উন্নয়নের স্বপ্ন আর সঞ্চয়ের ভরসা নিয়ে সমবায় কিংবা যুব উন্নয়নভিত্তিক সংগঠনে যুক্ত হন সাধারণ মানুষ। নিয়মিত সঞ্চয় ও সংগঠনের কার্যক্রমের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রত্যাশা থাকে তাদের।
কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই যখন দেখা দেয় হিসাবের অসংগতি, নথির ঘাটতি ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন, তখন সদস্যদের আশার বিপরীতে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর এলাকায় একই ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত তিনটি সংগঠনের কার্যক্রম ঘিরে এমনই নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সাবমার্সিবল পাম্প বিতরণ, অর্থের উৎস, ঋণ পাওয়ার দাবি এবং কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ে সংগঠনগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যের মধ্যে দেখা গেছে একাধিক গরমিল।
এক সপ্তাহের অনুসন্ধানে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম, সদস্যদের দেওয়া তথ্য, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে এসব অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাজিরপুরের ভবানীপুর এলাকায় একই কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে ‘রামপুর কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন সমিতি’, ‘কুবরীকান্দা আদর্শ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ এবং ‘রামপুর কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড’ নামে তিনটি সংগঠন।
তিন সংগঠনের নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছেন একই ব্যক্তি নজরুল ইসলাম। কোথাও তিনি সভাপতি, কোথাও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আবার কোথাও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। সদস্যদের অভিযোগ, সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে উপজেলা সমবায় ও যুব উন্নয়ন দপ্তরের কার্যকর তদারকি না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত সীমিত কয়েকজনের মধ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
ঋণ দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়া হলেও অনেক সদস্যকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একইভাবে, দীর্ঘদিন ধরে জমা রাখা সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত চাইতে গিয়েও কেউ কেউ সময়মতো টাকা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সাবমার্সিবল পাম্প দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই কার্যক্রম ঘিরেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন সদস্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি সাবমার্সিবল পাম্পের জন্য জনপ্রতি ১০ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যানার বাবদ ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য খরচসহ মোট ১২ হাজার ২২৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে সদস্যদের জানানো হয়, এই অর্থের বিনিময়ে প্রায় ৩০০ ফুট গভীরতায় সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করে দেওয়া হবে। তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে পাওয়া চিত্রে সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। পাম্প পাওয়া একাধিক সদস্যের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৮০ থেকে ২৫০ ফুট গভীরতায় সামার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ৩০০ ফুট গভীরতায় পাম্প স্থাপন করা হয়েছে—এমন সদস্যের সংখ্যা কত, তারও কোনো সুস্পষ্ট তালিকা বা পরিমাপসংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে খারনৈ ইউনিয়নের খোরশেদ আলমের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি প্রকাশ্যে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে না চাইলেও কথোপকথনে জানান, প্রায় তিন মাস আগে তাঁর নেতৃত্বে ৩০ জন সদস্য সংগঠনে যোগ দিয়ে প্রত্যেকে ১২ হাজার ২২৫ টাকা করে জমা দেন। সব মিলিয়ে তাঁদের কাছ থেকে জমা নেওয়া হয় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ছয়জন পাম্প পেয়েছেন।
বাকি ২৪ জন সদস্য কবে পাম্প পাবেন, সে বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি বলে দাবি তাঁর। তাঁর দাবি, প্রথম ধাপে ১৯ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ১১ জন সদস্যের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া পাম্পের প্রকৃত গভীরতা, ক্রয়মূল্য, মডেল, মোটরের ক্ষমতা, পাইপের পরিমাণ, স্থাপনের খরচ এবং সংগঠনের হিসাবে এ খাতে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।
