‘সৌদি ব্যাংক’-এর নামটি ব্যবহার করে জনমনে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, এই তহবিলের উৎস অজ্ঞাত অথবা এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা আত্মসাৎ করা হয়েছে! ২০১২ থেকে ১৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, যখন রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাজানো মামলার চক্রান্ত ও গভীর ষড়যন্ত্রের তীব্রতা চরম আকার ধারণ করে, তখন আমি নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা ও পর্দার আড়ালে নানা প্রচেষ্টা শুরু করি।

সেই সময়ে কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স। ঢাকাস্থ কুয়েত দূতাবাসের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মহামান্য আলী আহমাদ ইব্রাহিম আল-জাফেরি। বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে, আমি কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের কাছ থেকে অকাট্য দাপ্তরিক নথি ও আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র পাওয়ার জন্য কুয়েতি ভাইদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করি।

অত্যন্ত বিচক্ষণ নির্দেশনার আলোকে কুয়েতি কূটনীতি তার সততার অবস্থানে অবিচল থাকে এবং তারা সেই দাপ্তরিক নথিপত্র সরবরাহ করে, যা আইনিভাবে প্রমাণ করে যে এই অর্থ-সৌদি ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তরিত ১.২৫৫ মিলিয়ন ডলার-কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল-আহমাদের সরাসরি ও ব্যক্তিগত দাতব্য অনুদান ছিল। এটি বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় অর্থ ছিল না।

তৎকালীন কুয়েতি রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক মিশনের অবস্থান ও বক্তব্য কেমন ছিল? সেই কঠিন পরিস্থিতিতে কুয়েতি দূতাবাস স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সামনে কূটনৈতিক নীরবতা অবলম্বন করেনি।

রাষ্ট্রদূত আলী আল-জাফেরি দৃঢ় অবস্থান ও বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, যা তিনটি মূল স্তম্ভে সংক্ষেপ করা যায়: ১. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সততার স্বীকৃতি: রাষ্ট্রদূত তার আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, কুয়েতি অর্থ একটি সুনির্দিষ্ট দাতব্য উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল এবং আত্মসাতের যেকোনো দাবি খ-ন করা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নৈতিক দায়িত্ব।

২ . শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি আনুগত্য: রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কুয়েত শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অবস্থানকে কখনো ভুলবে না। এই আমিরি অনুদানটি ছিল তাদের মানবিক ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি কুয়েতের বিশেষ ও খাঁটি মূল্যায়নের বহির্প্রকাশ।

৩. ‘জাতীয় নেতা’ হিসেবে মূল্যায়ন: রাষ্ট্রদূত তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষ থেকে তাদের রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা হেয়প্রতিপন্ন করার সব অপচেষ্টাকে উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রতি সর্বদা গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। নিউইয়র্কে ঐতিহাসিক বৈঠক এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা: কুয়েতের এই অনন্য ও নীতিগত অবস্থান কোনো সাময়িক ঘটনা ছিল না।

বরং এটি ছিল পারস্পরিক বিশ্বস্ততার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কুয়েতি স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে, যেখানে কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এই ঐতিহাসিক বৈঠকে উভয় নেতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কুয়েতের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ঐতিহাসিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতাকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ভবিষ্যতের রূপরেখা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে আমি পূর্ণ আস্থা ও গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, কুয়েত রাষ্ট্রের প্রতি এই সুদৃঢ় আনুগত্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কৌশলগত ধারা আমাদের জাতীয় যাত্রার কান্ডারি ও বাংলাদেশের সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আরও বেগবান হবে।

এই অঙ্গীকারটি শহিদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত অনন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যা দুই দেশের ও জনগণের উচ্চতর স্বার্থ রক্ষায় এই ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ও মানবিক ঘোষণা। ন্যায়বিচারের বিজয় এবং পূর্ণ খালাস: যদিও পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকার ২০১৮ সালে কুয়েতের দাপ্তরিক নথিপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদ-ের রায় দিয়েছিল; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ও ন্যায়ের শক্তি সবসময়ই বিজয়ী হয়।

জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সেই স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেছেন এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সমস্ত অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে খালাস দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, এই পুরো মামলাটি ছিল একটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক মামলা’, যা কুয়েতি অনুদানের বৈধতা এবং আমাদের নেতৃত্বের সততাকে শতভাগ প্রমাণ করে।

এই সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হিসেবে এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে কুয়েতের দাপ্তরিক নথি প্রাপ্তি ও রাজনৈতিক বক্তব্য সুসংহত করার নিরলস কাজের সৌভাগ্য অর্জনকারী একজন মানুষ হিসেবে, আমি ভ্রাতৃপ্রতিম কুয়েত রাষ্ট্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

