9:55 pm, Wednesday, 29 July 2026

আট বছর নির্বাচনহীন চা-শ্রমিক ইউনিয়ন

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:06:19 pm, Wednesday, 29 July 2026
  • 6
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

টানা আট বছর ধরে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন না হওয়ায় দেশের চা-শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনের পর আর ভোটগ্রহণ হয়নি। ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই আট বছর ধরে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছে। এতে নেতৃত্বে জবাবদিহির অভাব, সাংগঠনিক স্থবিরতা এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা-বাগানে প্রায় ১ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। এসব ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথমে পঞ্চায়েত কমিটি এবং পরে ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন শ্রমিককল্যাণমূলক দাবি কার্যকরভাবে মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। শমশেরনগর চা-বাগানের শ্রমিক পূর্ণিমা র্যালি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় একই ব্যক্তিরা নেতৃত্বে রয়েছেন। শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।” শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুধীর রিকিয়াশন বলেন, “প্রায় আট বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর বহুবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।” চা-শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, “দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কথা বলার মতো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল রাখা হয়েছে। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।” বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, নির্বাচন বিলম্বের অন্যতম কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে জটিলতা। তার অভিযোগ, বর্তমান কমিটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে। তিনি সরকারের তত্ত্বাবধানে দ্রুত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্ব বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। নির্বাচন আয়োজন করে তারা চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, কিন্তু বছরের পর বছর নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।” বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, নির্বাচন বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থসংকট নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে। অতীতের মতো এবারও সরকারের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হবে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার নির্বাচন আয়োজনের ব্যয়ভার বহনের পরিবর্তে ইউনিয়নকে নিজস্ব অর্থে নির্বাচন করতে বলেছিল। সে সময় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নির্বাচনের জন্য ২৫ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শ্রম উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের আশ্বাস পাওয়া গেলেও জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে বিষয়টি আর এগোয়নি। সর্বশেষ শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চলতি বছরের জুলাই মাসে নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা রাণী ভৌমিক নামে একজন নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করায় নির্বাচন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। শ্রম অধিদপ্তর আদালতে জবাব দাখিল করেছে। মামলার নিষ্পত্তি হলে সরকারের সহযোগيتها নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, “এত বড় নির্বাচন প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া আয়োজন করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের ৯ সদস্যের মধ্যে তিনজন সরকারের প্রতিনিধি এবং ছয়জন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকেন।” এ বিষয়ে বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, শ্রীমঙ্গলের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে এবং বিষয়টি মন্ত্রী অবগত আছেন। তিনি জানান, আগের সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন করলেও তা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ হওয়ায় নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে আদালতের বিষয়টি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ অন্যান্য প্রস্তুতিও চলছে। হাইকোর্টের জটিলতা কেটে গেলেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

অস্তিত্ব সংকটে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ : রক্ষা করতে না পারলে বিপদ

আট বছর নির্বাচনহীন চা-শ্রমিক ইউনিয়ন

Update Time : 07:06:19 pm, Wednesday, 29 July 2026

টানা আট বছর ধরে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন না হওয়ায় দেশের চা-শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনের পর আর ভোটগ্রহণ হয়নি। ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই আট বছর ধরে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছে। এতে নেতৃত্বে জবাবদিহির অভাব, সাংগঠনিক স্থবিরতা এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা-বাগানে প্রায় ১ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। এসব ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথমে পঞ্চায়েত কমিটি এবং পরে ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন শ্রমিককল্যাণমূলক দাবি কার্যকরভাবে মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। শমশেরনগর চা-বাগানের শ্রমিক পূর্ণিমা র্যালি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় একই ব্যক্তিরা নেতৃত্বে রয়েছেন। শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।” শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুধীর রিকিয়াশন বলেন, “প্রায় আট বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর বহুবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।” চা-শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, “দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কথা বলার মতো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল রাখা হয়েছে। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।” বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, নির্বাচন বিলম্বের অন্যতম কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে জটিলতা। তার অভিযোগ, বর্তমান কমিটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে। তিনি সরকারের তত্ত্বাবধানে দ্রুত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্ব বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। নির্বাচন আয়োজন করে তারা চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, কিন্তু বছরের পর বছর নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।” বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, নির্বাচন বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থসংকট নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে। অতীতের মতো এবারও সরকারের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হবে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার নির্বাচন আয়োজনের ব্যয়ভার বহনের পরিবর্তে ইউনিয়নকে নিজস্ব অর্থে নির্বাচন করতে বলেছিল। সে সময় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নির্বাচনের জন্য ২৫ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শ্রম উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের আশ্বাস পাওয়া গেলেও জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে বিষয়টি আর এগোয়নি। সর্বশেষ শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চলতি বছরের জুলাই মাসে নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা রাণী ভৌমিক নামে একজন নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করায় নির্বাচন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। শ্রম অধিদপ্তর আদালতে জবাব দাখিল করেছে। মামলার নিষ্পত্তি হলে সরকারের সহযোগيتها নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, “এত বড় নির্বাচন প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া আয়োজন করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের ৯ সদস্যের মধ্যে তিনজন সরকারের প্রতিনিধি এবং ছয়জন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকেন।” এ বিষয়ে বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, শ্রীমঙ্গলের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে এবং বিষয়টি মন্ত্রী অবগত আছেন। তিনি জানান, আগের সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন করলেও তা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ হওয়ায় নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে আদালতের বিষয়টি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ অন্যান্য প্রস্তুতিও চলছে। হাইকোর্টের জটিলতা কেটে গেলেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।