এসব কথোপকথনের রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং নথিপত্র যাচাই করতে নজরুল ইসলামের কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টার আলোচনায় তিনি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম, সদস্যসংখ্যা, পাম্প বিতরণ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে মৌখিকভাবে বিভিন্ন তথ্য দেন। তবে তাঁর দেওয়া তথ্যের পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, রশিদ, ভাউচার কিংবা সরবরাহকারীর চালান উপস্থাপন করতে পারেননি।
নজরুল ইসলামের দাবি, দুটি সংগঠনের মাধ্যমে ৩৬০ জন সদস্যকে সাবমার্সিবল পাম্প দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন সদস্য পাম্প পেয়েছেন, কতজন অপেক্ষায় আছেন এবং কোন সংগঠনের মাধ্যমে কতটি পাম্প দেওয়া হয়েছে—এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তিনি দেখাতে পারেননি। এমনকি পাম্পের জন্য মোট কতজনের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যা দিতে পারেননি।
পাম্প কেনার ক্ষেত্রে কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম জানান, কোনো দরপত্র করা হয়নি। ছয় সদস্যের একটি কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সরাসরি পাম্প কেনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এই ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বিল-ভাউচার, রশিদ কিংবা সরবরাহকারীর চালান তিনি প্রতিবেদকের সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি।
অর্থের উৎস সম্পর্কে নজরুল ইসলামের দাবি, সংগঠনগুলোর কল্যাণ তহবিলে প্রায় ৩০ লাখ টাকা জমা ছিল। সেখান থেকে সাবমার্সিবল পাম্প কেনার জন্য ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে ওই অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের সমর্থনে ব্যাংক হিসাব, উত্তোলনসংক্রান্ত কাগজপত্র কিংবা ক্রয়সংক্রান্ত নথি তিনি দেখাতে পারেননি। এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিগত সময়ের অডিটে সংগঠনটিতে লোকসানের তথ্য পাওয়া গেছে।
সমবায় আইনের বিধি অনুযায়ী, কোনো সংগঠন লাভে না থাকলে সেখানে কল্যাণ তহবিলে অর্থ জমা হওয়ার সুযোগ নেই। ” তিনি আরও বলেন, দরপত্র ছাড়া কেনাকাটা এবং সাধারণ সভার অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়মবহির্ভূত। এসব বিষয়ে তথ্যের গরমিল প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে সংগঠনের ঋণ কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
নজরুল ইসলাম দাবি করেছিলেন, তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ১৭ লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন। তবে তাঁর এই দাবির সঙ্গে একমত নন কলমাকান্দা উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো ঋণ দেওয়া হয় না। নাজিরপুরে ‘রামপুর-কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন সমিতি’ নামে নিবন্ধন থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।
” দাবিকৃত ১৭ লাখ টাকার ঋণের উৎস কী, লোকসানে থাকা সংগঠনের কল্যাণ তহবিলে ৩০ লাখ টাকা কোথা থেকে এলো, আর দরপত্র ছাড়াই পাম্প কেনার ক্ষেত্রে কীভাবে অর্থ ব্যয় ও বিল পরিশোধ করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে সংগঠনগুলোর অর্থের উৎস, ব্যয় ও পাম্প বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
নিবন্ধিত সমবায় সমিতির ব্যয় নির্বাহের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নেত্রকোনা জেলা সমবায় কার্যালয়ের সাবেক পরিদর্শক মানজার হোসেন জানান, সমবায় সমিতির যেকোনো কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বাজেট পাস করতে হয়। অনুমোদিত বাজেটের আওতায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচের জন্য উপজেলা বা জেলা সমবায় কর্মকর্তার অনুমতি প্রয়োজন হয় এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে জয়েন্ট রেজিস্ট্রারের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সার্বিক বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা সমবায় কার্যালয়ের বর্তমান জেলা সমবায় কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, বার্ষিক সাধারণ সভা এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমিতিগুলো তাদের নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে পারে। তবে সদস্যদের কাছ থেকে টাকা তুলে টিউবওয়েল বা সাবমার্সিবল পাম্প বিতরণের কোনো সুযোগ সমবায় সমিতির নীতিমালায় নেই।
তিনি আরও জানান, আয় না থাকলে সদস্যদের শেয়ার বা সঞ্চয়ের মূলধন ভেঙে এ ধরনের সামাজিক কাজ বা ব্যয়ের কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।



















