বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর আগের দিন অর্থাৎ বুধবার বিকেল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এরও আগের দিন গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশে গ্যাসের মোট সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এমন পরিস্থিতিতে আপাতত স্বস্তি এসেছে শিল্প খাতে। কিন্তু আবাসিকে এখনো সংকট রয়েই গেছে।
তাই দেশীয় কূপ খননে বিশেষ জোর চালাচ্ছে সরকার। মোট ১৫০টি কূপ খননের বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫০টির কাজ শুরু হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়াসহ দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নানান তৎপরতা চালানো হচ্ছে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে। গ্যাসের সংকটে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে দেশের শিল্প খাত। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে কারখানার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় উদ্বেগে ছিলেন ব্যবসায়ীরা।
এরই মধ্যে তিন দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বাড়ানো হয়েছে। এতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সরবরাহ বাড়ায় গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়ালেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রয়োজন দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো। স্থায়ী সমাধানে কূপ খননে ‘বিশেষ প্রোগ্রাম’ : গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান কূপ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা সম্প্রতি খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন। ১৫০টি কূপ খননের নানান পরিকল্পনার কথা জানান তিনি, যার মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দ্রুত গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান ও উৎপাদনে আনতেই কূপ খননে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন কূপ খনন করে উৎপাদনে আসতে সময় লাগলেও এতে করে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও বন্ধ কূপগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করে পুনরায় উৎপাদনে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নানা তৎপরতা : শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, কূপ খনন, সংস্কার ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান ও দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার বিকল্প নেই। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে হবে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগের সময় আমরা বহুবার বলেছি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে মনোযোগী হতে।
কিন্তু তারা সেটি না করে দিনে দিনে খাতটিকে আমদানিনির্ভর করে গেছে, যার খেসারত বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষজনকে। তাই জ্বালানির স্থায়ী সমাধানে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ প্রণোদনা : গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি বহুমুখী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা নিয়ে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে সহজ শর্তে ও স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়নের লক্ষ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিল্পে চ্যালেঞ্জ কমছে না : শিল্প খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। তিন দিনের ব্যবধানে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে সংকটের স্থায়ী সমাধান।
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ বেড়েছে। তবে গত দুই মাসের জ্বালানি সংকটের প্রকৃত প্রভাব এখনই বোঝা যাবে না। আগামী তিন থেকে চার মাস পর এর পূর্ণ অভিঘাত স্পষ্ট হতে পারে বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি।
তবে একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া যায় না। পাইপলাইনে থাকা অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়-দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে কারখানা বন্ধ করতে কয়েক মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের চেয়ে এখন গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। আর বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।
তবে জ্বালানি সংকটের এই অভিঘাত বোঝা যাবে আরও অন্তত তিন মাস পর। বিজিএমইএ সভাপতির ভাষ্য, গত দুই মাসে জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের জানামতে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে আগামী তিন থেকে চার মাস পর এ সংকটের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে। একই সঙ্গে ছয় মাস বা এক বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বা ব্যাবসায়িক সমস্যার কারণে এখন কোনো কারখানা বন্ধ হলে সেটিকে বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
শুধু এফএসআরইউ নয়, স্থলভিত্তিক স্টোরেজের দাবি : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের দাবি বিশেষজ্ঞদের। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শুধু এফএসআরইউ-নির্ভর না হয়ে স্থলভিত্তিক এলএনজি স্টোরেজ টার্মিনাল নির্মাণের ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার চুক্তি হয়েছে।
তবে এর বাইরে একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের পরিবর্তে স্থলভিত্তিক স্টোরেজ ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। তার মতে, তিন, চার বা পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপন করলেও গ্যাস বিতরণব্যবস্থা যথাযথ না থাকলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। তাই নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পাশাপাশি গ্যাস বিতরণলাইন ও অবকাঠামো উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পে সংকট কাটলেও আবাসিকে এখনো ভুগছেন গ্রাহকেরা : গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
কোথাও দিনের বেলা গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও অনেক এলাকায় এখনো চুলা জ্বলছে না। ফলে রান্নাবান্নায় ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা আখতার বলেন, আমাদের এখানে পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়নি কখনো। তবে দুপুরের দিকে গ্যাসের চাপ গত কয়েক দিন ধরেই খুব কম ছিল। আজ খুব ভালোভাবে গ্যাস পাচ্ছি। এদিকে, পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দার রহমত উল্লা বলেন, আগেও গ্যাস ছিল না।
পেপারে পড়লাম গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু আমাদের গ্যাস আসেনি। আগের মতোই বিদ্যুতের চুলায় রান্না করছি। এদিকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় শিল্প খাতে এর প্রভাব পড়লেও আবাসিক গ্রাহকদের পরিস্থিতিতে এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। কমেছে সিএনজি স্টেশনে ভোগান্তি : সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ভোগান্তি কমেছে বলে জানিয়েছেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব ফারহান নুর।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, আমাদের অবস্থা আগের তুলনায় একটু ভালো বলা যায়। এমন অনেক স্টেশন ছিল, যাতে গ্যাসই ছিল না, সেখানে আজ গ্যাস আসছে। তারা বিক্রি করছে। তবে গ্যাসের চাপ এখনো অনেক কম। ফলে ভোগান্তি একেবারে নেই তা বলা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি, বেড়েছে লোডশেডিং : গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
বরং গতকালের তুলনায় বুধবার বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার ১৮ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৫৮০ মেগাওয়াট। এতে করে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলোকে।
তবে পরিস্থিতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্নয়ন হবে বলে আশ্বস্ত করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা সংকট উত্তরণে বহুমুখী চেষ্টা করে যাচ্ছি। খুব দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করছি।


