কুয়েত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে প্রমাণ করেছেÑ মরহুম শেখ জাবের আল-আহমাদ ও মরহুম শেখ সাবাহ আল-আহমাদের আমল থেকে শুরু করে কুয়েতের বর্তমান আমির মহামান্য শেখ মিশাল আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ এবং বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের বর্তমান যুগ পর্যন্ত-যে তাদের কূটনীতি কখনো আপস করে না এবং তাদের বিশ্বস্ত নেতাদের নীতিগত অবস্থান সবসময়ই বাংলাদেশ-কুয়েত সম্পর্কের ইতিহাসে এক একটি সম্মানের প্রতীক হয়ে থাকবে।

এই সাক্ষ্যের পরিশেষে, আমি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের প্রতি আমার গভীর ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি; এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মিশন সফল করতে এবং সত্যের মুখ উন্মোচন করতে তার নীতিগত অবস্থান, সদয় ও চূড়ান্ত সহযোগিতার জন্য। আল্লাহ কুয়েতকে রক্ষা করুন, তার বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ নেতাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এবং সর্বদা প্রত্যেক সত্যের অধিকারীকে বিজয়ী করুন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চাঁদপুরে অবৈধ কারেন্ট জালবিরোধী অভিযান: ৩টি নৌকা ও জাল জব্দ, ১১ জনের কারাদণ্ড

বেগম জিয়ার প্রতি কুয়েতের কূটনীতি ও আদালতের ঐতিহাসিক ইনসাফ

Update Time : 10:02:30 am, Tuesday, 29 September 2026

সম্প্রতি জাতিসংঘে কুয়েতের স্থায়ী মিশনে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই সম্পর্ক আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল। এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে আমার সরাসরি যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স যখন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন বাংলাদেশের তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার কর্তৃক মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কুয়েতের দাপ্তরিক নথি সংগ্রহ ও সত্য তুলে ধরার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আমি সরাসরি তার সঙ্গে কাজ করেছি।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কুয়েতের নীতিগত অবস্থান, কূটনৈতিক সততা এবং সাম্প্রতিক বৈঠকের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এতে সেই সময় কীভাবে ক্রাউন প্রিন্সের নেতৃত্বে কুয়েতের গৌরবময় অবস্থান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আওয়ামী লীগ’-এর চক্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ খালাস ও তারেক রহমানকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়েছিল এর সার সংক্ষেপ তুলে ধরছি।

পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে যখন রাজনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে কূটনৈতিক বিচক্ষণতার মিশ্রণ ঘটে, তখন ইতিহাসের সাক্ষ্য দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আমরা যেভাবে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছি, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত (স্পেশাল এনভয়) হিসেবে আমি নিজে অত্যন্ত কাছ থেকে কুয়েতের আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক নথি প্রাপ্তি এবং এর পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য সুসংহত করার জন্য সরাসরি কাজ করেছি।

এর উদ্দেশ্য ছিল কুয়েত রাষ্ট্র, তার সরকার ও নেতৃত্বের অনন্য কূটনৈতিক সততা এবং নৈতিক অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা।

সম্পূর্ণ সত্যের ইতিহাস, যা আওয়ামী লীগ সরকার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির আড়ালে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, বিশেষ করে ১৯৯১ সালে, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সুদৃঢ় সম্পর্কের অংশ হিসেবে কুয়েতের তৎকালীন আমির মরহুম শেখ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ (আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন) শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি এতিমখানা নির্মাণের জন্য ১.২৫৫ মিলিয়ন (১২ লাখ ৫৫ হাজার) মার্কিন ডলার ব্যক্তিগত অনুদান ও উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন।

এই উদার কুয়েতি আমিরি অনুদানটি ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময়ে কুয়েতের মরহুম আমির শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি কুয়েতি কূটনীতির মূল ভিত্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছিলেন।

২০১২ থেকে ১৪ সালে সাজানো মামলা ও গভীর চক্রান্তের তীব্রতা এবং পর্দার আড়ালে আমাদের প্রচেষ্টা: বছরের পর বছর পার হওয়ার পর, ‘আওয়ামী লীগ’ শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আমাদের গর্ব ও আস্থার প্রতীক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে, যা ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলা নামে পরিচিত হয়।

তৎকালীন সরকার চতুরতার সঙ্গে ‘সৌদি ব্যাংক’-এর নামটি ব্যবহার করে জনমনে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, এই তহবিলের উৎস অজ্ঞাত অথবা এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা আত্মসাৎ করা হয়েছে! ২০১২ থেকে ১৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, যখন রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাজানো মামলার চক্রান্ত ও গভীর ষড়যন্ত্রের তীব্রতা চরম আকার ধারণ করে, তখন আমি নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা ও পর্দার আড়ালে নানা প্রচেষ্টা শুরু করি।

সেই সময়ে কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স। ঢাকাস্থ কুয়েত দূতাবাসের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মহামান্য আলী আহমাদ ইব্রাহিম আল-জাফেরি। বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে, আমি কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের কাছ থেকে অকাট্য দাপ্তরিক নথি ও আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র পাওয়ার জন্য কুয়েতি ভাইদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করি।

