বান্দরবানের লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচার, অবৈধভাবে বাঁশ পরিবহন, ইটভাটা ও ফার্নিচার পরিবহনকারী গাড়ি থেকে টাকা আদায়, ভুয়া জোতের কাগজ ব্যবহার এবং বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাঁর দায়িত্বকালে এসব অনিয়ম বেড়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের সুযোগ করে দেওয়া, লাকড়ি পোড়ানো ইটভাটা থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। ফার্নিচার পরিবহনের অনুমোদনের নামে ১ হাজার টাকা আদায়ের মতো কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
ইটভাটার মালিকরা অভিযোগ করেন, লামা বন বিভাগের আওতাধীন লাকড়ি পোড়ানো ৪০ টি ইটভাটা থেকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে। টাকা না দিলে লাকড়ি জব্দ, বারংবার অভিযান পরিচালনা করে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। এদিকে বর্ষা মৌসুমে বাঁশ কাটা ও পরিবহন বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও লামা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা বাঁশ কাটার পরিবহনের জন্য টিপি দেওয়া হচ্ছে।
প্রতি বাঁশে ডিএফও ৫ টাকা করে নেন। কাগজে-কলমে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনের বাঁশ মহাল বন্ধ থাকলেও রাতে বিপুল পরিমাণ বাঁশ পরিবহন করা হচ্ছে ভূয়া টিপি দিয়ে। তাতেও আলাদা টাকা নেন ডিএফও। ডিএফওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লামা বন বিভাগের ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোত। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ওই জোতে সেগুন ও গামারীসহ মোট ২ হাজার ৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়।
তারমধ্যে ২ হাজার ৪২২টি সেগুন ও ২৩৮টি গামারী গাছ রয়েছে। এসব গাছের বিপরীতে সেগুনের প্রায় ১৮ হাজার ঘনফুট এবং গামারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঘনফুট কাঠের সাইজলিস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, ২ হাজার ৩৮৮টি গাছের সাইজলিস্টের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহনের জন্য প্রায় ৪৮টি ট্রানজিট পারমিট (টিপি) নেওয়া দিয়েছে লামা বনবিভাগ।
কিন্তু সরেজমিনে ওই জোতে গিয়ে গাছ কাটার তেমন দৃশ্যমান চিহ্ন পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, বর্তমান ডিএফও যোগদানের পর থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যে বাগানে গাছ কাটার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে গাছ কাটার তেমন কোনো চিহ্ন নেই। অথচ প্রায় ৪৮টি টিপির মাধ্যমে ট্রাকে করে কাঠ পরিবহন করা হয়েছে। এসব কাঠ সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে নেওয়া হয়েছে।
বমু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঘর নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে টাকা আদায় করেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি ঘর থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। শুরু ঘর নয় বমু সংরক্ষিত বনে পানের বরজসহ নানা চাষাবাদ করা হয় ডিএফওকে টাকা দিয়ে। এ ছাড়া বমু, তৈন ও মাতামুহুরি সংরক্ষিত এলাকায় বন বিভাগের বাগান সৃজন প্রকল্পের বরাদ্দের প্রায় ২০ শতাংশ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন একজন বন কর্মকর্তা।
তাঁর দাবি, ডিএফও যোগদানের পর যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে সবগুলোতে অনিয়ম হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিত ব্যয় খাত থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তা ডিএফওর পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গুলো কাজ করা হয়েছে। তারমধ্যে ডিএফও অফিসের সীমানা প্রাচীর সংস্কার,ডিএফওর বাংলো সংস্কার,পানবাজার বিট,ডলুছড়ি রেঞ্জের সীমানা কাটা তারসহ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের চেয়ে অধিক বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।
এ কাজে ডিএফও কার্যালয়ের মোখলেসুর রহমান সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন ওই কর্মকর্তা। লামা বন বিভাগ থেকে ফার্নিচার পরিবহনকারী প্রতিটি গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন আলী আসগর নামের এক ব্যবসায়ী জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, রাতে অনুমোদন ছাড়া ফার্নিচার পরিবহনে সহযোগিতা করেন ডিএফওর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লতিফ ও করিম।
তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু ফার্নিচার নয়, গর্জন, সেগুন ও গামারী কাঠ পরিবহনেও সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া করাতকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ১০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। ঝাড়ুফুল গাড়ী থেকেও নেওয়া হয় টাকা। টাকা ছাড়া গাড়ী পাস দেওয়া হয় না। আব্দুর রহমানের অভিযোগ, ফাইতং সড়ক দিয়ে বমু সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে লতিফের ‘সবুজ সংকেত’ প্রয়োজন হয়।
তাঁর দাবি, প্রতিটি কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের ডান হাত লতিফ। আরেক কাঠ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক অভিযোগ করেন, তৈন রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের ঘটনায় জুলফিকার আলী নামের এক বন কর্মকর্তা সাময়িক বহিষ্কৃত হলেও পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। বমু সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার প্রমাণ পেলেও আতা এলাহীকে দায়মুক্তি দিয়েছে ডিএফও।
লামা বন বিভাগের এসব অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু অভিযোগের তদন্ত চলছে। অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোনে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
পরে খুদে বার্তায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।



















