দুই হাত না থাকলেও থেমে যায়নি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পানিছড়া গ্রামের ১৮ বছর বয়সী আশরাফ মো. আলী হোসেনের জীবন সংগ্রাম। পা দিয়ে লিখে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া এই তরুণ শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ২০২৬ সালের এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ২.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
এখন তার স্বপ্ন, অন্য সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করা এবং পরিবারের হাল ধরা। এজন্য সরকারি চাকরি কিংবা একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ চান আশরাফ। আশরাফ মো. আলী হোসেন উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পানিছড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা খলিল আহমদ এবং মা মোছা. আমিনা বেগম। তিনি সিলেটের চান্দু শাহ্ জামিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবারের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে দাদির সঙ্গে কানাইঘাটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান আশরাফ। সেখানে একটি দুইতলা ভবনের ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাওয়ার সময় বাঁচার জন্য তিনি ১১ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের তার ধরে ফেলেন। এতে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসকরা জানান, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার দুই হাত মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে এবং জীবন রক্ষার্থে হাত কেটে ফেলতে হতে পারে। প্রথমে পরিবার এতে রাজি না হলেও পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয় আশরাফকে। সেখানে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়। দুই হাত হারানোর পরও আশরাফ হাল ছাড়েননি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে পা দিয়ে লিখে লেখাপড়া চালিয়ে যান।
অবশেষে এবারের দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের অদম্য মনোবলের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। আশরাফের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তার গর্ভধারিণী মা-ই এখন প্রধান ভরসা। তিনি হাঁটাচলা করতে পারলেও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। লেখাপড়ার জন্য মাদ্রাসায় যাতায়াতের সময়ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। আক্ষেপ করে আশরাফ বলেন, আমি হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে পারি।
কিন্তু লেখাপড়া করতে মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় অনেকেই আমাকে অবহেলা করে গাড়িতে তুলতেন না। আমার সঙ্গে একজন সহকারী না থাকলে অনেক সময় চলাফেরা করা সম্ভব হতো না। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে আমি জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই অন্য সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে। নিজের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে আশরাফ আরও বলেন, আমার বাবা একজন নিম্ন আয়ের মানুষ।
আমার চিকিৎসার পেছনে তিনি সর্বস্ব হারিয়েছেন। কিছুদিন আগে আমার বড় ভাইও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। দুই ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বাবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন আমি পরিবারের হাল ধরতে চাই। আশরাফ বলেন, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকার যদি তাকে একটি চাকরি দেয়, তাহলে তিনি স্বাবলম্বী হতে পারবেন। এ বিষয়ে তিনি সরকারের প্রধান এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপির সুদৃষ্টি কামনা করেন।
তিনি বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা ও পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাকে একটি চাকরি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাই। আশরাফের মামা মুহিব উল্লাহ বলেন, দুর্ঘটনার পরও আশরাফ থেমে থাকেনি। জীবনযুদ্ধে লড়াই করে সে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পা দিয়ে লিখে ভালো ফলাফল অর্জন করেছে।
সে একজন মেধাবী ও ভালো ছাত্র। তিনি বলেন, আশরাফ সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। তাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন। আশরাফের বাবা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছেন। পরিবারের আহার, চিকিৎসা ও লেখাপড়ার ব্যয় বহন করে ঋণ পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুহিব উল্লাহ আরও বলেন, আশরাফের বাড়ির কাছেই সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। সেখানে তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে বাড়ির কাছ থেকে যাতায়াত করে কাজ করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টি কামনা করেন তিনি। চিকনাগুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনায় পরিবারটি আজ অসহায় জীবনযাপন করছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও সবাইকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। স্থানীয়রা মনে করেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে আশরাফ যে সাহস ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন, তা অনুপ্রেরণাদায়ক। তার লেখাপড়া অব্যাহত রাখা, স্বাবলম্বী হওয়া এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন পূরণে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন। আশরাফের প্রত্যাশা—সহানুভূতি নয়, সুযোগ।
একটি কর্মসংস্থানই হতে পারে তার নতুন জীবনের পথচলার শক্তি।


