অত্যন্ত বিচক্ষণ নির্দেশনার আলোকে কুয়েতি কূটনীতি তার সততার অবস্থানে অবিচল থাকে এবং তারা সেই দাপ্তরিক নথিপত্র সরবরাহ করে, যা আইনিভাবে প্রমাণ করে যে এই অর্থ-সৌদি ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তরিত ১.২৫৫ মিলিয়ন ডলার-কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল-আহমাদের সরাসরি ও ব্যক্তিগত দাতব্য অনুদান ছিল। এটি বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় অর্থ ছিল না।

তৎকালীন কুয়েতি রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক মিশনের অবস্থান ও বক্তব্য কেমন ছিল? সেই কঠিন পরিস্থিতিতে কুয়েতি দূতাবাস স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সামনে কূটনৈতিক নীরবতা অবলম্বন করেনি।

রাষ্ট্রদূত আলী আল-জাফেরি দৃঢ় অবস্থান ও বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, যা তিনটি মূল স্তম্ভে সংক্ষেপ করা যায়: ১. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সততার স্বীকৃতি: রাষ্ট্রদূত তার আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, কুয়েতি অর্থ একটি সুনির্দিষ্ট দাতব্য উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল এবং আত্মসাতের যেকোনো দাবি খ-ন করা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নৈতিক দায়িত্ব।

২ . শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি আনুগত্য: রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কুয়েত শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অবস্থানকে কখনো ভুলবে না। এই আমিরি অনুদানটি ছিল তাদের মানবিক ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি কুয়েতের বিশেষ ও খাঁটি মূল্যায়নের বহির্প্রকাশ।

৩. ‘জাতীয় নেতা’ হিসেবে মূল্যায়ন: রাষ্ট্রদূত তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষ থেকে তাদের রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা হেয়প্রতিপন্ন করার সব অপচেষ্টাকে উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রতি সর্বদা গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। নিউইয়র্কে ঐতিহাসিক বৈঠক এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা: কুয়েতের এই অনন্য ও নীতিগত অবস্থান কোনো সাময়িক ঘটনা ছিল না।

বরং এটি ছিল পারস্পরিক বিশ্বস্ততার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কুয়েতি স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে, যেখানে কুয়েতের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এই ঐতিহাসিক বৈঠকে উভয় নেতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কুয়েতের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ঐতিহাসিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতাকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ভবিষ্যতের রূপরেখা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে আমি পূর্ণ আস্থা ও গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, কুয়েত রাষ্ট্রের প্রতি এই সুদৃঢ় আনুগত্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কৌশলগত ধারা আমাদের জাতীয় যাত্রার কান্ডারি ও বাংলাদেশের সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আরও বেগবান হবে।

এই অঙ্গীকারটি শহিদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত অনন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যা দুই দেশের ও জনগণের উচ্চতর স্বার্থ রক্ষায় এই ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ও মানবিক ঘোষণা। ন্যায়বিচারের বিজয় এবং পূর্ণ খালাস: যদিও পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকার ২০১৮ সালে কুয়েতের দাপ্তরিক নথিপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদ-ের রায় দিয়েছিল; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ও ন্যায়ের শক্তি সবসময়ই বিজয়ী হয়।

জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সেই স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেছেন এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সমস্ত অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে খালাস দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, এই পুরো মামলাটি ছিল একটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক মামলা’, যা কুয়েতি অনুদানের বৈধতা এবং আমাদের নেতৃত্বের সততাকে শতভাগ প্রমাণ করে।

এই সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হিসেবে এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে কুয়েতের দাপ্তরিক নথি প্রাপ্তি ও রাজনৈতিক বক্তব্য সুসংহত করার নিরলস কাজের সৌভাগ্য অর্জনকারী একজন মানুষ হিসেবে, আমি ভ্রাতৃপ্রতিম কুয়েত রাষ্ট্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

কুয়েত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে প্রমাণ করেছেÑ মরহুম শেখ জাবের আল-আহমাদ ও মরহুম শেখ সাবাহ আল-আহমাদের আমল থেকে শুরু করে কুয়েতের বর্তমান আমির মহামান্য শেখ মিশাল আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ এবং বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের বর্তমান যুগ পর্যন্ত-যে তাদের কূটনীতি কখনো আপস করে না এবং তাদের বিশ্বস্ত নেতাদের নীতিগত অবস্থান সবসময়ই বাংলাদেশ-কুয়েত সম্পর্কের ইতিহাসে এক একটি সম্মানের প্রতীক হয়ে থাকবে।

এই সাক্ষ্যের পরিশেষে, আমি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স মহামান্য শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহের প্রতি আমার গভীর ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি; এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মিশন সফল করতে এবং সত্যের মুখ উন্মোচন করতে তার নীতিগত অবস্থান, সদয় ও চূড়ান্ত সহযোগিতার জন্য। আল্লাহ কুয়েতকে রক্ষা করুন, তার বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ নেতাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এবং সর্বদা প্রত্যেক সত্যের অধিকারীকে বিজয়ী করুন।