আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৫ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯২%

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ও আওয়ামী লীগের তৎপরতা: ডিসেম্বর ঘিরে বাড়ছে জল্পনা

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:38:09 pm, Thursday, 17 September 2026
  • 15

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ও আওয়ামী লীগের তৎপরতা: ডিসেম্বর ঘিরে বাড়ছে জল্পনা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আসন্ন ডিসেম্বর মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে—উত্তপ্ত নাকি স্বাভাবিক, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূলত ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ঝটিকা মিছিলের চেষ্টার কারণেই এই জল্পনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান সরকারও চায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন, আদালতের মুখোমুখি হন এবং বিচার প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলুক। তবে রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তিনি মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার জন্যই এমন ‘স্টান্টবাজি’ করে চলেছেন। এদিকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা কার্যত ভেস্তে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের কারণে।

অবশ্য প্রশ্ন উঠছে আরেক স্থানেও। শেখ হাসিনা যদি ফিরেই আসেন, তাহলে তার বিষয়ে ফয়সালা কোথায় হবে— আদালতে, নাকি রাজপথে? দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে, মানবতাবিরোধী অপরাধী শেখ হাসিনার ফয়সালা আদালতেই হবে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন ও চলমান। অন্যদিকে একটি পক্ষের মতে, হাসিনা ফিরলে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেক্ষেত্রে রাজপথই হয়ে উঠতে পারে তার বিষয়ে ফয়সালার ক্ষেত্র। কিন্তু এ বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে অধিকাংশ রাজনীতি বিশ্লেষকদের।

তাদের মতে, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সুযোগে জল ঘোলা করে তাতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করতে পারে কোনো বিশেষ মহল। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রমতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে আছে। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি হাইকমান্ডের নির্দেশে এখানে-ওখানে ঝটিকা মিছিল করছে। এ নিয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে নানা নির্দেশনা। পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কোনো মিছিল ঠেকাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসিনার ফেরা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে তিনি শুনেছেন।

তিনি চান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গণহত্যার দায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হোন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে খুন, গুম ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি ভিডিও কনফারেন্সে আসেননি, একটি অডিও রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ফিরে আসুন বা কনফারেন্সেই আসুন, তিনি ফেরারি আসামি।

একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। জুলাইয়ের আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি শেখ হাসিনা। সবাই চায়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি পথে হাঁটুন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের গ্রহণ করবে না। বিদেশে বসে আওয়ামী লীগ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

সরকার এসব বিষয়ে নজর রাখছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, ‘যাকে ধরে আনতে চাই… উনি বলছেন আসবেন। তো উনি আসুক, আমরা প্রস্তুত আছি এবং এটাও বলছি… আমরা তার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব। আইনগত যা যা, অবশ্যই গ্রেপ্তার হবেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওনার যা আইনগত অধিকার, উনি সেটা চর্চা করুন।

…আদালত যে রায় দেবেন, সে মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস— যা-ই হোক, সেটা মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। ’ আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যেতে পারে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া হতে পারে কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানেই তৈরি হবে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন।

আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কতটা বাড়বে? আর রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিসর কতটা সংকুচিত হবে? অতীত ইতিহাস বলে, সিদ্ধান্ত, পাল্টা সিদ্ধান্ত; কর্মসূচি, পাল্টা কর্মসূচি— এভাবেই ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে পরিস্থিতি। রাজনীতির ইতিহাসে বড় সংঘাত অনেক সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় ছোট একটি ঘটনা থেকে।

ডিসেম্বর ঘিরে তেমনটা হতে পারে কি না, তা বিশ্লেষণের বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, আদালত মানে হলো আইনি প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান। রাজনৈতিক বিরোধ যত কঠিনই হোক, তা যদি আদালত ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থাকে, তাহলে সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ থাকে। কিন্তু আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি যদি রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন দুই ধরনের সংঘাত একই সঙ্গে সামনে চলে আসতে পারে।

