যেখানে পাখির কলকাকলিতে ভোরের সোনালি ঘুম ভাঙার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই শ্মশানের এক গা ছমছমে নীরবতা। যে কিশোরের চঞ্চল হাসিতে মায়ের উঠানজুড়ে একদা চাঁদের আলো ঝরে পড়ত, যে তরুণের ছোট্ট দু-পায়ে ভর করে আগামীর এক বুক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ডানা মেলত- সে আজ চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে এক নিবিড়, অন্ধকার অরণ্যের কোলে।
প্রকৃতির সবুজ আঁচল তো পাখিদের পরম আশ্রয়ের জায়গা, কিন্তু লালমাই পাহাড়ের সেই গভীর অরণ্য আজ আমাদের সভ্যতার বুকে এক মস্তবড় কলঙ্কের সাক্ষী হয়ে রইল। মায়ের স্নেহের ওম, বাবার অহংকারের চওড়া বুক-সবকিছুকে এক নিমেষে ছারখার করে দিয়ে চলে গেল এক নিষ্পাপ, আলো ছড়ানো প্রাণ। এক মুঠো রোদ্দুর আর এক চিলতে হাসির বদলে তার ভাগ্যে জুটল ঘাতকের নির্মম, ধাতব আঘাত।
একটি জড়বস্তু, সামান্য একটি মুঠোফোন কেড়ে নিল এক রতœগর্ভা মায়ের তিল তিল করে গড়ে তোলা পৃথিবীর আলো। এই রক্ত কি কেবল অপ্রতিমের দেহ থেকে ঝরেছে? না, এই রক্ত আসলে আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক সমাজের পচে যাওয়া বিবেকের গা বেয়ে চুইয়ে পড়া এক পরম লজ্জা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের এই নৃশংস হত্যাকা- কেবল একটি পরিবারের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়নি; বরং পুরো দেশের মানচিত্রকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মাত্র তেরো বছর বয়সের একটি কিশোর, যার জীবনের খেরোখাতা কেবল খুলতে শুরু করেছিল, তাকে কেন এভাবে অকালে, নির্মমভাবে চলে যেতে হলো?
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার এক চিলতে নিষ্পাপ আনন্দ নিয়ে যে ছেলেটি গত শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোনটি হাতে জড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিল, সে আর কোনোদিন সেই চেনা ঘরে মায়ের স্নেহের ডাক শুনতে ফিরে আসেনি। ২৪ ঘণ্টার চরম উৎকণ্ঠা, চোখের জল আর মায়ের আকুল প্রার্থনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবশেষে শনিবার দুপুরে মিলল তার ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। এক রতœগর্ভা মায়ের বুক খালি করে দেওয়া এই বর্বরোচিত ঘটনা আমাদের চারপাশের এক অন্ধকার ও কদর্য সামাজিক রূপকে সমাজের আয়নায় নগ্ন করে দেখিয়েছে।
শোকে পাথর হয়ে যাওয়া, বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যাওয়া মা ড. নাহিদা বেগমের সেই আর্তনাদ-’ এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে! কী নিয়ে আমি বাঁচব? ’Ñ আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের বুকে তিরের মতো বিঁধছে। এই প্রশ্নটি কেবল একজন শোকার্ত মায়ের নয়, এটি আসলে এই রাষ্ট্রের কাছে, এই ঘুণে ধরা ব্যবস্থার কাছে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
আমরা আজ এমন এক দেশে বাস করছি, যেখানে একটি মোবাইলের লোভ মানুষের ভেতরের ন্যূনতম মানবিকতাকে পুরোপুরি গিলে খেতে পারে? আমাদের চারপাশের মানুষের নৈতিক অবক্ষয় আজ কোন অতল গহ্বরে গিয়ে ঠেকেছে, অপ্রতিমের এই রক্তাক্ত বিদায় তারই এক জ্বলন্ত এবং ভয়ংকর প্রমাণ। বিলাসবহুল প্রযুক্তি আর আধুনিকতার মোড়কে আমরা যে সমাজ গড়ে তুলছি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একদল হিংস্র হায়েনা।
সামান্য একটি মুঠোফোনের জন্য যারা একটি তেরো বছরের শিশুর গলায় ছুরি চালাতে পারে, তারা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়; তারা এই সমাজেরই এক গভীর মানসিক ব্যাধির বহির্প্রকাশ। অপ্রতিমের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন, ঘাতকরা যদি ফোনটাই নিতে চেয়েছিল, তবে তা কেড়ে নিয়ে তার সন্তানকে কেন বাঁচতে দিল না? কেন তাকে এভাবে জঙ্গলে ফেলে আসতে হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো আইনি ধারায় বা পুলিশের খাতায় পাওয়া যাবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের পরিবারের শিক্ষায়, আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভাঙনে। সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে এই নির্মম ঘটনার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা যেকোনো মানুষের রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। গত শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন ১০ মডেলের ফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম।
তার অবুঝ মনে তখন হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে সুন্দর কিছু মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করার আনন্দ ছিল। কিন্তু সেই আনন্দই যে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কে জানত! ফোনটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার পর আর ঘরে ফেরেনি সে। সময় যত গড়িয়েছে, মায়ের বুক তত আশঙ্কায় দুলতে শুরু করেছে। রাত গভীর হলেও যখন অপ্রতিম বাসায় ফেরেনি, তখন পরিবারের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অপ্রতিমের বাবা কেরামত ফিরোজ শাহরিয়ার।
শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে এক কিশোরের লাশ উদ্ধারের খবর আসে। পুলিশ ও স্থানীয় জনতা ঘটনাস্থলে গিয়ে নিথর দেহটি শনাক্ত করেÑ সেটি আর কেউ নয়, নিখোঁজ অপ্রতিম। ঘাতকরা তাকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে লাশ জঙ্গলে ফেলে রেখেছিল, যেন কেউ কোনোদিন তার খোঁজ না পায়। একটি সামান্য আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার এই পৈশাচিক পরিকল্পনা কীভাবে একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিল, তা ভেবে আজ পুরো কুমিল্লা শহর স্তম্ভিত ও স্তব্ধ।
ঘটনার পর পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইলের কল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই ঘটনায় জড়িত চারজন অপরাধীর মধ্যে তিনজনকে ইতোমধ্যেই পুলিশ আটক করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে জানা গেছে, মূলত অপ্রতিমের হাতের দামি আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকা- ঘটানো হয়েছিল। কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আসমা সিদ্দিকা মিলি জানান, ঘটনার মূল হোতা ও সহযোগীদের ধরতে পুলিশ ও ডিবির একাধিক টিম কাজ করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে এখনো ঘাতকদের নাম ও বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, যাতে অন্য কোনো অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়। পুলিশ প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, এই মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সম্মানিত শিক্ষক।
ফলে এই নৃশংস হত্যাকা-ের খবর যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছায়, তখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শোকের আবহ রূপ নেয় তীব্র প্রতিবাদে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে দীর্ঘ সময় ধরে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে ১২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারীসহ সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন কোটবাড়ী এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং বহিরাগতদের অনধিকার প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করতে হবে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি এই সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না দেখা যায়, তবে তারা আরও কঠোর ও অলঙ্ঘনীয় কর্মসূচির ডাক দিতে বাধ্য হবেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এই বিচার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত লড়বে। এই বর্বরোচিত হত্যাকা-ের পর স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রতিনিধিরাও গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এবং কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্থানীয় এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি এই এলাকায় একজন অভিভাবক হিসেবে লজ্জিত এবং দুঃখিত।
একজন শিক্ষকের সন্তান আমাদের এই শান্ত এলাকায় এভাবে খুন হবে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির সঙ্গে কথা বলেছি। এই মামলার বিচার যাতে আগামী ১০ দিনের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করা যায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব। এ ছাড়াও কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ড. নাহিদা বেগমের বাসায় গিয়ে তাকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, তাকে সান্ত¡না দেওয়ার মতো ভাষা পৃথিবীর কোনো অভিধানে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে জানানো হয়েছে, অপ্রতিমের অকাল মৃত্যুতে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাসমূহ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণ আজ শোকের চাদরে ঢাকা। প্রথম জানাজা শেষে অপ্রতিমের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি লাকসামের গ-ামারা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
অপ্রতিম আজ মাটির নিচে ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের যে বিবেক, তা কি জাগবে? আইনের শাসন আর ঘাতকের ফাঁসি হয়তো একদিন কার্যকর হবে, কিন্তু যে মায়ের কোল খালি হলো, তার সেই অন্তহীন শূন্যতা কি কোনোদিন কোনো আদালত বা কোনো সরকার পূরণ করতে পারবে? অপ্রতিম আর কোনোদিন ক্লাস সেভেনের ক্লাসরুমে ফিরে যাবে না, বন্ধুদের সঙ্গে আর কখনো তার হাসিমুখের ছবি তোলা হবে না।
সমাজ হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের এই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর কোনো পথ নেই। আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারার এই গ্লানি আমাদের চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে। তাই আজ প্রতিটি স্তব্ধ ও লজ্জিত বিবেকের একটাই আকুল আর্তনাদ- ক্ষমা করো অপ্রতিম। আমরা এক সমষ্টিগত অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তোমাকে শুধু এটুকুই বলতে পারি, আমরা সমাজ হিসেবে ব্যর্থ, রাষ্ট্র হিসেবে নিঃস্ব, কারণ আমরা তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি।
তোমার এই চলে যাওয়া যেন আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে অন্তত একবার ঝাঁকুনি দিয়ে যায়, যেন আর কোনো মায়ের কোল এভাবে সামান্য একটা আইফোনের লোভে খালি না হয়।


















