নেপাল-চীন সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে প্রাণহানি ১ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত নেপালের সরকারি হিসাবে দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিখোঁজ রয়েছেন সাড়ে ৩ হাজার ৯১৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে, তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। তাদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। দুই দেশের হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত দাঁড়িয়েছে এক হাজার তিনজন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৪৬২ জন।
নিখোঁজ বিদেশির সংখ্যা ৮৪৪। গত ২৬ আগস্ট নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ে। বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও বরফগলা পানি মুহূর্তের মধ্যে নিচের উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এতে ভোতেকোশীসহ আশপাশের নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, ভবন, সড়ক ও সেতু ভেসে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত হয় নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, কাভ্রে এবং কাঠমান্ডু উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। চীনের তিব্বতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরং সীমান্ত এলাকায়ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। এই মুহূর্তে উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান। নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর সুড়ঙ্গের মুখ এবং ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরক ব্যবহার করে নতুন পথ তৈরি করা হচ্ছে। পরে সেই পথে বাতাস প্রবেশ করিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
কিছু সুড়ঙ্গে নিরাপদ জায়গা থাকার তথ্য পাওয়ায় সেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের কেউ কেউ এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে আশা করছেন উদ্ধারকারীরা। তবে উদ্ধার অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ তত বাড়ছে। বন্যায় নিখোঁজদের স্বজনেরা এখনো শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করছেন। নিখোঁজ প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারির স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি জানান, তিনি চান তার স্বামীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হোক।
ভয়াবহ এই বন্যায় ৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস হয়েছে। বহু সড়ক কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছে। ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতে স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছে এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্যোগের পর এ পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৮১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বহু এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। সহায়তায় ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ : উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযানে নেপালকে সহায়তা করছে ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞ দল। চীনা উদ্ধারকারীরা জীবন শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করছেন। ভারতীয় দল নেপাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাসুয়ার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছে।
যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও ভারত ও চীন সহায়তা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর বিকল্প হিসেবে অস্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্র, পানি নিষ্কাশন পাম্প এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন বিপদের আশঙ্কা : উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে নেপালে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সৃষ্ট একটি হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় হ্রদটি উপচে পড়লে দেশটির বিভিন্ন নদীতে আবারও পানির চাপ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ত্রিশূলী নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে উদ্ধারকারীদের পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হচ্ছে।
