সেখানেই ঝুঁকি। কারণ আদালতে যুক্তি চলে, অন্যদিকে রাজপথে শক্তি। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ আসতে পারে। এক পক্ষের কর্মসূচির জবাবে আরেক পক্ষ মাঠে নামতে পারে। পরিস্থিতি তখন কেবল রাজনৈতিক থাকে না। ঢুকে পড়ে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা মাঝেমধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা মূলত রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল। দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান বয়স ও পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই এবং দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কি না— তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্লোগান ছাড়া আর কিছু নয়’ বলে মনে করেন তিনি। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইফুল আলমের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা ও কর্মজীবন ব্যাহত হয়। ভয় ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে। এখানে-ওখানে প্রাণহানি ঘটে।

তাই ডিসেম্বরের প্রশ্ন শুধু কে কত বড় সমাবেশ করতে পারবে, কে কাকে রুখতে বা ধরতে পারবে— তা নয়। আসল প্রশ্ন, রাজনৈতিক বিরোধের সীমা কোথায় গিয়ে থামবে। সরকারের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু তার প্রয়োগে যেন পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক না হয়ে ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

একই সঙ্গে বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সাইফুল আলম আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও পরীক্ষা কম নয়। রাজপথ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিন্তু রাজপথ যেন সংঘাতের স্থায়ী মঞ্চে পরিণত না হয়, সেটিও রাজনৈতিক দায়িত্ব। কর্মসূচি থাকবে। পাল্টা বক্তব্য থাকবে।

তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে। কিন্তু আইন ভাঙা, সহিংসতা কিংবা ভয় সৃষ্টি— এসব পরিস্থিতিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে আদালতের ভূমিকা এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি রাজনৈতিক আস্থা। বিরোধের নিষ্পত্তি যদি আদালতের পথে এগোয়, তাহলে সিদ্ধান্তের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকে। কিন্তু আদালতের প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই রাজপথে শক্তি পরীক্ষার চেষ্টা হলে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

তখন প্রশ্ন ওঠে, শেষ কথা বলবে কে? আইন-আদালত? নাকি রাজপথ? পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ডিসেম্বরের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর— সরকারের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি, আদালতের প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং সব পক্ষের রাজনৈতিক সংযম।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ট্যুরিস্ট ভিসা চালু: হিলি ইমিগ্রেশনে যাত্রী পারাপার বাড়ায় রাজস্ব আয়ে গতি

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ও আওয়ামী লীগের তৎপরতা: ডিসেম্বর ঘিরে বাড়ছে জল্পনা

Update Time : 11:38:09 pm, Thursday, 17 September 2026

আসন্ন ডিসেম্বর মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে—উত্তপ্ত নাকি স্বাভাবিক, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূলত ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ঝটিকা মিছিলের চেষ্টার কারণেই এই জল্পনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান সরকারও চায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন, আদালতের মুখোমুখি হন এবং বিচার প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলুক। তবে রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তিনি মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার জন্যই এমন ‘স্টান্টবাজি’ করে চলেছেন। এদিকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা কার্যত ভেস্তে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের কারণে।

অবশ্য প্রশ্ন উঠছে আরেক স্থানেও। শেখ হাসিনা যদি ফিরেই আসেন, তাহলে তার বিষয়ে ফয়সালা কোথায় হবে— আদালতে, নাকি রাজপথে? দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে, মানবতাবিরোধী অপরাধী শেখ হাসিনার ফয়সালা আদালতেই হবে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন ও চলমান। অন্যদিকে একটি পক্ষের মতে, হাসিনা ফিরলে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেক্ষেত্রে রাজপথই হয়ে উঠতে পারে তার বিষয়ে ফয়সালার ক্ষেত্র। কিন্তু এ বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে অধিকাংশ রাজনীতি বিশ্লেষকদের।

তাদের মতে, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সুযোগে জল ঘোলা করে তাতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করতে পারে কোনো বিশেষ মহল। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রমতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে আছে। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি হাইকমান্ডের নির্দেশে এখানে-ওখানে ঝটিকা মিছিল করছে। এ নিয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে নানা নির্দেশনা। পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কোনো মিছিল ঠেকাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসিনার ফেরা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে তিনি শুনেছেন।

