ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট স্থাপনে দুর্নীতিতে জড়িত গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে নিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কতৃপক্ষ। পরে সমালোচনার মুখে তদন্ত কমিটি থেকে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস এবং গণপূর্তের কেন্দুয়া সাব-ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মাজেদুর রহমানকে বাতিল করে আবারও নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার সময় আগুনের সুত্রপাত ঘটে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে স্মারক নম্বর-মমেকহা/প্রশাঃ/তদন্ত কমিটি/২০২৬/৭৫৬৬ ওই দিন মধ্যরাতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল যা বাতিল করে: নিম্নবর্ণিত চিকিৎসক/কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হলো।
হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের প্রধান ও অধ্যাপক অধ্যাপক ডা গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে সভাপতি করে ৬ সদস্যসের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয়েছে হাসপাতালের সহকারি পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান। ওই কমিটিকে ৩ কার্য দিবসের মাঝে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এছাড়া কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, হাপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধঢাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ দক্ষিণ প্রকৌশলী সুব্রত রায়, হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. খন্দকার মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, আগের তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের দু’জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখবে।
ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। গত সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ও আতঙ্কিত হয়ে পদদলিত হওয়ার ঘটনায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যু এবং ২০ জন আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করেন। এ ঘটনার পর গতকাল মঙ্গলবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত দাপ্তরিক চিঠিতে দেখা যায়, কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মমেকের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে।
সদস্য হিসেবে রয়েছেন ময়মনসিংহের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস এবং গণপূর্তের কেন্দুয়া সাব-ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মাজেদুর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী এবং সদস্য সচিব হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈনউদ্দিন খান।
কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। সুত্র জানায়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাঈমা এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ভুয়া ভাউচার, অকেজো এআরডি সিস্টেম এবং অসাধু প্রকৌশলীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহার ও নিয়মিত তদারকি না করার কারণে লিফটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব অনিয়মে জড়িত দু’জন প্রকৌশলীকে নিয়ে হাসপাতালের আগুনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেয়। অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তাদের তদন্ত কমিটিতে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় নাগরিক নেতা আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, যার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে লিফটের যন্ত্রাংশ অকেজো ছিল এবং শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে এতগুলো প্রাণ গেল, সেই প্রকৌশলীদেরই তদন্ত কমিটিতে রাখা মানে রক্ষককে ভক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া। এই কমিটি কখনোই নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেবে না। বরং নিজেদের অপরাধ ঢাকতেই ব্যস্ত থাকবে। আর প্রকৃত কারণ জনগণ জানতে পারবে না।



















