একসময় কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গে যুক্ত মানিকগঞ্জ শহরের খাল দিয়ে পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করত এবং এটি ছিল শহরের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ব্রিটিশ আমলে খনন করা সেই ঐতিহাসিক খালটি এখন ময়লা-আবর্জনা, কচুরিপানা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ঢেকে গেছে।
খালটি সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনে গত প্রায় দুই দশকে তিন দফায় সরকারি বরাদ্দ হয়েছে ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭৩ টাকা ৮০ পয়সা। এত টাকা খরচের পরও খালের চেহারায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং সর্বশেষ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার চার বছর পরও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে কয়েকটি স্থানে বাঁধ দেওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বলছেন, বছরের পর বছর ধরে খালটি সংস্কারের নামে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকা, খালে ময়লা ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকায় কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হয়নি। মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে প্রথম বড় আকারে খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ওই সময় প্রায় ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বান্দুটিয়া থেকে শুরুন্ডি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের দুই পাড়ে সিসি ব্লক বসানো হয়। নির্মাণ করা হয় হাঁটার রাস্তা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শেষ হওয়ার পর বেশিদিন টেকেনি পাড়ের ব্লক ও হাঁটার রাস্তা। বিভিন্ন জায়গায় ব্লক নষ্ট হয়ে যায়। হাঁটার পথও একপর্যায়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর ২০০৮ সালে আবারও খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কালীগঙ্গা নদীর সংযোগস্থল থেকে বকজুরি সেতু পর্যন্ত খাল খনন করা হয়। খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা কিছু স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় এলজিইডি ও পৌরসভা যৌথভাবে ১৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭৭ টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। খালের ১ হাজার ৪৪০ মিটার অংশে নতুন করে ব্লক বসানো হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, দ্বিতীয় দফার সংস্কারের কয়েক মাস না যেতেই খালে আবার ময়লা জমতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে সেটি ফের আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের শেষ দিকে খালটি পরিষ্কার করে পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেয় পৌরসভা। টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভায় খাল পরিষ্কারের পর মাছ চাষের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও বেশি দিন টেকেনি। খালের আগের চেহারা ফিরে আসে। খালটির সর্বশেষ বড় সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২২ সালে।
পুনঃখনন, সৌন্দর্যবর্ধন, তিনটি সেতু ও একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৬ টাকা ৮০ পয়সা। চুক্তিমূল্য ছিল ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪ টাকা ৩৮ পয়সা। প্রকল্পের কাজ পায় মেসার্স অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদারস। প্রথমে ২০২৪ সালের ১০ মে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরে মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো পুরো কাজ শেষ হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যান। পরে পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের পর আবার কাজ শুরু হয়। তবে নতুন করে শুরু হওয়া কাজ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু জায়গায় দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে।
নিম্নমানের ব্লক ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন তারা। এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। খাল সংস্কারের কাজ চললেও কয়েকটি স্থানে বাঁধ দেওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, এক জায়গার পানি অন্য জায়গায় যেতে না পারায় কোথাও পানি আটকে থাকছে। এর সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, খাল সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখা। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য এমন কোনো স্থাপনা বা বাঁধ দেওয়া ঠিক নয়, যাতে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, খাল থেকে কচুরিপানা ও আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে খালের সঙ্গে যুক্ত নালা-নর্দমাগুলোও সচল রাখতে হবে।
শুধু একবার খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাবে খাল। খালপাড় এলাকার ব্যবসায়ী মো. রাব্বি হোসেন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে এই খালের সংস্কারকাজ চলছে। কিন্তু এখনো খালের সেই সৌন্দর্য ফিরে আসেনি। বছরের পর বছর সরকারের টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু আমরা পরিবর্তন দেখছি না।
’ গঙ্গাধরপট্টি এলাকার বাসিন্দা তারিকুল হাসান বলেন, ‘বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের ময়লা-আবর্জনা খালে ফেলা হয়। পানি নোংরা হয়ে থাকায় মশার উপদ্রব বাড়ছে। কয়েকবার খাল সংস্কার করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এখন আবার সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে, কিন্তু এটিও দীর্ঘদিন ধরে শেষ হচ্ছে না। ’ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, ‘মানিকগঞ্জ শহরের এই খালটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
একসময় সারা বছর খালে পানি থাকত, নৌকা চলত। এখন সেটি দখল, দূষণ আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘খাল সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনে কয়েক দফায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সঠিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সুফল পাওয়া যায়নি। বর্তমান প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও স্থানীয়দের প্রশ্ন আছে।
সরকারি অর্থ ঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে খালের চেহারা বদলানো সম্ভব। ’ মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কিছুদিন হলো আমি এখানে যোগ দিয়েছি। শহরের খালের প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারব। তবে যতটুকু জানতে পেরেছি, খালটির কাজ প্রায় শেষের দিকে। ’ প্রায় দুই দশকে তিন দফায় ৫২ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে এই একটি খালের পেছনে।
তারপরও খালটি কেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন শহরবাসী। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই খালে বারবার প্রকল্প নেওয়ার পরও যদি ময়লা জমে থাকে, পানি চলাচল না করে এবং নাগরিকরা সুফল না পান, তাহলে এসব প্রকল্পের কাজ ও ব্যয়ের কার্যকারিতা কতটা? তাদের দাবি, নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়, কাজের মান, কতটুকু কাজ হয়েছে এবং কেন বারবার মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হোক।
পাশাপাশি খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিয়মিত ময়লা পরিষ্কারের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক।



