তিনি চান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গণহত্যার দায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হোন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে খুন, গুম ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি ভিডিও কনফারেন্সে আসেননি, একটি অডিও রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ফিরে আসুন বা কনফারেন্সেই আসুন, তিনি ফেরারি আসামি।

একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। জুলাইয়ের আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি শেখ হাসিনা। সবাই চায়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি পথে হাঁটুন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের গ্রহণ করবে না। বিদেশে বসে আওয়ামী লীগ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

সরকার এসব বিষয়ে নজর রাখছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, ‘যাকে ধরে আনতে চাই… উনি বলছেন আসবেন। তো উনি আসুক, আমরা প্রস্তুত আছি এবং এটাও বলছি… আমরা তার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব। আইনগত যা যা, অবশ্যই গ্রেপ্তার হবেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওনার যা আইনগত অধিকার, উনি সেটা চর্চা করুন।

…আদালত যে রায় দেবেন, সে মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস— যা-ই হোক, সেটা মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। ’ আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যেতে পারে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া হতে পারে কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানেই তৈরি হবে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন।

আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কতটা বাড়বে? আর রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিসর কতটা সংকুচিত হবে? অতীত ইতিহাস বলে, সিদ্ধান্ত, পাল্টা সিদ্ধান্ত; কর্মসূচি, পাল্টা কর্মসূচি— এভাবেই ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে পরিস্থিতি। রাজনীতির ইতিহাসে বড় সংঘাত অনেক সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় ছোট একটি ঘটনা থেকে।

ডিসেম্বর ঘিরে তেমনটা হতে পারে কি না, তা বিশ্লেষণের বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, আদালত মানে হলো আইনি প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান। রাজনৈতিক বিরোধ যত কঠিনই হোক, তা যদি আদালত ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থাকে, তাহলে সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ থাকে। কিন্তু আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি যদি রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন দুই ধরনের সংঘাত একই সঙ্গে সামনে চলে আসতে পারে।

সেখানেই ঝুঁকি। কারণ আদালতে যুক্তি চলে, অন্যদিকে রাজপথে শক্তি। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ আসতে পারে। এক পক্ষের কর্মসূচির জবাবে আরেক পক্ষ মাঠে নামতে পারে। পরিস্থিতি তখন কেবল রাজনৈতিক থাকে না। ঢুকে পড়ে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা মাঝেমধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা মূলত রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল। দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান বয়স ও পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই এবং দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কি না— তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্লোগান ছাড়া আর কিছু নয়’ বলে মনে করেন তিনি। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইফুল আলমের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা ও কর্মজীবন ব্যাহত হয়। ভয় ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে। এখানে-ওখানে প্রাণহানি ঘটে।

তাই ডিসেম্বরের প্রশ্ন শুধু কে কত বড় সমাবেশ করতে পারবে, কে কাকে রুখতে বা ধরতে পারবে— তা নয়। আসল প্রশ্ন, রাজনৈতিক বিরোধের সীমা কোথায় গিয়ে থামবে। সরকারের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু তার প্রয়োগে যেন পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক না হয়ে ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

একই সঙ্গে বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সাইফুল আলম আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও পরীক্ষা কম নয়। রাজপথ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিন্তু রাজপথ যেন সংঘাতের স্থায়ী মঞ্চে পরিণত না হয়, সেটিও রাজনৈতিক দায়িত্ব। কর্মসূচি থাকবে। পাল্টা বক্তব্য থাকবে।

তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে। কিন্তু আইন ভাঙা, সহিংসতা কিংবা ভয় সৃষ্টি— এসব পরিস্থিতিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে আদালতের ভূমিকা এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি রাজনৈতিক আস্থা। বিরোধের নিষ্পত্তি যদি আদালতের পথে এগোয়, তাহলে সিদ্ধান্তের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকে। কিন্তু আদালতের প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই রাজপথে শক্তি পরীক্ষার চেষ্টা হলে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

তখন প্রশ্ন ওঠে, শেষ কথা বলবে কে? আইন-আদালত? নাকি রাজপথ? পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ডিসেম্বরের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর— সরকারের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি, আদালতের প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং সব পক্ষের রাজনৈতিক সংযম।