আজ বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
বজ্রসহ বৃষ্টি
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৭%

ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর: আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে ৬ দফা দাবি

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:26:10 am, Wednesday, 26 August 2026
  • 15

ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর: আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে ৬ দফা দাবি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট রক্তাক্ত হয়েছিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী। দেশের সম্পদ রক্ষা এবং বহুজাতিক এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হন তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামের তিন তরুণ।

আহত হন ২ শতাধিক আন্দোলনকারী। সেই আন্দোলনের ২০ বছর আজ। প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ প্রদীপ সরকার দীর্ঘদিন ভুগে মারা যান। গুলিবিদ্ধ বাবলু রায় ও শ্রীমান বাস্কে নানা সংকটের মাঝে দিনযাপন করছেন। ফুলবাড়ী খনিতে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা বিএইচপির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়।

পরে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদি একটি অসম চুক্তি করে। প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, উত্তোলিত কয়লার মাত্র ছয় শতাংশ পাবে বাংলাদেশ, ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি। যার ৮০ শতাংশ এশিয়া এনার্জি রপ্তানি করবে। প্রস্তাবিত কয়লাখনি হলে পুরো ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে কৃষিতে প্রভাব পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে পরিবেশ।

এসব বিবেচনায় পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হন। গঠন করা হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। শুরু হয় আন্দোলন। দাবি ছিল, ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, ফুলবাড়ীতে কোনো উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি হবে না। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল-গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী অফিস ঘেরাও কর্মসূচি দেয়।

ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার নারী-পুরুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে পুলিশ ও বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ওই মিছিলে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই কলেজ ছাত্র তরিকুল, কর্মজীবী আমিন ও সালেকিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এতে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে পুরো খনি এলাকার মানুষ। শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধ।

৩০ আগস্ট ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি সই হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার চুক্তির আংশিক বাস্তবায়ন করে। চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে এখনও ফুলবাড়ী খনি অঞ্চলের মানুষ আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।

৬ দফা চুক্তির মধ্যে ছিল, এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী ও দেশ থেকে বহিষ্কার, উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি ফুলবাড়ীসহ দেশের কোথাও না করা, পুলিশ-বিডিআরের গুলিতে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা, গুলি বর্ষণসহ হতাহতের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন, শহীদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, এশিয়া এনার্জির দালালদের গ্রেপ্তারসহ শাস্তি প্রদান, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন করে মামলা না করা।

ছয় দফা চুক্তি করার পর আন্দোলনের সমাপ্তি হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২৬ আগস্ট দিনটিকে ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকছে। ২৬ আগস্টে নিহত-আহতদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ, শহীদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের অর্থ প্রদান, তখনকার সময়ে যে মামলাগুলো হয়েছিল তা প্রত্যাহার, সেদিন পুলিশ-বিডিআর যে বাড়ি-ঘরগুলো ভেঙে দিয়েছিল তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও এশিয়া এনার্জিকে এখন বহিস্কার করা হয়নি।

ফুলবাড়ী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সিপিবি’র ফুলবাড়ী শাখার সাধারণ সম্পাদক এসএম নূরুজ্জামান জামান বলেন, যেসব চুক্তি সে সময় বাস্তবায়ন হয়েছে তা সময়ের বিশেষ দাবি ছিল। কিন্তু আসল দাবিগুলোই অপূরণীয় আছে। উপরোক্ত এশিয়া এনার্জি তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এবং আন্দোলনকারীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবেও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পাচ্ছেন আশিক চৌধুরী

ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর: আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে ৬ দফা দাবি

Update Time : 10:26:10 am, Wednesday, 26 August 2026

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট রক্তাক্ত হয়েছিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী। দেশের সম্পদ রক্ষা এবং বহুজাতিক এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হন তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামের তিন তরুণ।

আহত হন ২ শতাধিক আন্দোলনকারী। সেই আন্দোলনের ২০ বছর আজ। প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ প্রদীপ সরকার দীর্ঘদিন ভুগে মারা যান। গুলিবিদ্ধ বাবলু রায় ও শ্রীমান বাস্কে নানা সংকটের মাঝে দিনযাপন করছেন। ফুলবাড়ী খনিতে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা বিএইচপির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়।

পরে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদি একটি অসম চুক্তি করে। প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, উত্তোলিত কয়লার মাত্র ছয় শতাংশ পাবে বাংলাদেশ, ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি। যার ৮০ শতাংশ এশিয়া এনার্জি রপ্তানি করবে। প্রস্তাবিত কয়লাখনি হলে পুরো ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে কৃষিতে প্রভাব পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে পরিবেশ।

এসব বিবেচনায় পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হন। গঠন করা হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। শুরু হয় আন্দোলন। দাবি ছিল, ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, ফুলবাড়ীতে কোনো উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি হবে না। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল-গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী অফিস ঘেরাও কর্মসূচি দেয়।

ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার নারী-পুরুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে পুলিশ ও বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ওই মিছিলে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই কলেজ ছাত্র তরিকুল, কর্মজীবী আমিন ও সালেকিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এতে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে পুরো খনি এলাকার মানুষ। শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধ।

৩০ আগস্ট ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি সই হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার চুক্তির আংশিক বাস্তবায়ন করে। চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে এখনও ফুলবাড়ী খনি অঞ্চলের মানুষ আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।

৬ দফা চুক্তির মধ্যে ছিল, এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী ও দেশ থেকে বহিষ্কার, উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি ফুলবাড়ীসহ দেশের কোথাও না করা, পুলিশ-বিডিআরের গুলিতে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা, গুলি বর্ষণসহ হতাহতের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন, শহীদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, এশিয়া এনার্জির দালালদের গ্রেপ্তারসহ শাস্তি প্রদান, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন করে মামলা না করা।

ছয় দফা চুক্তি করার পর আন্দোলনের সমাপ্তি হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২৬ আগস্ট দিনটিকে ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকছে। ২৬ আগস্টে নিহত-আহতদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ, শহীদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের অর্থ প্রদান, তখনকার সময়ে যে মামলাগুলো হয়েছিল তা প্রত্যাহার, সেদিন পুলিশ-বিডিআর যে বাড়ি-ঘরগুলো ভেঙে দিয়েছিল তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও এশিয়া এনার্জিকে এখন বহিস্কার করা হয়নি।

ফুলবাড়ী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সিপিবি’র ফুলবাড়ী শাখার সাধারণ সম্পাদক এসএম নূরুজ্জামান জামান বলেন, যেসব চুক্তি সে সময় বাস্তবায়ন হয়েছে তা সময়ের বিশেষ দাবি ছিল। কিন্তু আসল দাবিগুলোই অপূরণীয় আছে। উপরোক্ত এশিয়া এনার্জি তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এবং আন্দোলনকারীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছে।