রাজধানীর আদাবরের একটি খালে গত ১২ সেপ্টেম্বর ভেসে ওঠে একটি স্কুলব্যাগ। ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে আসে এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ। শরীরের চারটি অংশ উদ্ধার হওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর পাওয়া যায় দুটি পা। কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পর কেন তার শরীর টুকরো টুকরো করা হলো— এর কোনো সঠিক উত্তর এখনো মেলেনি।
একই দিনে ফরিদপুরের মধুখালীতে মহাসড়কের পাশ থেকে তিনটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে পুলিশ। বস্তাগুলো খুলতেই বেরিয়ে আসে একটি মরদেহের ছয়টি বিচ্ছিন্ন অংশ। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুরে গার্মেন্টসকর্মী ডলি আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে প্রেমিক মিশন ইসলামের বিরুদ্ধে। হত্যার পর মরদেহ ট্রলি ব্যাগে ঢোকাতে না পেরে বঁটি ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে দুই টুকরো করা হয়।
পরে খণ্ডিত অংশ স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়। খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা শুধু সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। গত ৬ আগস্ট রাজধানীর মাদারটেক এলাকায় একটি কালভার্টের নিচ থেকে মাথা ও দুই হাতসহ সুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৭ মে মুগদার মান্ডা এলাকায় একটি ভবনের বেজমেন্ট থেকে পলিথিনে মোড়ানো মাথাবিহীন এক পুরুষের সাত টুকরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে অন্য স্থান থেকে মরদেহের আরো অংশ উদ্ধার হয়। নিহত ব্যক্তি সৌদিপ্রবাসী মোকাররম হোসেন। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী ভিন্ন হলেও ভয়ংকর মিল একটাই— হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করে গুমের চেষ্টা। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কেন হত্যার পর নৃশংসতার মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আজিজুল হক বলেন, এ ধরনের ঘটনার একটি বড় কারণ হত্যার পর ধরা পড়ার ভয়।
তার ভাষায়, অপরাধী মনে করে, মরদেহের পরিচয় ও অবস্থান আড়াল করতে পারলে তদন্ত থমকে যাবে। মরদেহ বহন কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক সময় ব্যাগ, স্যুটকেস বা বস্তায় করে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তা খণ্ডবিখণ্ড করা হয়। তার মতে, আরেকটি কারণ মনস্তাত্ত্বিক। চরম প্রতিহিংসা বা জিঘাংসার পাশাপাশি অপরাধ অনুকরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধের বিভিন্ন কনটেন্টে হত্যার পর মরদেহ গোপন করার দৃশ্য দেখা যায়।
আগে থেকেই সহিংস প্রবণতা থাকা অপরাধীর ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট অপরাধের পদ্ধতি অনুকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। অপরাধবিজ্ঞানে একে ‘কপিক্যাট ক্রাইম’ বলা হয়। তবে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করলেই আলামত মুছে যায় না বলে মনে করেন আজিজুল হক। তিনি বলেন, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, লোকেশন, সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, ডিএনএ এবং অন্যান্য ফরেনসিক আলামত মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে অপরাধের পূর্ণ চিত্র।
পুলিশের সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করলেই কাউকে ‘সাইকোপ্যাথ’ বলা ঠিক নয়। সাইকোপ্যাথি একটি নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল ধারণা, কোনো অপরাধের ধরন দেখে তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তার মতে, অপরাধীর ব্যক্তিত্ব, পূর্ব অপরাধের ইতিহাস, আচরণ, উদ্দেশ্য ও মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
সামাজিক বাস্তবতার দিকটিও তুলে ধরেন হাসান মাহমুদ। তার মতে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন, চরম অসহিষ্ণুতা, প্রতিশোধস্পৃহা, মাদক, অর্থনৈতিক চাপ, আইনি শিথিলতা, বিচারের ধীরগতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা সমাজে অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এসবের কোনো একটিকে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার সরাসরি কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, বড় সংকেতটি হচ্ছে, মানুষের জীবনের প্রতি মূল্যবোধ কতটা কমে গেলে একজন আরেকজনকে হত্যা করার পর তার মরদেহকেও সম্মান করার প্রয়োজন বোধ করে না। অপরাধবিষয়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল আলম বলেন, সব হত্যাকাণ্ডকে একইভাবে দেখা যাবে না। কোনো ঘটনায় সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, কোনো ঘটনায় অর্থনৈতিক স্বার্থ, আবার কোনো ঘটনায় প্রতিশোধ হত্যার কারণ হতে পারে।
তবে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার সিদ্ধান্তটি আলাদাভাবে আসে। তার মতে, ধরা পড়ার ভয়, আলামত নষ্ট করার চেষ্টা এবং মরদেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কপিক্যাট ক্রাইম হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে আরও তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করেন ব্যারিস্টার রফিকুল আলম। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সুলতানা কামালের মতে, নৈতিকতার অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা এবং অপরাধের পর অপরাধ ঢাকার প্রবণতা মানুষকে ভয়ংকর আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।
এসব ঘটনা ঠেকাতে শুধু গ্রেপ্তার বা কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, তদন্তের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, ফরেনসিক পরীক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, ডিএনএ ডাটাবেজ শক্তিশালী করতে হবে এবং অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অধ্যাপক সুলতানা কামাল আরও বলেন, অপরাধ দমনের বড় জায়গাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে, সমাজের ভেতরে।
তিনি বলেন, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীকে ধরতে পারে। আদালত শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু যে মানসিকতা একজন মানুষকে অন্য একজনের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শেখায়, সেটি তৈরি হওয়ার পর তাকে থামাতে পারে পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক পুলিশের পেশাদারিত্বের ঘাটতি এবং অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতাকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। এদিকে অপরাধের ধরন বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অপরাধীরা ধরাও পড়ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশকে অপরাধীদের চেয়ে সব সময় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। হত্যার পর মরদেহ গুমের এই প্রবণতা শুধু অপরাধের নৃশংসতা নয়, তদন্ত, বিচার ও সামাজিক মূল্যবোধ— তিন ক্ষেত্রেই বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি সহিংসতার পেছনে থাকা সামাজিক ও মানসিক কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।
তাহলেই হয়তো কমতে পারে এসব নৃশংসতা।



















